the journey of yovone redley

  • পৃথিবী বদলে দেওয়া সেই দিন

দিনটি ছিল ১১ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার । যে দিনটি আমার জন্য একটা আনন্দদায়ক দিন হতে পারতো। যদিও সানডে এক্সপ্রেসের বার্তাকক্ষে আমার দিনটা শুরু হয়েছিলো ৬ সপ্তাহের একগাদা জমানো কাজ শেষ করার জন্যই। তারপরেও মনে মনে আমি একটা মোটামুটি আরামদায়ক একটা দিন আশা করছিলাম। মঙ্গলবার দিনটা সানডে এক্সপ্রেসের সাংবাদিকদের খুব প্রিয় । সপ্তাহের এই দিনটাতে দুপুরের খাবারের সময়ে নতুন এবং পুরাতন নানা পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয় কখনো আইভিতে কখনো বা কোইয়ালিং এ, অথবা কোন একটা স্থানীয় বারে , ওয়াইনের ফাঁকে ফাঁকে যেখানে চলে আড্ডা হই হুল্লোড় ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মঙ্গলবার আমি বসে আছি কিছু ব্যয় রশিদ হাতে নিয়ে। যখন আমাকে একজন হিসাবরক্ষকের মন নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে অথচ মন পড়ে আছে সেইসব হাসিমাখা উচ্ছল স্মৃতিতে।
আগে কেউ পত্রিকার আয় ব্যয় নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলত না, তাই এতো হিসাব ও রাখতে হতো না। কিন্তু ইদানিং হিসাবরক্ষকরা দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোর আয়ের উৎস ও ব্যয় নিয়ে তদন্ত করে । এছাড়াও একজন নিরপরাধ বন্দিকে দেখতে যাওয়ার ও কথা, যার প্রতি ন্যায় বিচার করা হয়নি। তার নাম অবশ্য জেফরি আরচার নয়, সে অন্য কেউ যে সত্যিই নিরপরাধ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন রিপোর্টার হওয়া সত্ত্বেও কোন কাজের ডেডলাইনকে আমি ঘৃণা করি। অথচ এই সপ্তাহের শুরুতেই দুটি অবশ্যই করনীয় কাজ দেওয়া হয়েছে আমাকে, যা দ্রুত শেষ করতে হবে।
আমি এখন কাগুজে কর্মকাণ্ড নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে একটা অবসরকালিন দুপুরের খাবার এবং ঘোরাফেরা আমার জন্য আকাশকুসুম কল্পনাই বটে।
যেহেতু আমি ঠিক করেছিলাম যতো যাই হোক , কাজে মন লাগাবো তাই কলিগদের বিশ্রামময় দুপুর আর আনন্দের হাতছানির দিকে ভ্রুক্ষেপ করতে চাচ্ছিলাম নাই। ফলাফল স্বরূপ বেশীরভাগ সহকর্মীই বলতে গেলে আমাকে প্রায় একা অফিসে রেখে বাহিরে খেতে চলে গেলো ।
কিছুক্ষণ পরই বার্তাকক্ষের টিভি সেটের সামনে অফিসে যারা উপস্থিত ছিল সবাইকে জড়ো হতে দেখলাম । আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম লোকজন জটলা পাকানোর কারন কী! এবং যা দেখলাম তা আমাকে আতংকিত সেই সাথে বিস্মিত করে তুলল। টিভির পর্দায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারকে আগুনে জ্বলতে দেখলাম ।
তখন প্রায় দুপুর দুটা বাজে, আমি তাৎক্ষণিক নিউ ক্যাসেলে ফুলের দোকানে থাকা আমার বোন ভিভ কে ফোন করে টিভি ছাড়তে বললাম ।
এই তো মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও আমরা নিউইয়র্কে ছিলাম এবং সে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যেতে তেমন একটা আগ্রহী ছিল না।
আমি তাকে বললাম- নিশ্চয়ই বিমান চালকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে অথবা এমন কিছু হয়েছে যে সে বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ওয়ার্ল্ড সেন্টারে আঘাত হেনেছে।
এটা যে অন্য কোন ঘটনা হতে পারে তখন তা আমার মাথায়ই আসেনি। পরবর্তীতে নিজের নির্বোধ চিন্তাভাবনার জন্য নিজেকে মনে মনে অনেক তিরস্কার ও করেছি যে কেনই বা আমি সাথে সাথে ঘটনাটাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম না!
আমার মনে পড়ে যায় নিউইয়র্কের সেই দিনগুলোর কথা। যখন রিজেন্টের মতো পাঁচ তারকা হোটেলে আমরা দুই বোন বিলাসবহুল জীবন যাপন করছিলাম। আমরা ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় আপেল গাছগুলোর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম ।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে মাত্র ২ হাজার মাঠ পেছনেই এই বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলটি অবস্থিত।
মূলত এটা ছিল স্টক এক্সচেঞ্জের মূল অফিস এরপর কালের বিবর্তনে অনেকবার নতুনরূপে পরিবর্তিত হওয়ার পরে এটি এখন নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় বাথ টাব সমৃদ্ধ হোটেলে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই আমার মেয়ে ডেইজির গ্রীষ্মকালীন স্কুল। ওর সাথে দেখা করার পর আমরা দুই বোন নিউইয়র্কে কিছুদিন বেড়াচ্ছিলাম।
ডেইজি এখানে ৬ সপ্তাহের জন্য এসেছিলো এবং এটা তার জন্য খুব আনন্দদায়ক সময় ছিল। এতোটাই আনন্দদায়ক যে তার বিরক্ত হওয়ার মতো ও সময় ছিল না। কেননা ব্রিটেনে গ্রীষ্মকালীন সময়ে একজন কেয়ার টেকারের সাথে থাকার চেয়ে নিউইয়র্কে এই সামার স্কুলে সময় কাটানো তার জন্য অবশ্যই উত্তেজনাকর। এই যে এখন আমি নিজের সাফাই দিচ্ছি ডেইজির ব্যাপারে। প্রভু! আমি বুঝিনা একটা আট বছরের মেয়ের ব্যাপার আসলেই কেন একজন ৩৮ বছর বয়সী নারীকে নিজের ব্যাপারে সাফাই দিতে হয়! ভালোবাসা কী দুর্লভ জিনিষ! যা এতোটা বয়সের ব্যবধানের পরেও জবাবদিহিতার যায়গাটা তৈরি করেই দেয় !
ডেইজি এক কথায় চমৎকার একটা মেয়ে, খুব শান্ত শিষ্ট একটা বাচ্চা। আমরা পরস্পরকে অত্যন্ত ভালোবাসি ।যদি বাস্তবতা ভিন্ন হতো আমি হয়তো তাকে অনেক সময় দিতে পারতাম । বাস্তবতা কঠিন কেননা ডেইজির বাবার সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে। আমি একাই ডেইজিকে বড় করছি। আমি রীতিমতো একজন সাংবাদিক যা সময় দেওয়ার ব্যাপারটাকে আরও বেশী জটিল করে ফেলেছে।

এক মুহূর্তেই আমার মন থেকে নিউইয়র্কের স্মৃতিগুলো মুছে গেলো যখন পুনরায় টিভির পর্দায় চোখ পড়লো । ফোনের অপাশে ভিভ ও বিমুর হয়ে বসেছিল। এরপর সে তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে দিলো তার স্বামী বিল ব্রাউনকে কল দেওয়ার জন্য, কারন সে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কাজ করতো ।
এরপর আমি দেখেই গেলাম সেদিনের সেই নাটকীয় ঘটনাগুলো । যখন আমি বিন্দুমাত্র ও ধারণা করতে পারিনি যে সকাল ৮ টা ৪৮মিনিট নিউইয়র্ক টাইমে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বোস্টন লোগান থেকে লস এঞ্জেলসগামী ১১ নম্বর বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবেই নর্থ টাওয়ারে আঘাত হেনেছে।
১০ মিনিট পর আমি আমার বোনকে আবার ফোন দিয়ে কথা বলছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে আরও দুটি আমেরিকান বিমান ১৭৫ ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ও ৭৬৭ নং বোয়িং সাউথ টাওয়ারে আঘাত হানল । আমি রীতিমতো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলাম। ঘটনার ব্যাপকতায় আমি স্তব্ধ ছিলাম । সে তার স্বামীর সাথে কথা বলার জন্য ফোন রেখে দিলো ।
আমার তাড়াতাড়ি নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু বার্তাকক্ষের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যাদের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলবো তারা সবাই বাহিরে খেতে গিয়েছেন ।
জেএফকের ঘটনার পরে এটাই বিগত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা ছিল । এই ঘটনায় নিউইয়র্ক খুব তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাল। দুপুর ২ টা ২৫ এর মধ্যে সমস্ত ব্রিজ এবং সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দিলো কর্তৃপক্ষ ।
কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ জানালেন এটি একটি বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা ছিল ।
আমেরিকার স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ করে দেওয়া হল সেই সাথে বিমানবন্দরগুলো ও । এটা এমন একটা অঘোষিত যুদ্ধের মতো আমেরিকার জনগনের সামনে উপস্থাপিত হল অনেকে পার্ল হারবারের সাথে যার তুলনা করলেন।
আমি তখন কখনো টিভি দেখছি আবার খানিক পর পরই ডেস্ক টেলিফোন এবং মোবাইল ফোন রিসিভ করছি। আমি বার্তা সম্পাদক জেমস মুরে আর সম্পাদক মারটিন টাউনসেন্ডকে ফোনে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলাম, কারন আমার মনে হচ্ছিলো আমার নিউইয়র্ক যাওয়া জরুরী।

কিন্তু অনেকবার চেষ্টা করেও সম্পাদককে ফোনে পাওয়া গেলো না। সহ সম্পাদক জোনাথন কালভারট আমাকে শান্ত হতে বলল, কারন এটা মঙ্গলবার। আমাদের চোখের সামনে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তা দেখেও কীভাবে মানুষ এতোটা শীতল থাকতে পারে ভেবে খুব অবাক হচ্ছিলাম।
আমি দেখছিলাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উপর তলা থেকে কীভাবে কর্মকর্তারা বাঁচার জন্য করুণ আকুতি জানাচ্ছিল। তাদের জন্য জানালা দিয়ে লাফ দেওয়া ছাড়া তেমন কোন গতান্তর ছিল না।
আমি আর এই দৃশ্য সহ্য করতে পারছিলাম না, কিন্তু এর অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে চিন্তায় বিভোর হয়েছিলাম। এটি অসহনীয় একটি দৃশ্য ছিল , যা চোখের সামনে ঘটছিলো। যতোটা বন্য বীভৎস চিন্তা মানুষ করতে পারে তারচেয়েও অনেক বেশী ভৌতিক কদর্য ছিল এই ঘটনাটি।
কিছুক্ষণ পরেই মারটিন বার্তাকক্ষে প্রবেশ করে আমাকে জানালো সে আমাকে নিউইয়র্ক পাঠাতে চায়। যদিও জিম চায় আমি সংবাদ সংগ্রহের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যাই, কেননা তার ধারণা মধ্য প্রাচ্যের সাথে এই ঘটনার কোন না কোন সম্পর্ক আছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমার মতামত ছিল আমার ডামস্কাস অথবা লেবাননে যাওয়া উচিৎ, যেহেতু সেখানে আমার অনেক বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় আছে।যাদের সাহায্যে আমি ঘটনার সুলক সন্ধান করতে পারবো বলে আমার মনে হচ্ছিলো।
বিশেষত ১৯৯২ সালে প্যলেস্টাইনের জনপ্রিয় সংগঠন প্যালেস্টাইন জেনারেল কমান্ডের (যাদেরকে লকারবি বিমান হামলার পেছনে দায়ী মনে করা হয়) এর নেতা আহমেদ জিবরীলের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ডামাস্কাসে তার বাঙ্কারের ভেতরে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ তখন উত্তপ্ত ছিল। যখন আমি এই সাক্ষাৎকার নেই তখন আমি সাত মাসের গর্ভবতী ছিলাম ।
এছাড়াও আমি আরও উতসাহিত বোধ করছিলাম দাউদ যারুরার সঙ্গে আমার পরিচয়ের কথা ভেবে যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬ সালে লেবাননের ফাতাহ ভূমি প্রতিষ্ঠার পেছনে একজন অবিসংবিদিত উদ্যোক্তা ছিলেন ।
পরবর্তীতে যিনি ইয়াসির আরাফাতের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী