একজন মার চলে যাওয়া

নাসরিন আক্তারঃ

বিরস বদনে বসে আছে মনিয়া। কামরাঙার গাছটি সেই লাগিয়েছিলো যত্ন করে প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর। গাছটি অনেক বড় হয়েছে। অনেক ফল ধরে। সবাই কামরাঙা পাড়ছে আর মজা করে খাচ্ছে। সেও খেতে চেয়েছিলো। বড় বৌ ধমক দিয়েছে। কামরাঙা খেলে নাকি তার পেট খারাপ হবে। গাছটা বড় ছেলের ভাগে পড়েছে। মনিয়া বিবি বয়সের ভারে নূয়ে পড়েছে। চোখে কম দেখে কানে কম শুনে। লাঠি ভর দিয়ে টুকটুক করে হাটাচলা করতে পারে। মনিয়া বিবির স্বামী হারিস আলী মারা গেছে প্রায় বছর দশেক হবে। স্বামী বেঁচে থাকতে তার ছেলে দুটো এক সংসারেই ছিলো। কিন্তু তার স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেরা পৃথক হয়। মাকে কে দেখবে তা নিয়ে দু’ছেলের বিবাদ হয়। সালিশে ঠিক হয় মনিয়া তিন মাস করে এক এক ছেলের কাছে থাকবে। মনিয়ার দু’চোখে সেদিন পানি ছিলো না কিন্তু তার বুকটা ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিলো এই ভাগা ভাগিতে। ভাগাভাগির এই ফেরে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হৃৎপিণ্ড নিয়ে চলছিলো মনিয়া বিবির জীবন।

অথচ একদিন মনিয়া বিবির জীবনে কি’না ছিলো। মনিয়া বিবির চেহারা খুবই সুন্দর ছিল। তার স্বামী হারিস আলীর বেশ জমি ছিলো পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া। শ্বশুর শ্বাশুড়ী ছিলো না। ভাইয়েরা সবাই আলাদা থাকায় সংসারের ঘানি শুরু থেকেই মনিয়া বিবির টানতে হয়। কিন্তু কখনও ক্লান্ত হয়নি। তিন ছেলে চার মেয়ের মা হয়েছে। বড় ছেলেটা কৈশোরেই ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। পুত্রশোক বুকে চেপে অনেক কষ্টে বাকী গুলোকে বড় করে তোলে মনিয়া বিবি।

“ইকানো বইয়ারইছ কিতার লাগি?” ছোট বউয়ের ঝাড়ি শোনে মনিয়া বিবির সম্বিত ফিরে আসে। “আটো ঘর ভাত খাইতায়, বাদেতো পোয়া আইলে লাগাইবায় খাইছনায়।”

ছোট বউ বিরক্তির সাথে বলে। মনিয়া বিবি লাঠি হাতড়ে হাতে নেয় আস্তে-আস্তে উঠে দাড়ায়। ঘরের দিকে পা বাড়ায় ভাত খাওয়ার জন্য।

মনিয়া বিবি এখন ছোট বউয়ের কাছে। তিন মাস ছোট ছেলের কাছেই থাকবে। মনিয়া বিবির বড় দোষ হলো কিছুই মনে থাকে না তার। কিছু খেলেও মনে থাকে না খেয়েছে কি না। ছেলেরা যদি বাড়ী এসে জিজ্ঞেস করে ‘ভাত খাইছনি মা?’ মনিয়া বিবি উত্তর দিবে ‘নারে পুত ভাত দিছেনায়।’ এই নিয়ে অশান্তির শেষ নাই। সংসারে ঝগড়া ঝাটি ও শেষ হয়না এই কারনে। আবার দুই বউ এ নিয়ে চালাকি করে ইচ্ছে করেই মনিয়া বিবিকে অনেক সময় উপোস রাখে, খেতে দেয় না। ছেলেরা আসলে তারপর খেতে দেয়।

মনিয়া বিবি ছোট্ট একটা ঘরে থাকে, একা। তার ইচ্ছে হয় নাতি নাতনীদের নিয়ে থাকে কিন্তু বউরা সেটা পছন্দ করেনা। ছেলেদের সংসারে মনিয়া বিবি অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েছে। পান খেতো আগে। হারিস আলী বেঁচে থাকতে বাজার বেছে ভাল পান সুপারী নিয়ে আসতো মনিয়ার জন্য। মনিয়া ঠোট লাল করে পান খেতো। হারিস আলী অপলক তাকিয়ে থাকতো তার সুন্দরী বউয়ের দিকে। আর বলতো “আমার সোনার চাঁন পাখী তোরে কি সুন্দর লাগে ঠোট লাল কইরা পান খাইলে।” মনিয়া আহলাদে হেসে স্বামীর গায়ে লুটিয়ে পরতো। ধান তোলা শেষ হলে মনিয়ার জন্য হারিস আলী একজোড়া কাপড় আনতো। এখন পরনের শাড়ি কাপড় ছেড়া তালি দেয়া। নতুন কাপড় এনে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। মনিয়া যেন এ সংসারে অপাঙতেয় কেউ। বড় অবহেলায় তার দিন কাটে।

বউদের সংসারে বউরাই মাতব্বর। মনিয়ার কোন কথা কেউ শোনে না। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে বলে তাও বউরা পড়ে না। অসহায় মনিয়া আঙ্গুলের তসবিহ গোনে আর বসে বসে ঝিমোয়।

মনিয়া বিবির বড় কষ্ট হয় তখন যখন মেয়েরা আসে বেড়াতে। যখন স্বামী ছিলো সংসার এক ছিলো মেয়েরা আসলে কত আনন্দ হতো। হারিস আলী দুই হাতে বাজার করে মেয়ে জামাইদের খাওয়াতো। ধীরে ধীরে সব শেষ। এখন মনিয়ারই খাওয়ার ঠিক নাই। মেয়েরা আসলে ঠিক মতো আদর যত্ন পায়না মনিয়াও কিছু বলতে পারে না। আর মেয়েরা বড় একটা আসেও না। তাদেরই সংসার এখন বড় হয়ে গেছে, ঘর থেকে বের হতে পারে না।

ছোট ছেলের ঘরের ভিতরেই বেড়া দিয়ে আলাদা করা মনিয়া বিবি ছোট্ট ঘর।

অন্ধকার থাকে প্রায়। মশারীটা সারাদিন সারারাত খাটানোই থাকে। আধছেড়া মশারী। খানকয় কাঁথা বিছানায়। ময়লা তেল চিটচিটে বালিশটা কোনদিন ধোয়া হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। বড় নাতিন শিউলী এসে হারিকেনটা ধরিয়ে দিয়ে যায়। টিমটিমে আলোয় মনিয়া মাগরিবের নামায পড়ে, যিকির করতে থাকে। ছোট ছেলে বাজার থেকে এলে মনিয়া বিবিকে ভাত দিবে ছোট বউ। তারপর এশার নামায পড়ে মনিয়া সেই ছেড়া মশারীটার নীচে শুয়ে পড়বে। শুয়ে পড়লেও ঘুম আসে না। মাথায় শুধু পুরানো স্মৃতিগুলি নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে। তার সাথের কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। সেই শুধু বোঝা হয়ে আছে ছেলেদের।

সেদিন রাতে ঘুমের মাঝে হারিস আলীকে দেখল মনিয়া বিবি। আগে যেমন মনিয়াকে নিয়ে বাড়ির পিছনে মাঠ পেরিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন দেখাতে নিয়ে যেতো। আজও মনিয়াকে হারিস রেললাইন দেখাতে নিয়ে গেলো। চারদিকে কত সর্ষেক্ষেত, সর্ষেফুল ফুটে রয়েছে। মনিয়ার মনে কত আনন্দ আজ। কতদিন পর হারিস আলীকে দেখছে। মনিয়া বলে, ‘অতদিন কই আছলায়গো তুমি আমারে ভুইল্ল্যা কেমনে কই আছলায় তুমি।” জবাবে হারিস আলী মিটিমিটি হাসে। দুজনে বসে থাকে রেল লাইনের উপরে। হঠাৎ দুজনে দেখলো ট্রেনটা একদম কাছে এসে গেছে। নড়ার শক্তি নেই তাদের। ট্রেনটা তাদের উপর উঠলো বলে। মনিয়া ছটফট করতে করতে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠলো। ঘামছে শরীর। গলা শুকিয়ে কাঠ। পানি খেতে হবে। একটা গ্লাসে পানি রাখা থাকে বিছানার পাশে। মনিয়াই এনে রাখে। ঘুম ভাঙলে যদি পানি খেতে মন চায় তাই। মনিয়া গ্লাসের সবটুকু পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করে। শরীরটা দুর্বল লাগছে। জ্বর আসছিলো কিনা কে জানে।

রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিলো। সকালবেলাটা বৃষ্টি যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। মনিয়া বিবি ফজরের নামায পড়ে আবার ঘুমিয়ে ছিলো। উঠলো যখন বেশ বেলা বোধ হয় হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে খিচুরীর গন্ধ আসছে।

মনিয়ার একটু একটু শীত লাগছিলো। এখন গরম গরম খিচুরীটা খেলে তার ভালই লাগবে। জিভে জল আসে তার। সব সময় খিচুরীটা তার প্রিয়। মনে পড়ে আগে যখন জমি চাষ করতো হারিস কাজের ধূম পড়লে বন্দে বেশী কামলা লাগতো। দুপুর বেলা খিচুরী রেধে তাতে ননি ঘি দিলে অপূর্ব স্বাদের ঘ্রান বের হতো। সেই ননী ঘি এর খিচুরী গামলায় করে গামছা দিয়ে বেঁধে বন্দে পাঠাতো মনিয়া।

মনিয়া টুকটুক করে রান্নাঘরে যায়। ছোট বউ একটা টিনের থালায় মনিয়াকে খিচুরী বেড়ে দেয়। মনিয়া খেতে থাকে। কি স্বাদ! ছোট বউ ঝগড়াটে হলেও রাধে ভালো। মনিয়া থালার খিচুরী শেষ করে বউকে বলে, “ও ছোট বউ আমারে আরেকটু খিচুরী দিবায়নি।” ছোট বউয়ের এমনিতেই মেজাজ খারাপ ছিলো। ছেলে মেয়ের বাপ তাকে সকাল বেলায় বকেছে।

বৃষ্টির মধ্যে হাঁসমুরগী ছেড়েছে বলে। কাহাতক ঘরে হাস-মুরগী আটকে রাখা যায। গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। তাই ওগুলোকে ছেড়ে দিয়ে ছোট বউ ঘরের ভিতর ধানের ভাড়ার এর নীচে থাকা হাঁস-মুরগীর ঘর পরিস্কার করে। ছুটা পেয়ে হাঁস-মুরগী ঘরে আর বারান্দায় ছুটাছুটি করতে থাকে। এতে ছোট ছেলের বিরক্ত লাগে।

ছোট বউ-ঝামটা দিয়ে উঠে। “বুড়ি তোর খালি খাই খাই। এক থাল খিচুড়ী দিয়াও তোর পেট ভরেনা।”

বুড়িও মুখে মুখে জবাব দেয়, “তোর কিতা লো আমি তোর বাপেরটা খাইতামনি আমিতো আমার পোয়ারটা খাইতাম।” ব্যাস লেগে গেলো তুমুল ঝগড়া শাশুড়ি বউয়ে। চিল্লাচিল্লি শুনে ছোট ছেলে এলো রান্নাঘরে। এমনিতেই মেজাজ খিচড়ে ছিলো তার উপর প্রায় প্রতিদিনই এই ঝগড়া দেখতে দেখতে আর ভালো লাগেনা।

সে তার মাকে বলে, “এই বুড়ি আমার ঘরতো বার হ। এই কথা শুনে মনিয়া হাত ধূয়ে উঠে পড়ে। আর দাড়ায়না। লাঠিটা নিয়ে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে আসে। অভিমানে কষ্টে তার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। এই জন্যই কষ্ট করে মানুষ ছেলে মেয়ে বড় করে।

বুড়ি লাঠিতে ভর করে উঠানে নামে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাটছে সে। উঠানের পাশে বড় ছেলের ঘর একদিকে, আরেকদিকে গরুর ঘর। পিছে আছে খড়ের জন্য আরেকটা ঘর। বুড়ি একবার ভাবে বড় বউয়ের ঘরে যায়। কিন্তু ভিজা কাপড়ে যেতে সাহসে কুলালোনা। বড় বউ আরেক কাঠি সরেস। ভিজা কাপড়ে তার ঘরে গেলে আস্ত রাখবে না। মনিয়া আস্তে আস্তে গরুর ঘরের পিছনে খড়ের ঘরের বারান্দায় উঠে বসে পড়লো। তার খুব শীত লাগছে। এত শীত কেন আজ। গায়ের ভেজা কাপড়টা টেনে টুনে শীত নিবারনের বৃথা চেষ্টা করলো সে। খড়ের গদায় শুয়ে পড়ল মনিয়া। এত ঘুম আসছে তার। সাথে শরীরটাও শীতে কাঁপছে মনিয়ার।

মনিয়া ঘুমালো। অতল ঘুমে তলিয়ে গেলো। জগৎসংসার দেখলো আকাশ দেখলো বৃষ্টি দেখলো একজন মা কিভাবে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেলো। শুধু দেখলোনা তার ছেলেমেয়েরা। খড়ের গাদায় শুয়ে থাকা বাড়ির কুকুরটা শুধু দুইবার ঘেউঘেউ করে ডেকে উঠলো।

 

০৬/১১/২০১৬

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী