নারীর অধিকার

woman-rights-credit_origবেগম রোকেয়া সাখাওয়াত:

আমাদের ধর্ম্মমতে বিবাহ সম্পূর্ণ হয় পাত্র-পাত্রীর সম্মতি দ্বারা।তাই খোদা না করুন বিচ্ছেদ যদি আসে তবে সেটা আসবে উভয়ের সম্মতিক্রমে ।কিন্তু এটা কেন হয় এক তরফা, অর্থাৎ শুধু স্বামী দ্বারা?অন্তত এইটে তো প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে দেখা যায় ।আমাদের উত্তর বঙ্গে দেখেছি,গৃহস্থ শ্রেণীর মধ্যে সর্বদা তালাক হয়, অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীকে সামান্য অপরাধে পরিত্যাগ করে ।মেয়েটির কোন ত্রুটি হলেই স্বামী দম্ভভরে প্রচার করে, “ আমি অকে তালাক দেব আজই দেব ।” তারপর ঘরের ভিতর বসে কতকগুলি স্ত্রীলোক ঐ ভাগ্যহীনা মেয়েটিকে নিয়ে, সামান্য বারান্দায় কিংবা উঠানে বসে স্বামী নামক জীবটাকে নিয়ে কতকগুলি পুরুষ; এইসব লোকগুলির সামনে স্বামী লোকটি তিনবার উচ্চারণ করে উচ্চস্বরে ।

“আয়েন তালাক, বায়েন তালাক

তালাক তালাক, তিন তালাক

আজ জরুরে দিলাম তালাক ।”

এই সময়ে পুরুষটিকে বেশ প্রফুল্ল দেখা যায় ।বোধ হয়, নতুন পত্নী লাভ হবে এই আনন্দে ।কিন্তু মেয়েটি ভয়ানক কাঁদে ।এরপর কোন বয়স্কা স্ত্রীলোক মেয়েটিকে ধরে তার কানের, নাকের ও হাতের অলঙ্কারগুলি খুলে শাড়ীর আচলে বেঁধে দেয় । হাতের কাচের চুরিগুলো এক টুকরা ইট বা কাঠের সাহায্যে ভেঙ্গে দেয়, আর বলে “দেন মোহর মাফ ক’রে দিয়ে যা ।” মেয়েটি এই সময় ভয়ানক কাঁদে ।বেচারী স্বামী হারিয়ে, সাজ-সজ্জা হারিয়ে,হাতে-গড়া সাধের পাতানো সংসার হারিয়ে রিক্ততার দুঃখ নিয়েই কাঁদে ।

এর পরের দৃশ্য- পুরুষটি বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে হৃষ্টচিত্তে কোথাও বেড়াতে যায় ।আর মেয়েটার বাপ, ভাই, চাচা বা মামু কেউ অবিভাভকরুপে উপস্থিত থাকে ( কারণ এইরূপ দু’একজনকে পূর্ব্বেই ডেকে আনা হয় ।) ।সেই অবিভাবক স্থানীয় লোকটি তখন ঐ ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে পাল্কী কিংবা গরুর গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায় ।

বৃদ্ধ পুরুষের বালিকা বিবাহে কত আগ্রহ ও সাধ,সেই সম্বন্ধে উত্তর বঙ্গে এই একটি ছড়া-ও প্রচলিত রয়েছে;

“হুকুর হুকুর কাশে বুড়া

হুকুর হুকুর কাশে ।

নিকার নামে হাসে বুড়া

ফুকুর ফুকুর হাসে ।”

 

মাহে নও

মাঘ, ১৩৬৪

(অগ্রন্থিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বেগম রোকেয়া রচনাবলি, পৃষ্ঠাঃ ৪১৭-৪১৮)

 

বিঃ দ্রঃ ১৯৩২ সালের ৯ ই ডিসেম্বর, বাংলার মুসলিম মেয়েদের জাগরণের অগ্রদুতি বেগম রোকেয়া বিদায় নিয়েছেন এই মাটির পৃথিবী থেকে । জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি চিন্তা করেছনে এদেশের অভাগিনী মুসলিম নারী জাতির কথা । ৯ ই ডিসেম্বর ভোর রাত্রে তিনি ইন্তেকাল করেন । সেই রাতেও তিনি রাত ১১ টা পর্যন্ত তার টেবিলে বসে কাজ করছিলেন । যে টেবিলে শেষ লেখাপড়ার কাজ করে গিয়েছিলেন, সেখানে পরদিন এই অসমাপ্ত লেখাটি পেপার ওয়েটের নিচে দেখা গিয়েছিল ।………

তার আরাদ্ধ মহৎ কাজ সম্পন্ন করেই তার স্মৃতিত প্রতি  প্রকৃত সম্মান আমরা প্রদর্শন করতে পারি ।  জীবনের শেষ মুহূর্তেও তার লেখনী দিয়ে গেছে আমাদের কাজের দিশা । তিনি যে দিশারী ।

-মোশফেকা মাহমুদ ( ‘নারীর অধিকার’ প্রবন্ধের সংগ্রাহিকা)

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী