সীমাবদ্ধতা আসলে কোন সমস্যাই নয় !

problemসুমাইয়া তাসনিম:

আমাদের আশেপাশের বেশিরভাগ সমস্যাগুলো খুব একটা জটিল না। আমার মনে হয়েছে যে, অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা থেকেই অধিকাংশ সমস্যার উদ্ভব হয়। যার বড় একটা অংশেরই কোনো ভিত্তি নেই।
আমার নিজেরই অনেকরকম সমস্যা ছিল। যেহেতু আমি একটু এলোমেলো হয়ে চলি(আমার মতে। অনেকে বলেন আমি নাকি গুছায় চলি। :p ), আমি একটা বয়স পর্যন্ত পরিবারের মানুষ ছাড়া অন্যদের সামনে স্বাচ্ছন্দে খেতে পারতাম না। বেড়াতে গেলেও না। সুযোগ পেলেই আড়ালে একা বসে খেয়ে নিতাম। কারণ আমার নিজস্ব ধারণা ছিল আমার খাওয়ার ভঙ্গি সুন্দর না (হাসলে হাসেন :p )। এছাড়াও, রেস্টুরেন্ট বা ফর্মাল প্রোগ্রামে কষ্ট হলেও চামচ, ছুরি-কাঁচি খাদ্যের উপর চালনা করতাম।
আমি যেকোনো জায়গায় গেলেই খাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে খুব টেন্সড থাকতাম।
এগুলো এখন এত অবলীলায় বলতে পারছি কারণ সমস্যাগুলো এখন আর নেই। যদিও এত ছোট্ট সমস্যাই আমার জন্য বেশ সিরিয়াস ছিল এবং বিশাল দুশ্চিন্তার কারণ ছিল।
যাহোক, আমি খুব সিম্পল কিছু সমস্যা দেখেছি। অথচ এই সমস্যাগ্রস্থরা এত দুঃখী হয়ে জীবন কাটান যে অন্যরা ভাবতেও পারেনা সেটা তার জন্য কতটা সিরিয়াস ইস্যু।
ছোটমামা বললেন যে, একজন কাউনসেলিং করাতে চান। সমস্যা কি জিজ্ঞেস করায় বললেন যে, ২৬ বছর বয়েসেই তার মাথা খালি এজন্যে তার প্রচন্ড জড়তা কাজ করে। গ্রুপ ফোটোতে আপত্তি, কোথাও যেতে আপত্তি, কারো সাথে কথা বলতেও তার সংকোচ। ছোট্ট একটা সমস্যা। কিন্তু তার self-esteem-এ এত বিরাট প্রভাব ফেলেছে যে, সে পুরোপুরি আনসোশ্যাল হয়ে গেছে, নিজের অ্যাপেয়ারেন্স নিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে নিজেকে একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে। বাস্তব জীবনে তিনি উচ্চশিক্ষিত ও সফল মানুষ। তাঁর মত জীবন হয়ত অনেক মানুষের অতি আকাঙ্ক্ষিত। অথচ তাঁর ছোট্ট সমস্যাটি তাঁকে একটা খাঁচায় আঁটকে দিয়েছে।

মেয়েদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা আরো প্রকট। অমুকের মত আমার নাকটা একটু খাড়া হলো না কেন, গায়ের রঙটা একটু পরিষ্কার হলো না কেন, দাঁতগুলো আরেকটু সুন্দর হলো না কেন, চুলগুলো এত পাতলা কেন এসব নিয়ে তাদের ঘুম হারাম। আরেকটুখানি ভাল দেখানোর জন্য কয়েকস্তরের প্রলেপ, কৃত্রিম নখ, চোখের পাপড়ি, চুল, কয়েক ইঞ্চি হিল, সপ্তাহে কয়েকবার পার্লারে ঘুরে এসেও তারা প্রচন্ড ফ্রাস্ট্রেটেড।
নিজেকে বদলাতে তারা এতই ব্যস্ত যে, ভেতরের সৌন্দর্যটা কখন মরে গেছে তারা জানতেও পারেনা।
আরেকগ্রুপ মেয়ের কথা বললেন বড়মামা। বললেন, লাইব্রেরিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু মেয়ে আসে, যাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবটাই ছেলেদের মত। জুতোজোড়া দেখেও মেয়েদের মনে হয়না। আমি হাসছিলাম। কারণ কথাগুলো জাজমেন্টাল। নন-জাজমেন্টাল হওয়ার ব্যাপারটা এত বেশি চর্চা করতে হয় আমাদের যে, পালটা কিছু বলতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে, একজন নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকলেই কেবল নিজেকে সম্পূর্ণ রুপান্তর করে ফেলতে পারে। কেউ হয়ত বলবেন এটা তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কারো ব্যক্তিত্ব হঠাৎ করে একদিন গড়ে ওঠে না। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে যার চর্চা হয়ে আসছে তার প্রভাব একেকজনের উপর একেকভাবে পড়ছে। কেউ অ্যাডাপ্ট করছে, কেউ রেবেলিয়াস হয়ে উঠছে। কোনোটারই ইতিবাচক পরিণতি নেই।
জাজমেন্টাল মেন্টালিটি আর ক্যাটাগরাইজ করার প্রবণতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ। মজার ব্যাপার হল, একজন মানুষ অবচেতনে ঈর্ষান্বিত, ভীত বা হীনমন্যতায় থাকলে বেশী জাজমেন্টাল হয়ে ওঠে। অন্যের নেতিবাচক দিক ও অসম্পূর্ণতা সামনে এনে নিজের ক্ষুদ্রতা ঢাকার চেষ্টা করে। ডিফেন্স মেকানিজমের অন্যতম বাজে একটা টেকনিক হচ্ছে এটা। মজার ব্যাপার হল, আমরা বায়োলজিক্যাল ব্যাপার নিয়ে সবচেয়ে বেশি জাজ করি, ক্যাটাগরাইজ করি। লম্বা-খাটো, ফর্সা-কালো ইত্যাদি ইত্যাদি। যার সাথে বুদ্ধিমত্তা আর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ও যোগ্যতার সম্পর্ক খুবই কম। পৃথিবীকে একজন হেলেন-এর(যার জন্য সংঘটিত যুদ্ধে ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়।) চেয়ে একজন সক্রেটিস বেশিকিছু দিয়ে গেছেন। তবু বায়ো-পাওয়ার ব্যবহার করে জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ আমরাই দিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

একজন সুন্দর, সেটাই তার পরিচয় বানিয়ে ফেলি। একজন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের, সেটাই তার পরিচয় বানিয়ে ফেলি। একজন শারীরীক বা মানসিক কোনো সমস্যায় ভুগছে, সেটাই আমাদের কাছে তার বড় পরিচয় হয়ে যায়। অথচ, ইভেন মানসিক সমস্যার সাথেও বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই।

যেমন অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশু ইরিস গ্রেইস মাত্র পাঁচ বছর(বর্তমানে ছয় বছর) বয়সেই নিজের পেইন্টিং দিয়ে গোটা দুনিয়ায় বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।

আরেকটা বিষয়ে নজর দিই, হিরো আলম নামের একজনকে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অনেকেই চেনে। মূলত ট্রল করার জন্যই তাঁর নাম সামনে আনা হয়। তবে আমার কাছে ভাল লেগেছে তাঁর আত্মবিশ্বাস। একজন মানুষ জানে যে তার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, মানুষ তাকে সম্মান করেনা, সে দেখতেও অন্যান্য হিরোদের মত না। কিন্তু তাঁর মধ্যে সেলফ-স্যাটিসফ্যাকশন আর কনফিডেন্স আছে। যারা তাকে অপমান করেন তাদেরকে সে বলতে পারে, আপনি আমার চেয়ে ভাল পারলে আমার জায়গায় এসে দেখান!
problem-2কাউকে উপরে তোলা বা নামানো না, মূল উদ্দেশ্য এটা বলা যে, নিজের সীমাবদ্ধতাকে জানা আর সে অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাতে স্থির থেকে সামনে এগুনোর পরিকল্পনা করলে হতাশা বা জড়তা কাজ করার কথা নয়। প্রতিটি মানুষই ইউনিক। অন্য কারো সাথে নিজেকে তুলনা করা কি খুব জরুরী? ওর সুন্দর চুল দেখে ওর সামনে আমার টাক মাথা নিয়ে লজ্জিত হতে হবে কেন?! আমি কি ইচ্ছা করে চুল ফেলেছি?
Transactional Analysis-এ একটা টার্ম আছে, Discounting। এই Discount আমরা তিনভাবে করি। নিজেদেরকে, অন্যদেরকে, পরিস্থিতিকে। যথাক্রমে নিজের সক্ষমতা ও যোগ্যতাকে অবমুল্যায়ন, অন্যকে অবমুল্যায়ন ও পরিবেশ-পরিস্থিতিকে অবমুল্যায়নের প্রবণতাকে এককথায় Discount বলে বুঝানো হয় এতে। এই কাজগুলো করার ফলেই মূলত আমাদের মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। আমার মনে হয়েছে এটাকে জাজমেন্টাল হওয়ার ব্যাপারটার সাথেও মেলানো যায়। আমরা নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করে, অন্যদেরকে নিজের বা অন্য আর কারো সাথে তুলনা করে বা নিজের অবস্থাকে অন্যদের অবস্থার সাথে তুলনা করে অসুখী হই।
শেষে একটা টিপস দিই, সেলফ-ডেভেলপমেন্টাল কোর্সে একটা ব্যাপার ফোকাস করা হয়, “Don’t blame, Don’t complain, Don’t excuse”। যে কেউ এটা চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী