আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন সাংঘাতিক মেয়েদের জীবনে বাবার ভূমিকা

indexনাসিমুন নাহারঃ প্রতিটি মেয়ের মনের ভেতরেই একজন কল্পনার রাজপুত্র থাকে।স্বভাবে রাজপুত্রটি কিছুটা যেন বাবা’র মতোই হয়। কারণ বালিকাবেলার শুরুতে আমাদের মতো প্রোটেকটিভ ফ্যামিলিগুলোর মেয়েদের জীবনে ছেলে
মানুষ বলতে একমাত্র বাবা’ই থাকে।বাবার প্রচ্ছন্ন ছাপ সারাজীবন ধরেই মেয়েরা মনে মনে ধারন করে চলে।

বিশেষ করে আমার মতো আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন সাংঘাতিক মেয়েগুলো তো আরো বেশি বাবাভক্ত হয়।বেসিক্যালি বাবা’র আদরে ভালোবাসায় প্রশয়ে এত অসাধারণ স্বপ্নের মতো শৈশব কৈশোর কাটাই আমরা, যা জীবনের সব থেকে দামী উপহার, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

আমরা যত বড় ই হয়ে যাই না কেন, অফিসে যতই হোমরাচোমরা হই না কেন, বাইরে যতই অধরা, সবার থেকে ভীষণ দূরের মানুষ হয়ে উঠি না কেন আব্বু’দের কাছে এইসব সাংঘাতিক মেয়েগুলো যেন দিনে দিনে আবারও সেই ছোট্ট মেয়েটিই হয়েই থাকে।

পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে হয়তো মায়ের সাথে আমার বেশী ক্লোজ হবার কথা ছিল।কিন্তু পরিস্থিতির জন্য অনেক এলোমেলো ups & downs এর মধ্যে আমাকে যেতে হয়েছে বলে সবার জন্য যা স্বাভাবিক আমার জন্য তা কখনোই স্বাভাবিক না।আম্মু মা হয়েই আছে আমার জীবনে। অতিরিক্ত রকমের মা মা আরকি ! মাতৃস্নেহ অন্ধ হয়।
আর সব মায়ের মতো আমার আম্মুর কাছেও সন্তানের ভবিষ্যৎ মানেই ‘ঘর বর বাচ্চা’।যেহেতু আমি নিজেও একজন মা এবং মা মিম্ মিও একজন অন্ধ মা, সেহেতু শুধুমাত্র নিজের সুখ এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের লোভে বাচ্চার জীবনকে নিয়ে কোন রকম এক্সপেরিমেন্ট করা একেবারেই সম্ভব না আমার পক্ষে।আর তাই দুই মায়ের মাঝে নিজের নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় কুটুর মুটুর চলতে থাকে।

আর আমার এই স্বাভাবিক না হওয়া জার্নি তে আমার আব্বু ই একমাত্র মানুষ যে কোন শব্দ মুখে উচ্চারণ না করেই আমাতে আস্হা বিশ্বাস ভরসা রেখেছে। যার কাছে আমার স্বস্তিটুকুই সব, লোক সমাজ কিচ্ছু না আমার পাশে।
আমার অজস্র কান্নামাখা চিৎকার করা সমস্ত প্রশ্নের একটাই উত্তর ছিল আব্বুর কাছে–
মা ডাক্তার হতেই হবে, লেখাপড়া শেষ করতেই হবে ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, আমি তো আছি।
দেখবা সময় অবশ্যই একদিন বদলে যাবে।
এবং ফাইনালি জীবন আসলেই বদলে গেছে।
চাকরির বদৌলতে আমার যখন নিজের একটা বাসা হলো তখন আমার বাসায় আমার বাবার যে শান্তির হাসি আমি দেখেছি তা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। জীবনযুদ্ধে তছনছ হয়ে যাওয়া সন্তান যখন ভেসে না যেয়ে নতুন করে যুদ্ধটা শুরু করে তা যেন জীবনযুদ্ধে একজন বাবার ই জিতে যাওয়া হয়।

ঘর সংসারে থাকা জীবনে আমার আব্বুকে চোখের সামনে তার ব্রাইট উচ্ছল রাজকন্যার মতো মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যেতে দেখতে হয়েছে, রাশি রাশি অপমানের বোঝা ঘাড়ে একজন মেডিকেল ছাত্রীর অসহায় বাবা হওয়া ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি আমি। আমার আব্বুর সেইসব অসহায় মুহূর্তগুলো ভুলে যাবার মতো উদার মেয়ে তো আমি না………

আর আজ যখন আব্বু যতবার আমার বাসায়, আমার নিজস্ব পরিচয়ের বাসায় আসে, আমার রুমে বসে আমার ছেলের সাথে খেলে গল্প করে, পাশের রুমে ডাইনিং টেবিলে বসে কিছুটা আড়াল থেকে আমি সেই স্বর্গীয় দৃশ্যটা দেখি আর চোখের পানি মুছতেই থাকি………
আহ সাময়িক অস্থিরতায় হতাশায় যদি মরেই যেতাম আমার বাবার এই স্বস্তিটুকু কই পেতাম ?
আব্বুকে আরো প্রাউড ফীল করানোর জন্য হলেও আরও কিছু দিন বেশি বাঁচতে চাই এই অস্হির অসহনীয় পৃথিবীতে।

লেখকঃ চিকিৎসক, কলামিস্ট।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী