রুপলি সৈকতে

তাকি নাজিবঃ

খ্যাতিমান চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবির “রুপালি সৈকতে” চলচিত্রটি নির্মান করেছিলেন ১৯৭৯ সালে। আলমগীর কবির তার ব্যাক্তি জীবনে ছিলেন বিপ্লবী, মানুষ ও মানবতার জন্য তিনি আজীবন লড়ে গেছেন পৃথীবির বিভিন্ন প্রান্তে। আলজেরিয়া, ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামে তিনি প্রত্যক্ষ লড়াই করেছেন। আইয়ুব বিরুধী আন্দোলন,বাঙ্গালির মুক্তিসংগ্রাম ১৯৭১এ তিনি অংশ নিয়েছন সক্রীয় ভাবে।

তার রুপালি সৈকতে সিনেমাটি এক বৃহত্তর ক্যানভাসে করা অস্থির অগ্নিগর্ভ এক সংগ্রামী সময়ের জলন্ত স্বাক্ষী। বাংলা চলচিত্রে খুব কম পরিচালকই এমন সাবলীল ভাবে সমকালীন বিশ্বের চলমান মুক্তি সংগ্রাম, সংঘাতময় সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে উন্মেষ পূর্বকাল তাদের চলচ্চিত্রে ধারন করতে পেরেছেন। তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধ কালিন সময়ের দুই মেরুতে বিভক্ত পৃথিবীতে একদিকে নিপীড়িত,নির্যাতিত মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম আর অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রিয় উন্মেষ কালে শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে তৎকালীন রোমান্টিক তরুন সমাজের ব্যাক্তি ও পারিবারিক জীবনের সংঘাত ও সংগ্রামের বাস্তব চিত্র উঠেএসেছে আমাদের সামনে।

কাহিনীর প্রয়োজনে এই চলচ্চিত্রে পরিচালক অনেকগুলো বিদেশী সঙ্গীত ও সুর এবং কিছু কবিতা সংজোযন করেছেন যা সত্যি অপূর্ব। তার রুপালী সৈকতে সিনেমাটি পৃথিবী জুরে মানুষের মুক্তি সংগ্রাম,আমাদের সঠিক ইতিহাসের শেকর সন্ধান এবং বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সোনালী অতীতের কথা স্মরন করিয়ে দেয়ে।

ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের “বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র” তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘রূপালী সৈকতে’ চলচ্চিত্রটি। এতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির, শর্মিলী আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, নুতন, অঞ্জনা রহমান, রসি সামাদ ও উজ্জল। এছারাও এ চলচ্চিত্রে তৎকালিন সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এবং চরিত্রের সভাবিক প্রবেশ ঘটেছে যা ঘটনাপ্রবাহকে করেছে আরো প্রাঞ্জল।

দুই বিপ্লবী তরুনের জীবন ও সমকালীন বাস্তব ঘটনা নিয়ে এই ছবি। সুরুতেই আমরা দেখি ঢাকা থেকে আসা পত্রিকার সাংবাদিক লেনিন কে সমুদ্রতীরে মুক্ত প্রকৃতিতে ঘুড়ে বেড়াতে। হটাৎ তার চোখপড়ে সমুদ্রতীরে সুন্দর একটি কটেজে। একটি মেয়ে সেখানে হেটে বেড়াচ্ছে। লেনিন তাকে তার বান্ধবী শরমিন মনেকরে ভূল করে।

মিসেস অর্থিজ ও তার মেয়ে আনা বাস করেন সাগর সৈকতের কাছাকাছি এই কটেজটায়। কক্সবাজারের নির্জন ইনানী বীচের এই কটেজটির একটি রুম তার অতিথিদের কাছে ভাড়াদেন। হটাৎ করে এখানে আতিথি হয়ে হাজির হন এক চুপচাপ যুবক আনোয়ার। প্রকৃতিতে আনোয়ার একটু কঠিন এবং আত্মভোলা। রাতে তার ঘড় থেকে ভেষেআসে আরবী গান ও সংলাপ। পরদিন কৌতুহলি আানা পরখ করতে যায় ব্যাপারটা, কিন্তু হটাৎ আনোয়ার উপস্থিত হয়ে কড়া ভাবে আনাকে জানায় তার ব্যাক্তিগত জিনিস কেও নাড়াচাড়া করুক সে তা পছন্দ করে না।

পরদিন আনার মায়ের সাথে গল্প করার সময় আনোয়ার জানতেপারে আনার বাাবা “মিঃ মানুয়েল অার্থিজ” মার্ডার হওয়ার পরথেকে আনা সাধারনত অপরিচিত মানুষদের এড়িয়ে চলে। ঘটনা প্রসঙ্গে জানাযায় মিঃ অর্থিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজি পড়াতেন এবং তিনি আনোয়ারের শিক্ষক  ছিলেন, তার কাপ্তাইয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাটাও আনোয়ার মনেকরতে পারছে।

তারপর আনোয়ার দূরব্যাবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আনা’র কাছে। সে আনা’কে জানায় মিঃ অর্থিজকে সে ভালভাবে চিনত,এবং এটা অত্যন্ত পরিতাপের- স্ত্রী,কন্যার স্বতিত্ব রক্ষার জন্য পৃথিবীর সেরা একজন অরর্কিওলজিষ্টকে এভাবে সাধার গুন্ডাদের হাতে জীবন দিতে হলো। তারপর সে আনাকে শুনায় তার জীবনের আরেক কাহিনী। ১৯৬২ থেকে প্যালেস্টাইন মুক্তি আন্দোলনের সাথে সে জরিয়ে পরেছিল। তাদের ঘাটিছিল লেবাননে,তাদের ইউনিটে বৈরুতের রিফিউজি ক্যাম্পে বড়হওয়া লায়লা নামের একটি মেয়ের সাথে আনোয়ারর প্রনয়ের সম্পর্ক গড়েউঠে। কিন্তু হটাৎ একদিন আতাতায়ির গুলিতে লায়লা নিহত হলে তার আরব বন্ধুরা তাকে ইসরাইলের গুপ্তচর মনেকরে ভূলবুঝে। তারপর দেশে ফিরেআসতে বাধ্য হয় আনোয়ার।

এভাবেই ঘটনার ধারাপ্রবাহে আনার সাথে প্রনয় গড়েউঠে আনোয়ারের। এই রুপালী সৈকতে ঘড় বাধার প্রত্যয়ে আনোয়ার চলেযায় বিদেশে তার উপার্জিত টাকাপয়শা গুলো এখানে নিয়ে আসার জন্য। পথ চেয়ে প্রতিক্ষার প্রহর গুনতে থাকে আনা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা তখন উত্তাল।পশ্চিমাদের শষন-শোষনের বিরুদ্ধে বিষিয়ে উঠেছে বাঙ্গালীদের মন। বিদেশ ফেরত উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিক লেনিন আইয়ুব সরকারের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লিখেচলেছে পত্রিকায়। তার স্বপ্ন স্বাধীন হবে এই দেশ, প্রতিষ্ঠিত হবে এখানে এক শ্রনীহীন সাম্যবাদী সমাজ। লেনিন বিপ্লবের দিক্ষা নিয়েছে লন্ডনে থাকতে সেখানে সে বাম পত্রিকাতে লেখালেখি করত। আলজেরিয়া,প্যালেষ্টাইন, কিওবার বিপ্লবের সাথে ছিল তার প্রত্যক্ষ পরিচয়। এভাবে তার পরিচয় ঘটে দেশিয় আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দের সাথে। কাজকরেযায় সে স্বসস্ত্রবিপ্লবের লক্ষে।

পূর্বপাকিস্তানের ক্যাপিটালিষ্ট সমাজের প্রতিনিধি মিঃচৌধুরির মেয়ে শরমিন ভালবাসে লেনিনকে। অন্যসব বিপ্লবী দের মতই বাধনহীন লেনিনকে বাধতে পারেনা শরমিন। বাধ্যহয়েই সে মত পরিবর্তন করে।

পার্টির ভেতর কারো বিশ্বাসঘাতকতায় গ্রেফতার হয় লেনিন। নেমেআসে নির্মম রাষ্ট্রিয় নির্যাতন। জেলের ভেতর নিঃসঙ্গ লেনিন বুঝতে পারে শর্মিনের ভালবাসা।

মুক্তিপেয়ে যখন সে শর্মিনকে মনের কথা জানায় ততদিনে শর্মিন তাদের সহপাঠি কামালকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

রাজনৈতিক চাপে পড়ে ঢাকা ছারে লেনিন। সে চলে যায় ন্যাশেনাল জিওগ্রাফির জন্য ইনানি কোরালরিফের উপর একটা ফিচার তৈরি করতে। আবার হাজির হয় সে রুপালী সৈকতের সেই বাংলোয়। কিন্তু হটাৎ একদিন এখানে হাজির হয় শর্মিন। জানা যায় শর্মিন মিসেস অর্থিসের প্রথম পক্ষের সন্তান। লেনিনের চোখে শর্মিন দেখে আনার জন্য ভালবাসা,সে সতর্ক করেদেয় আনাকে। শর্মিন বিদায় নেয়ে মায়ের কাছথেকে,সে কামালকে বিয়ে করে কলম্বো চলে যাবে শিগ্গরি। আনাকে ভালবেশে লেনিন চেষ্টাকরে ঘড় বাধার কিন্তু ঠিক এমন সময় রুপালী সৈকতে হাজির হয় আনোয়ার।

অসম্ভব সুন্দর একটি ছবি রুপালী সৈকতে।বাংলাদেশে এমন বহুমাত্রিক ছবি যা ‘একইসাথে সমকালীন দেশিয়  রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সমকালীন উত্তাল আন্তর্জাতিক আন্দোলকে একই সাথে ধারন করে আছে’ এমনটি আর নির্মিত হয়নি। আশাকরি আপনারা সময় পেলে ছবিটি দেখবেন।

 

২২/০৪/২০১৭

ভিয়েনা,অষ্ট্রিয়া।

 

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী