নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়া

rokeyaশামীমা আফরোজ:

বেগম রোকেয়া নামের সাথে জড়িয়ে আছে ভারতবর্ষের নারীদের বিশেষ করে মুসলিম নারীদের মান-মর্যাদা, স্বাধিকার, আত্মপোলব্ধি, শিক্ষা ও উন্নয়নের ইতিহাস। অশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কার দূরীভূত করণপূর্বক একটি অসচেতন, জাতির জাগরণের ইতিহাস। তিনি একটি শ্রেষ্ঠ জাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও নৈতিক ত্রুটি তথা সার্বিক অধঃপতনের কারণ নির্ণয়পূর্বক এর সংস্কার সাধনে বীরের মত, একজন মুজাদ্দিনের মত এগিয়ে আসেন। যখন বিজাতীয় শাসন ও সংস্কৃতির চাপে উচ্চশিক্ষিত নবাব সাহেব, খান সাহেব, আলেম-ওলামা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতির অধঃপতনের কারণ ও তা থেকে উত্তরণের পন্থা খুঁজে পাচ্ছিলেন না, ঠেক তখন স্বশিক্ষিতা এক বিধবা নারী যৎসামান্য পুঁজি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত বাধা বিপত্তির পাহাড় মাড়িয়ে স্বজাতিকে পুনঃশ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোর নিমিত্তে জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। ইসলাম প্রদত্ত নারী জাতির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই যে নারীজাতিসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর পরিত্রাণের উপায়, এ কথাটি তিনি কথা ও কাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেখান। বেগম রোকেয়া তাঁর তীক্ষ্ম মেধা, দূরদৃষ্টি ও বাস্তবতা অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছিলেন নারী জাতিকে শৃক্মখলিত, অশিক্ষিত করে রাখার কারণেই অবহেলিত নারীর কোলেই হতাশাগ্রস্ত জাতির জন্ম হচ্ছে। নারীর সুশিক্ষা ও উন্নয়ন ব্যতিত এ জাতির উন্নয়নে আর কোন উপায় নেই। তাই নারীদের সুশিক্ষিত, সচেতন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বালিকা বিদ্যালয় ও বিভিন্ন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সভা সমিতি ও লেখনীর মাধ্যমে নারী জাতিসহ আপামর জনগণকে সচেতন করতে থাকেন। বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতবর্ষে নারীসমাজের উন্নয়নের যে চিত্র বর্তমান সমাজে দেখা যাচ্ছে তার সিংহভাগেরই দাবিদার এবং মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর কর্মকান্ডের যৎসামান্য বিশ্লেষণ নিম্নে করা গেল :
শিক্ষা বিস্তারে : যে যুগে হিন্দু ও খৃস্টানদের জন্য যৎসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল না তবে থাকলেও মুসলিম মেয়েদের কুরআন পড়ানো ব্যতীত তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল না। তবে সচেতন পরিবারগুলোতে উর্দু, ফার্সী শিখানো হত। তিনি স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে স্বামীর জমিতে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে নানা প্রতিকূলতার মাঝে কলকাতায় তা স্থানান্তর করেন। স্কুলের পাঠ্যসূচিও ছিল অত্যন্ত গঠনমূলক ও জীবনধর্মী। এম ফাতেমা খানম ‘সপ্তর্ষী’তে বলেন, ‘তাঁর স্কুলে তাফসীরসহ কুরআন পাঠ থেকে আরম্ভ করে ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, ফার্সী, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, রন্ধন, সেলাই ইত্যাদি মেয়েদের অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সমস্তই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।’’
নারী শিক্ষার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য তিনি তার God gives and man robs গ্রন্থে বলেন, Our great prophet has said “Talibul Ilm faridatun ala kulli muslimeen o Muslimat (ie it is the bounden duty of all Muslim males and females to acquire knowledge) But our brothers will not give us our proper share in education”
এক শ্রেণীর পুরুষ তাঁর স্কুল প্রতিষ্ঠা ও নারী শিক্ষা পছন্দ করতে পারেনি। তাদের বিরোধিতার মুখে তিনি জবাব দেন, “May we challenge such grandfathers, fathers or uncles to show the authority on which they prevent their girls from acquiring education? Can they quote from the Holy Quran or Hadis any injunction Prohebiting women from obtaining knowledge?” (God gives, man robs)
সে সুযোগেই তিনি মেয়েদের পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় ও পৃথক মেডিকেল কলেজ স্থাপনের সুপারিশ করেছিলেন। তবে তিনি মনে করতেন ধর্মহীন শিক্ষা কোন অবস্থায়ই জাতিকে মুক্তি দিতে পারে না। নারীর অসম, অবমূল্যায়ন, পণ্যে পরিণত হওয়া এসবের জন্য তিনি ধর্মহীন শিক্ষাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রধান কারণ ধর্মহীন শিক্ষা… কুরআন শরীফের শিক্ষা আমাদের নানা প্রকার কুসংস্কারের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কুরআন শরীফের বিধান ধর্মকর্ম আমাদের নৈতিক ও সামাজিক পতন থেকে রক্ষা করবে (ধ্বংসের মুখে বঙ্গীয় মুসলিম)।
সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় : বস্তুত বেগম রোকেয়ার প্রধান কাজ ছিল ইসলাম প্রদত্ত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সাধনা। রাসূল (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মুসলিম নারীগণ শুধু গৃহকর্ত্রীই ছিলেন না তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে, সমাজ ও সংস্কারে, ধর্মীয় কর্মকান্ডে, রাষ্ট্র পরিচালনায় বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সশস্ত্র নেতৃত্ব দিয়েছেন। উম্মুল মুমিনদের প্রত্যেকের ঘরই ছিল শিক্ষালয়। সাহাবগণ তাদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। নারীদের আত্মপোলব্ধি ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আহবান করে বলেন, মা, বোন, কন্যা আর ঘুমিও না। উঠ, কর্তব্য পথে অগ্রসর হও। বুক ঠুকে বল মা, আমরা পশু নই। বল বোন, আমরা আসবাবপত্র নই। বল কন্যা, আমরা জড়োয়া অলংকার রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকার বস্তু নই। সমস্বরে বল, আমরা মানুষ। আর কার্যত দেখাও, আমরা জগতের শ্রেষ্ঠ অংশের অর্ধেক, বাস্তবিকপক্ষে আমরাই সৃষ্টি জগতের মা।’’
বাল্য-বিবাহ ও অকারণ তালাকের তিনি প্রচন্ড বিরোধিতা করেছেন এবং বিধবা বিবাহে উৎসাহিত করেছেন।
রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে : তিনি নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতেন। তিনি নারীদের ভোটাধিকারের কথা বলেন। নারীদের দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯১৬ খৃ. তিনি আঞ্জুমানে খাওয়াতনে ইসলাম’ নামক নারীদের পৃথক সমিতি গঠন করেন। তিনি বলতেন, নারী স্বাধীনতার নামে নারীরা যেন সীমা অতিক্রম না করে।
ধর্মীয় অীধকার প্রদানে : বেগম রোকেয়া বুঝেছিলেন, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করে এবং নারীদের ধর্মীয় অধিকার না দেয়ার কারণেই অন্যান্য অধিকার থেকেও নারীরা বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘পর্দা নয় বরং প্রকৃত সুশিক্ষার অভাবেই আমরা এমন নিস্তেজ সংকীর্ণমনা ও ভীত হয়ে পড়িয়াছি। ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই।’ নারীর অধিকার বুঝার জন্য ও প্রকৃত শিক্ষিত হতে কুরআন পড়তে উৎসাহ দেন। যেমন- প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক বিদ্যাবলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেয়া হয় সে সমস্ত ব্যবস্থাই কুরআনে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য কুরআন শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন’ (রোকেয়া রচনাবলী)।
তবে তিনি শুধু তেলাওয়াতই নয়, তাফসীরসহ কুরআন অধ্যয়ন করাকে গুরুত্ব দিতেন, যাতে করে ধর্মীয় বিধি বিধান জেনে তা মানতে সহজ হয়। ধর্মের ওপর তথা আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস রাখতে বলেছেন তিনি বলেন, … তামাম জাহান যদি হয় একদিকে কি করিতে পারে তার আল্লাহ যদি থাকে।’ (পদ্মরাগ)
পর্দা প্রথা : পর্দা প্রথার বিলুপ্তি করে মেয়েদের শিক্ষার্জন ও উন্নতি করতে বলেছেন বলে অনেকে বেগম রোকেয়ার ওপর অযথা মিথ্যা দোষারোপ করেছেন। তিনি বরং পর্দা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা এবং শিক্ষা ও উন্নয়নে পর্দা অন্তরায় নয় বলেছেন। ‘পর্দা ও প্রবঞ্চনা’ গ্রন্থে তিনি বলেন, ‘পর্দার দোহাই দিয়ে অনেকে ভাল জিনিসে আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে। আর তা আমরা থাকবো না। আমরা চাই আমাদের ইসলাম প্রদত্ত স্বাধীনতা, চাই ইসলাম প্রদত্ত অধিকার থেকে আমাদের পথরোধ করবে?’ তিনি আরও বলেন, প্রকৃত সুশিক্ষার অভাবেই আমরা এমন নিস্তেজ সংকীর্ণমনা ও ভীত হইয়া পড়িয়াছি। ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই। তিনি গোঁড়ামী থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।
তবে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণ তথা অপসংস্কৃতি ও বেপর্দা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ে : অর্থনৈতিক অধিকার ব্যতীত কারও উন্নতি করা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি নারীদের শিক্ষিত হয়ে পর্দার সহিত রুজি-রোজগার, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে উপদেশ দিয়েছেন। এতদ্ব্যতীত পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর প্রাপ্য হক ও মোহরানা দ্বিধাহীন চিত্তে দিয়ে দিতে বলেছেন।
সমাজ বিনির্মাণে লেখনী : বেগম রোকেয়া নারী উন্নয়নে সমাজ সংস্কারে ও গঠনমূলক কর্মকান্ডে শুধু বক্তৃতা বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর উদ্দেশ্য লক্ষ্যের স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী বাস্তবায়নের জন্য অসীর মত মসির ব্যবহার করেছেন। সুসাহিত্যিক বেগম রোকেয়া বিভিন্ন ধরনের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ বক্তব্য, কবিতা, রম্য রচনা, গ্রন্থ, উপন্যাস রচনা করে ও তাঁর চিন্তা ও চেতনার পরিস্ফুটন করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথের স্বরূপ। অধ্যক্ষ চেমন আরার ভাষায় আমরাও বলতে পারি, তাঁর রচনার কোন বক্তব্য, কোন আক্রমণ ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল না। বরঞ্চ ইসলামকে কলুষমুক্ত করার জন্য তিনি কলমকে তলোয়ার করে জিহাদ করেছিলেন।’
যুগের মহান সংস্কার, বাঙালি নারীসহ সমস্ত মুসলিম নারীর গৌরব বেগম রোকেয়া। তিনি নারী-পুরুষকে কুরআনের বর্ণনানুযায়ী পরস্পরের সহযোগী হয়ে কাজ করতে বলেছেন, প্রতিদ্বনদ্বী হয়ে নন। পরিশেষে বলব, বেগম রোকেয়ার কর্মকান্ডে ও সাহিত্য সম্ভারের আরও বেশি প্রচার, প্রসার হওয়া উচিত। তাঁর রচনাবলী পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি তাঁর জীবনী, লিখনী বেশি বেশি আলোচনা হলেই তাঁর লক্ষ্য উদ্দেশ্য সকলের নিকট পরিষ্কার হবে। অপসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে অশিক্ষা-কুশিক্ষা পায় দলে অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞান ও ধর্মীয় ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে পুনঃ শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসতে পারবে স্বজাতি।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী