মুসলিম নারী শিক্ষাঃ স্বর্ণযুগের পতন ও রক্ষণশীলদের প্রতিক্রিয়া

fatima 2

লিখেছেন শিমুঃ

এক প্রৌঢ়া মহীয়সীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। বাস থেকে নেমে বেশ খানিকটা হাঁটার পথ। সাধারণত আমাদের গল্প এমনিতেই খুব জমে, নানা বিষয় নিয়ে মতামত আদানপ্রদান হয় অনেক বেশি, এর মধ্যে এই হাঁটার পথটা ষোল আনাই নিয়ামত।
তো ঘোড়সওয়ার কে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এই বিশাল ব্যবধানটা তৈরি হল কেমন করে বলেন তো ?
কিসের ব্যবধান ?
এই যে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, সেই 859 খৃস্টাব্দে, সেই সময়ে কতটা যোগ্য নারী ছিলেন ফাতিমা আল ফিহরি। বিশ্বের কত জায়গায় সে ঘুরে বেরিয়েছে জ্ঞান চর্চার জন্য। সময়কে ধারণ করতে পেরেছিলেন তার সমস্ত সুযোগ আর যোগ্যতা দিয়ে। এটা নিশ্চয় এমনি এমনি হয়নি। পুরুষদের স্বাভাবিক সহযোগিতা ছাড়া নিশ্চয় তিনি এত কিছু করতে পারতেন না।
কি এমন হল, কিভাবে হল যে, সেই মুসলিম সমাজের উত্তরসূরি বেগম রোকেয়াকে নতুন করে নারী শিক্ষার জন্য আন্দোলন করতে হল ? কিংবা গোটা বিশ্বের মুসলিম সমাজেই নারীদের কে স্ক্রিন থেকে হটিয়ে দেয়া হল এমনভাবে যেন, তাদের কোন অস্তিত্বই ছিলনা শিক্ষায় দীক্ষায়, বিজ্ঞানে, দর্শনে কিংবা সামাজিক অবকাঠামোতে।
ঘোড়সওয়ার এর বিশদ বিশ্লেষণে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি, অনেক কিছু জানা ছিলনা এবং অনেকগুলো পইন্ট চিন্তাই করিনি আগে। তার বিশ্লেষণ নিয়ে লিখবো অবশ্যই আর একদিন।
তার আগে বলি এই এক বিষয় নিয়ে এত কচলাচ্ছি কেন ? কেন এতবার একি কথা আওরাচ্ছি। অনেকে মনে করতে পারে বাড়াবাড়ি করছি বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু আমার এই একি বিষয় নিয়ে লিখার মধ্যে একটা উদ্দেশ্য তো আছেই।
এখন আমরা যারা সর্বোচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছি, পাশাপাশি এটুকু বুঝতে পারছি যে মুসলিম নারী হিসেবে আমার শিক্ষার কোন বাঁধা নেই, আগেও ছিলনা আমার ধর্ম ইসলাম মতে।নিজের মেধা, প্রতিভা বিকাশে কোন বাঁধা নেই, ইসলাম অনুযায়ী ছিলনা আগেও। ঠিক এই আমরাই যদি ৬০ এর দশকে ফিরে যাই, দেখবো আমাদের পূর্ব পুরুষরা আমাদেরকে কৈশোরেই বিয়ে দিয়ে দিত। যেমন আমার মা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন, নানা মা কে বিয়ে দিয়ে দিলেন অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়। মায়ের স্কুলের শিক্ষকরা এসে নানাকে এত অনূরোধ করলেন, কিন্তু নানা বললেন মেয়েদের এত পড়ালেখা দরকার নেই।
এই যে তখনকার দিনে নানার মত ঘরে ঘরে মুসলিম পুরুষদের বুঝ ছিল মেয়েদের পড়ালেখার দরকার নেই, এই বুঝ তাদের মাথায় এলো কোত্থেকে ? এটা তো কোন ইসলামী বুঝ না। রাসূলের যুগের মত আধুনিক, শিক্ষিতা নারীদের উদাহরণ দিয়ে যেই ধর্ম ভরপুর, সেই একি ধর্ম পালন করছিল এই মুসলিম পুরুষরা, অথচ এরা বলছে নারী শিক্ষার দরকার নেই ? নারীরা শুধু ঘরে বসে থাকবে, ঠেলতে ঠেলতে অন্তরালে বিলীন হয়ে গেল মুসলিম নারীরা, যাদের পূর্বসূরিরা জ্ঞানে, শিক্ষায় ছিল টইটুম্বুর। এদেরকে এই ইসলাম এর ব্যাখ্যা কে দিল ?
বিষয়টা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশে আলোচনা কম। লেখালেখিও কম। পুরুষ শাসিত মুসলিম সমাজে কোন এক দৈব কারণে নারী শিক্ষা বিস্তারের chronology টা একটু খেয়াল করলে দেখবেন কয়েকটা ধারাবাহিক পরিবর্তন আছে গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে।
Chronology দেখেন,
ইংরেজ আমলে খোদ মুসলিম পুরুষরাই ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে নিয়েছে বেশ দেরিতে। ততদিনে উপমহাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষা কবুল করে নিয়ে এগিয়েছে অনেকটা। মুসলিমরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল অনেক বেশি। এরই অংশ হিসেবে তারা ইংরেজি শিক্ষাকে মেনে নিতে অনেক সময় নিয়েছে।

এরপর যখন ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করলো, ভারতের মুসলমান সমাজ তখনও নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবাই শুরু করেনি।বেগম রোকেয়া ঐ সময়টাকে বুঝতে পেরেছিলেন, ফলে তিনি নারী শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে নারী শিক্ষার জন্য একটা বিপ্লব সূচনা করলেন।
মুসলিম সমাজকে তথা যদি শুধু বাংলার কথাই ধরি, নারী শিক্ষাকে সহজভাবে নিতে বহুত আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কট্টর বিরোধিতা ছিল আলেম সমাজের পক্ষ থেকেই, কিংবা রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারগুলো থেকে। ফলে নারীরা তো বটেই, এর বিরুদ্ধে সমঝদার পুরুষদেরকেও আন্দোলনের ভেতরে দিয়ে ক্রমাগত চলতে হয়েছে।

fatima

ধীরে ধীরে সেই রক্ষণশীলতাও কেটেছে অনেকটা। কেটেছে বাইরে থেকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কার কারণে। ধাক্কাটা ছিল নানামুখী কার্যক্রম এর ধাক্কা, কিংবা ঠ্যালা। বিশ্বব্যাপী নারী শিক্ষার বিস্তার, সরকারের ক্যাম্পেইন, উপবৃত্তিসহ নানামুখী সামাজিক ক্যাম্পেইন, এগুলো ভূমিকা রেখেছে নারী শিক্ষার প্রসারে।

মিনা কার্টুনে মিনা রাজুর মাঝের ব্যবধান যেভাবে ঘুচেছিল, মিনার দাদী যেভাবে বুঝেছিল মিনার পড়ালেখার গুরুত্ব, সেভাবেই ঘরে ঘরে মানুষ বুঝল নারী শিক্ষার গুরুত্ব। এবার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ নারী শিক্ষার প্রতি একটু খানি নরম হয়েছে মাত্র, যার ফলে আমার মা অন্তত অষ্টম শ্রেণী পাশ দিয়েছিল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত ব্যাপকভাবে নারীর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন বহুদূর।
এর পরের পর্যায়টা বেশ জটিল । এই পর্যায়ে এসে রক্ষণশীল মুসলিম ঘরানার মানুষেরা, তথা পুরুষরা স্বাভাবিক স্রোতের ঠ্যালায় বুঝতে বাধ্য হয়েছে, ফলে মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষাতেও অংশগ্রহণ বাড়া শুরু করেছে। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা অংশ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বুয়েটের প্রথম তিন নারীর আইনে লড়াই করে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ার সুযোগ করে নেয়া।

এই সময়ে একটা দ্বন্দ্ব কিন্তু চলছেই। সেটা হল, আচ্ছা ঠিক আছে, মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে ভাল কথা, কিন্তু চাকরী করার দরকার নেই। এই স্টেজে বিয়ের পর মেয়ে চাকরী করবে কি করবেনা তা ঠিক করবে স্বামী কিংবা শ্বশুরালয়।এত এত শিক্ষিত নারী, তারা সবাই কি আর এইসব স্বামী কিংবা শ্বশুরালয়ের নির্দেশের অপেক্ষায় চুপ করে থাকবার কথা ? তাদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব বোধ তৈরি হয়েছে। ফলে দ্বন্দ্ব, তর্ক বিতর্ক উপেক্ষা করেই নারীরা কর্মক্ষেত্রে ততদিনে প্রবেশ করে ফেলেছে। কোন কোন সেক্টরে প্রথম কোন নারী প্রবেশ করলেন তার রেকর্ড ততদিনে ফাইলে আটকা পড়া শুরু হয়েছে। অমুকে প্রথম নারী ডাক্তার, অমুক প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ার, অমুক-জন প্রথমবারের মত নারী রাষ্ট্র দূত এইসব মানুষ বলাবলি করছে।

অর্থনীতি মানুষের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন যে আনে, এর প্রভাব তো পরবেই।
এই ধাপে এসে, নারীরা যত কর্ম ক্ষেত্রে ঝুঁকা শুরু করেছে, এই ধাপে এসে রক্ষণশীল পরিবারগুলোর মেয়েরাও ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্রে ঝুকেছে। এবার নেকাব পরা, খিমার পরা রক্ষণশীল পরিবারের নারীরাও স্বাভাবিক গতিতে শিক্ষা এবং কর্ম ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে একটিভ হচ্ছে। চিন্তার পরিবর্তন হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ফলে নীতি নির্ধারণে, রাজনীতিতে, মিডিয়ায় নারীদের ব্যাপক পদচারণ। কিন্তু এই পর্যায় পর্যন্ত রক্ষণশীল Practicing মুসলিম ঘরানার নারীদের পাবলিক Access নেই বললেই চলে।

আইনি পেশায় কিংবা সাংবাদিকতায় কোন খীমার পরা মেয়ের আনাগোনা নেই। অন্যদিকে, সমাজের নারীদের একটা বড় অংশ ততদিনে ইসলাম থেকে অনেকটা সরে এসে দেশের সব পেশায় সমাগম ঘটিয়ে ফেলেছে। আর রক্ষণশীলরা তখনও বিতর্ক করে বেড়াচ্ছে, নারী কণ্ঠ হারাম না হালাল। মুখ দেখা যাবে না ঢেকে রাখতে হবে, এইসব।

fatima3

অপরদিকে তাদের এই রক্ষণশীলতা জোড় করে আটকে রাখতে পারেনি অন্য নারীদের। রক্ষণশীলরা যদি বুঝত, তাহলে এইসব নারীরা ইসলাম থেকে এতটা দূরে সরে যেত না। এবং এই রক্ষণশীলতার সুযোগ নিয়েছে একটা দল। তারা নারীদের বুঝিয়েছে, দেখো ইসলাম কত খারাপ, ইসলাম নারী হিসেবে তোমাকে শিক্ষার সুযোগ দেয়না, প্রতিভা বিকাসের সুযোগ দেয়না আরও অনেক কিছু। ফলে নারীদের একটা বিরাট অংশ ইসলামের সমস্ত সৌন্দর্য থেকে বেড়িয়ে গিয়ে স্বেচ্ছাচারী হয়ে গেল।

দ্বন্দ্বটা চলছেই , পাবলিক Domain গুলোতে নারীর পদচারণ থেমে নেই।
ভারতীয় উপমহাদেশে নারী শিক্ষা নিয়ে যেভাবে ধারাবাহিক পরিবর্তন এসেছে, এই একি পরিবর্তন কিন্তু বিশ্বের অন্য মুসলিম সমাজগুলোতেও এসেছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতে মাইগ্রেটে করেছে যে মুসলিম পরিবারগুলো, তাদের চিন্তা চেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, ফলে সেই দেশগুলোতে এখন মুসলিম নারীরা বলা যায় সব ধরণের তাঁবু ভেঙ্গে সব পেশায় যুক্ত হয়েছে।

টিভি মিডিয়ার খিমার পরা নারীর সংখ্যা বাড়ছে, সামনে আরও বাড়বে, এমন সব পেশায় নারীরা অংশ নিচ্ছে এখন যেগুলো নিয়ে রুক্ষনশীলতা আছে মুসলিম সমাজের। ফলে এখন যেই দ্বন্দ্বটা চলছে সেটা হল, নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে ভাল কথা, চাকরী করবে সেটাও ঠিক আছে, কিন্তু এইসব পেশা নারীর জন্য না। এই দ্বন্দ্বকে উপেক্ষা করেও খিমার পরা ইসলাম চর্চা কারী মুসলিম নারীরা আগাচ্ছে।

এই ধারাবাহিক পরিবর্তনে খেয়াল করে দেখেন সবটাতেই রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ একটার পর একটা ধাপকে বাধ্য হয়েই, বাইরে থেকে একতা চাপের মাধ্যমে, গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তন এনেছে, স্বাভাবিক যুগের চাহিদা মোতাবেক নারীদের প্রতি রক্ষণশীলতাকে একটু একটু করে তারা ঢিল দিতে বাধ্য হয়েছে।

যদি বাইরের এই চাপা ছাড়া, রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ সময়কে, সময়ের প্রয়োজনকে বুঝতে পারতো, তাহলে কি পরিবর্তন টা এমন হতো, নাকি আমরা ভিন্ন কোন চিত্র দেখতে পেতাম ? প্রশ্নটা থাকলো পাঠকের কাছেই।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী