আমার প্রবাস কাহিনী ৭- তাহমিনা নাহার ।

ছোট মেয়েটার যখন দেড় বছর বয়স তখন আমার ভাসুরের ছেলে এলো দেশ
থেকে। মেয়ে গুলো একটু সঙ্গ পেলো।তার একবছর পর আমার নিজের ভাই এলো।
সবাই আমরা একসাথে থাকি,কাজ করি।
ওরা আসার আগেই আমরা একটা বাড়ীও
কিনেছি। ভাড়া বাড়ী ছেড়ে নিজেদের
কেনা বাড়ীতে উঠেছি।
ততোদিনে অনেক খাওয়া দাওয়ারও দোকানপাট হলো,বাঙালী, পাকিস্তানীদের।
কাজ, বাচ্চা,ওদের নিয়ে ভালোই চলছিলো
আমার সংসার। কাজের মধ্যে এতো ব্যস্ত
হয়ে থাকি, আমার ভাসুড়ের ছেলে অবাক
হতো আমাকে দেখলে,বলতো, “আপনি কি মানুষ নাকি যন্ত্র”। সব করতাম,নিজের
দিকেই খেয়াল করতামনা কখনো।
একদিন,দুদিন খেয়াল করলাম আমার
শরীরটা বেশী ভালো নয়। খুব পাত্তাও
দেইনি। মাথাটা চক্কর দেয়। এবার গেলাম ডাক্তারের কাছে, এরিয়া ভিত্তিক প্রাথমিক
চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়ার পর বলে দিলো,
” তেমন কিছু নয়”। বাসায় ফিরে এলাম।
রাত তিনটে সময় খুব অসুস্থ্য লাগছিলো,
সে আমাকে বড় হসপিটালে নিয়ে গেলো।
ওরা নানান রকম টেস্ট করে জানালো,
আমি খুবই অসুস্থ্য। ডাক্তার আমাকে ছাড়তে চাইছেনা,বলছে কাল সকালে অপারেশন করবে। তবুও জোর করে চলে এলাম,বাচ্চাগুলোকে ঘুমে রেখে এসেছি।
খুব কাছেই এক বাঙালী ভাবী থাকে, ভাবীর বাচ্চাদের কাছে দিয়ে এসেছি। সকালে ভর্তি হলাম,সারাদিন আরো টেস্ট হলো,
পরদিন সকালবেলা আমার অপারেশন।
ডাক্তার সন্ধ্যায় রিপোর্ট দিলো,মেয়েলী
সমস্যা, টিউমার ইনফেকশন,যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করতে হবে।
এতোটা সিরিয়াস কেন বলছে আমি বুঝতে
পারছিনা, মাথাটা চক্কর দেয় একটু,একটু
খানি গা গরম। অবিশ্বাস করাও যায়না,কারণ হসপিটালে টাকা পয়সার কোন কারবার নেই। যাই হোক,সকালবেলা
অপারেশন,সে আমাকে হসপিটালে রেখে
বাচ্চাদের নিয়ে এলো ভাবীর বাসা থেকে।সকালে আসবে, ফরম সই করবে। সকাল আটটায় আমাকে নিয়ে যাবে অপারেশন থিয়েটারে। আটটা বেজে গেলো সে
আসেনা,সাড়ে আটটা বাজে,আমি বাসায় ফোন দিলাম, ঘুমাচ্ছে। কি আর বলবো!
সেও টায়ার্ড,জাগতে পারেনি,সরি বল্লো বার বার। এখুনি আসছি”,বল্লো। আমি নিজে ফরম সই করে চলে গেলাম অপারেশন থিয়েটারে। সেদিন খুব কষ্ট
পেয়েছিলাম, আমার নিজের দেশ হলে
কেউনা কেউ আমার সাথে থাকতো।
জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম আমার
হাসব্যান্ড আমার পাশে। দশদিন পর রিলিজ পেলাম। তিনমাস রেস্ট নিতে বল্লো
ডাক্তার, যে কোন মুহুর্তে আবার এই সমস্যা
হতে পারে তাও বলে দিলো। মাত্র একমাস
রেস্ট নিয়ে আবার কাজে লেগে গেছি।

ভাতিজা বউ নিয়ে এলো। আরেক ভাতিজা এলো, কয়েক বছর পর আমার
নিজের বোন এলো।

ভালোই কাটছিলো দিনগুলো,কিছু নিজের মানুষজন নিয়ে। হঠাৎ একদিন
ফোন এলো দেশ থেকে, আমার বাবা মারা
গেলেন। সে যে কি একটা ফোন,কি কষ্টের
খবর সন্তানদের জন্য! কি আর করা,
কাঁদলাম শুধু।

তার মাত্র এক সপ্তাহ পর—–
সেই যে বলেছিলো আবার অসুস্থ্য হবো,তাই হলো। এবারও খুব জরুরী।এবার
অপারেশনের পর আরো বেশী সমস্যা হলো। জ্ঞান ফেরার পর মনে হচ্ছিলো মারা যাচ্ছি। ইন্টেনসিভ কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হলো একসপ্তাহের জন্য। রিপোর্ট হলো,
পরিমানের বেশী এ্যানাসথাসিয়া দেয়াতে
এমন হলো। যারজন্য ফুসফুসে পানি এসে
শ্বাস কষ্ট শুরু হলো। তবুও এবার নিজের কিছু মানুষজন ছিলো বলে এতোটা কষ্ট
পাইনি।

বাবা মারা যাবার পর মাকে একবার দেখতে যাবো ভেবেছিলাম,হলোনা।
সুস্থ্যও একটু হতে হবে,তবে টিকিট বুকিং
দিয়েছিলাম,মাকে দেখতে যাবো বলে।
আবার একটা ফোন এলো দেশ থেকে।
আমার মা মারা গেছেন। শুনলাম আর
কাঁদলাম শুধু, আর কিছুই করার ছিলোনা।
মা,বাবার মরা মুখ দেখার ইচ্ছে আমার
কোনদিন ছিলোনা,আমি সব সময় আল্লার কাছে এটাই বলেছি,আমি আমার প্রিয় মা,বাবার মরা মুখ স্মৃতিতে রাখতে চাইনা।

তারপর সেই ডেটমতো দেশে গিয়েছি আমার বোন আর আমি বাচ্চাদের নিয়ে,
আমার মার সাজানো সংসারে। সব আছে শুধু তারাই নেই। দুইটা ভাইয়ের বউ আছে।
বউ গুলো খুব ভালো। যথেষ্ট আদর করে,
সব সময় কেয়ার করে, তাদের কোন অবহেলা নেই আমাদের প্রতি।
তবু মার বাড়ীটাতে কি শূন্যতা! যাওয়ার পর চাচীরা, ফুপুরা এসেছে,বলে,”মা নেই তো কি হয়েছে আমরা আছিনা?”
আহা! দেখতাম সারাদিনের পরে ঠিক
সন্ধ্যায় সবাই যার তার ঘরে চলে যেতো।
মা হলে যেতোনা,ঠিক পাশে বসে থাকতো।

মায়ের মতো কেউ হয়না।

চলবে——–

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী