যখন নামিবে আঁধার

জামান অ্যালেক্সঃ

১….

ঘটনাটি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে শোনা। তার কলিগ ও সেই কলিগের হাজব্যান্ড দু’জনেই ডাক্তার। নিজেদের ক্যারিয়ার ডেভেলপম্যান্ট নিয়ে তারা এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে তারা তাদের সন্তানকে খুব একটা সময় দিতে পারেন না……

বাচ্চা দিনের পর দিন বড় হচ্ছে তার নানা-নানীর কাছে। অবস্থা এখন এতটাই সঙ্গীন যে, বাচ্চার মা এখন বাচ্চাকে ডাকলেও তার কাছে আসে না, ভীত ও সন্দেহজনক চোখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে…

২…..

এবারের ঘটনাটি ইনবক্সে প্রাপ্ত….

মাস ছয়েক আগে এক ব্যক্তি আমাকে ইনবক্সে তার জীবনের করুণ কাহিনী শেয়ার করলেন….

ভদ্রলোক পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। এক ডাক্তার মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর একটা সময় তিনি বুঝতে পারলেন যে ডাক্তার মেয়েকে তার বিয়ে না করলেও চলত….

তার ভাষ্যমতে–তার স্ত্রী পোস্টগ্রাজুয়েশনের চিন্তায় এতটাই সাইকোটিক আচরণ করত যে বিবাহ পরবর্তী আনন্দময় সুখস্মৃতি বলে যে একটা বিষয় আছে তা তিনি কখনও অনুভব করতে পারেন নি।তার স্ত্রীর আচরণ এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, তাদের সন্তান যখন তার স্ত্রীর কাছে যেতে চাইত তখন পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটে বলে বিরক্ত হয়ে বাচ্চাকে জোর করে বাচ্চার দাদীর কাছে দিয়ে রিডিং রুমের দরজা বন্ধ করে দিত…

দিনের পর দিন এই দৃশ্য সহ্য করা লোকটির পক্ষে অসম্ভব ছিল, তিনি তার চিকিৎসক ওয়াইফকে ডিভোর্স দিলেন….

ইন ট্রু সেন্স, ডিভোর্স ইস্যু নিয়ে আমি চিন্তিত নই।আমি শঙ্কিত তাদের সন্তানটিকে নিয়ে, যে বেড়ে উঠছে স্নেহহীন কঠিন এক বৈরী জগতে….

৩…

এবারের ঘটনাটি শোনা আমার বোনের কাছ থেকে….

তার এক কলিগ ক্যারিয়ার করছে পেডিয়াট্রিকসে। ঢাকার অদূরে তার বেশ ভালো প্র্যাকটিস। এত প্র্যাকটিস যে, কলিগ তার নিজের সন্তান জন্ম দিয়ে ২ সপ্তাহের মাথায় বাচ্চাকে কাজের মেয়ের কাছে রেখে চেম্বারে মনোযোগী হলেন…..

সারাদিন চেম্বারে তিনি মায়েদেরকে উপদেশ দেন যাতে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বাচ্চাকে বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো না হয়। স্যারকাজম এই যে,  তিনি যখন এই উপদেশ তার চেম্বারে দিতে ব্যস্ত তখন তার নিজের সন্তান কৌটার দুধ খেয়ে মাতৃস্নেহহীন অবস্থায় বড় হচ্ছে….

৪….

আমেরিকানরা কত বিচিত্র ও ভয়ানক তা নিয়ে ছোটবেলায় একবার একটি বই পড়েছিলাম। তার কিছু নমুনা দেই……

একবার এক আমেরিকান মা নাকি তার সন্তানের কান্নাকাটি সহ্য করতে না পেরে নির্দ্বিধায় সন্তানকে দু’তলা থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। আরেকটি ঘটনা এমন ছিলো যে- এক আমেরিকান পিতা তার শিশুসন্তানকে কেটেকুটে তার পোষা কুকুরকে খাইয়ে পরে পুলিশকে ফোন দেন….

পড়তে পড়তে ভাবতাম-এসব ঘটনা আমেরিকাতেই সম্ভব, বাংলাদেশে না। অনেক দিন পার হয়েছে। এখন কেন যেন মনে হয় আমরা আর আগের মত নেই।আমার কেন যেন মনে হয়- আমরা এখন অনেক অনেক নিষ্ঠুর….

৫….

আমাদের দেশ এখন একটি Transitional phase এ আছে, আমরা নিম্ন আয়ের কান্ট্রি থেকে মধ্যম আয়ের কান্ট্রির দিকে ধাবিত হচ্ছি। এই Transitional state এ নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থায় রাখার জন্য আমরা নিরন্তর ছুটে চলছি। সে ছুটে চলায় শামিল হতে গিয়ে আমরা কি আমাদের সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছি?…

আমি চিকিৎসক, তাই চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট কিছু উদাহরণ টেনেছি। তবে উদাহরণগুলো সর্বব্যাপী, হয়ত অন্যান্য সেক্টরে মাত্রাটা কম….

ক্যারিয়ার ডেভেলপম্যান্ট করতে হবে, আমি তার বিপক্ষে নই। তবে সেটা করতে হবে সন্তানকে না ঠকিয়ে, জীবনে ব্যালেন্সিংয়ের প্রয়োজন আছে। মনে রাখতে হবে, তাদের ক্ষুদ্র হৃদয়ে পিতামাতাই সব।ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের চিন্তায় আমরা যখন তাদেরকে অবহেলা করি, সেটা কিন্তু তাদের ক্ষুদ্র হৃদয়ে কঠিনতম আঘাত হিসেবে বেজে ওঠে….

৬….

এই আদর্শহীন সমাজে যে নির্মমতা আমরা আমাদের সন্তানকে দেখিয়ে চলছি তার ফল শুভ হতে পারে না…..

আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আজ থেকে ২০-৩০ বছর পর এক রোবটিক প্রজন্মকে আমরা দেখতে পারবো। যে নিষ্ঠুরতা এদের প্রতি দেখানো হচ্ছে তারা তা কড়ায় গন্ডায় আমাদের মিটিয়ে দিবে। ক্ষমাহীন, ভালোবাসাহীন, নির্দয় এক ভিন্ন পৃথিবী এরা রচনা করবে , আপনারা অপেক্ষা করুন….

৭….

পাশ্চাত্যে Old home( old people’s home) বলে একটা ব্যাপার খুব প্রচলিত। অনেক সন্তান তার জন্মদাতা পিতামাতাকে সেই Old home এ রেখে আসে। শৈশবে নিজের মা বাইরে গেলে তাঁর শাড়ীটা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখতাম, সেই শাড়ীতে মায়ের গন্ধ জড়িয়ে থাকে বলে। সেই পিতামাতাকে সন্তানেরা কিভাবে Old home এ রেখে আসে তা আমার আজও বুঝে আসে না….

তবে অাঁধার নামবে। হৃদয়হীনতার যে রঙ্গমঞ্চ আপনি তৈরি করে চলছেন তার যবনিকাপাত ঘটবে ওল্ড হোমে একাকীত্বের মাঝে আপনার দিন কাটানোর দৃশ্যায়নের মাধ্যমে। আমি সেজন্য আপনার সন্তানকে দোষ দিতে যাব না। যে অাঁধারের সৃষ্টি আপনি করেছিলেন তার প্রায়শ্চিত্ত তো আপনাকেই করতে হবে…..

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী