একুশে ফেব্রুয়ারী এবং বাংলা ভাষা নিয়ে দু’জন প্রবাসী বাংলাদেশীর কথপোকথন

banglaসিফাত মাহজাবিনঃ
— ভাবী, আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে এম্বেসিতে যাবেন না?

— না, মেয়ের স্কুল আছে আর আমাদেরও কাজ আছে।

— একদিন ছুটি নেন, একদিন স্কুল না করলে কি হয়? দেশীয় ভাষা-সংস্কৃতি বাচ্চারা শিখবে না? ভাষার জন্য শহীদদের আত্মত্যাগের কথা বাচ্চারা জানবে না?

— না ভাবী, ছুটি নেয়া যাবে না। বছরে পাঁচদিনের বেশী ছুটি নাই স্কুলে। দুই ঈদে দুটো ছুটি নিয়েছি। এইবার তো ইনশা’আল্লাহ জুনে ঈদ, আর মানে অরেকটা ছুটি নিতে হবে। তাহলে রিজার্ভ থাকলো দুটো। কখনো যদি হঠাৎ কোন ইমারজেন্সি হয়। আর তাছাড়া ছুটি থাকলেও আমি এই অনুষ্ঠানে যেতাম না।

— ঈদে ছুটি নেন কেন? আমার বাচ্চা তো ঈদের দিনেও স্কুলে যায়, এতে কোন ছাড় নাই! আমি এই ব্যপারে অনেক স্ট্রিক্ট!!

— ওহ আচ্ছা। না, আমরা ঈদের নামায পড়তে যাই। তারপর সেই দিনটা আমরা ঘোরাঘুরি করি, এজ এ ফ্যামিলি এঞ্জয় করি, আলহামদুলিল্লাহ্‌। এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন সবাই মিলে নাস্তা খাওয়া, তারপর ঈদের নামায পড়তে মসজিদে যাওয়ার উত্তেজনা, মসজিদে কত দেশের কত রঙের কত ভাষার মুসলিমদের সাথে দেখা হওয়ার আনন্দ, ঈদের দিনটার গুরুত্ব বাচ্চাদের জানানো খুবই জরুরী। তা না হলে ওরা তো দেখে ক্রিসমাসে আর ইস্টারে দুই সপ্তাহ ছুটি, এমনকি হ্যালোইন আর কার্নিভালেও এক সপ্তাহ ছুটি থাকে। আমরা মুসলিম প্যারেন্টসরা যদি নিজ থেকে ইনিশিয়েটিভ না নেই, তাহলে তো ধীরে ধীরে ওদের কাছে ঈদের গুরুত্ব হারাবে, আর ওইসব দিনগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মাবে।

— ওহ, আপনি তো আবার হুজুর! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম! হা হা হা।

— হাসেন, সমস্যা নাই। হাসলে এনডরফিন্স রিলিজ হয়, স্ট্রেস কমে, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

— আচ্ছা ভাবী, আপনি বললেন কেন ছুটি থাকলেও যাবেন না?

— আপনি অনুষ্ঠানসূচী দেখেছেন? প্রথমে ‘শহীদ মিনারে’ পুষ্পস্তবক অর্পণ, এবং শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক মিনিট নিরবতা পালন, তারপর বিভিন্ন জনের বানী পড়ে শোনানো, অতঃপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আপ্যায়ন। এখানে শহীদ মিনারটা কোথায়? এম্ব্যেসির ভেতর একটা শোলার তৈরি শহীদ মিনারে ফুল দিলে আর এক মিনিট নিরবতা পালন করলে শহীদদের একজ্যাক্টলি কি লাভটা হবে আমাকে আপনি বোঝাতে পারবেন? তারপর “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” — গান গাইলেই কি সব শেষ? এখানকার এম্বেসিতে চাকুরী করা প্রত্যেকের ছেলেমেয়ে পড়ে ইংলিশ স্কুলে। তাদের বেশীরভাগ বাচ্চাদের আমি দেখেছি বাংলা বলতেই কষ্ট হয়! আমার-আপনার বাচ্চা পড়ে ফ্রেঞ্চ/ডাচ স্কুলে। আপনি লক্ষ্য করেছেন হয়ত, তারা যখন একসাথে হয় তখন তারা ফ্রেঞ্চে কথা বলে, খুব কমই বাংলায় কথা বলে। তাহলে ‘ভুলিতে পারি, ভুলিতে পারি’ গান গেয়ে ফায়দা কি? আমাদের পরের জেনারেশন তো বাংলাই জানে না। বাংলাভাষী অভিভাবক হিসাবে যে কাজটা করলে কাজ হবে সেটা হচ্ছে, বাচ্চাদেরকে বাংলা শেখানো। আমি শিখিয়েছি আমার বাচ্চাকে। আপনি কি শেখাচ্ছেন?

okkhior— আরে না, কি বলেন ভাবী? স্কুলে তো ফ্রেঞ্চ আর ডাচ শেখে। তারপর আবার প্রাইভেটে ইংরেজি শেখে। আবার আপনি বাংলাও শেখাতে বলেন! পাগল! বাংলা শিখে কি করবে? আমি তো বাসায় আমাদের সাথে ইংলিশ বলতে বলছি, তাহলে প্র্যাকটিস হবে। আপনি আবার কোন বুদ্ধিতে মেয়েকে বাংলা শিখিয়েছেন?

— আমার বুদ্ধিশুদ্ধি তো বরাবরই কম।

— আরে ভাবী, এতো ভাষা একসাথে শিখলে ব্রেইন ব্লাস্ট করবে। তাই দরকারিগুলি শিখলেই চলবে।

— তাই নাকি?! আমি তো জানতাম নিউরন সেল অব্যবহৃত থাকলেই সেগুলো আস্তে আস্তে মরে যায়। আচ্ছা, আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করেন। এখন তাহলে রাখি।

— আচ্ছা থাক। আপনি তো যাবেন না। গেলে দেখতেন, আমরা দেশ থেকে এই উপলক্ষে ‘….. ফ্যাশন হাউজের’ সাদাকালো শাড়ি/পাঞ্জাবী/ফতুয়া/ সালোয়ার-কামিজ আনিয়েছি। খুব সুন্দর ভাবী। আচ্ছা তাহলে আপনাকে অনুষ্ঠানের সেলফি পাঠাবো কালকে। রাখি তাহলে।

— ওকে, ঠিক আছে।

লেখকঃ প্রবাসী বাঙ্গালী এবং গবেষক, বেলজিয়াম

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী