আমার প্রবাস কাহিনী (পর্ব ৮ শেষ) -তাহমিনা নাহার

মা বাবার স্মৃতিটুকু বুকে নিয়ে দুইমাস দেশে কাটিয়ে ফিরে এলাম প্রবাসে আবার।
এবার দেশে যাওয়ার কিছুদিন আগে সেলাই
কাজ ছেড়ে দিয়ে একটা বার রেস্টুরেন্ট নিয়েছিলাম। ভাবলাম আর কত একই কাজ! আঠার বছর সেলাই করেছি,এবার
অন্য কাজ করি। বারেও ভালো কাজ
হচ্ছিলো। আমরা দু’জন আর দুজন মানুষ
রেখে কাজ করে যাচ্ছি। লোনের উপর বাড়ী নিয়েছিলাম,বার নেয়ার আগেই লোন শেষ করেছি। ভাবলাম দুজনে মিলে, মেয়েরা বড় হচ্ছে,ওরা যখন নিজের পায়ে
দাঁড়াবে তখন আমরা দেশে ফিরে যাবো।
সে চিন্তা করেই আর একটা বাড়ী কিনে
নিলাম। দুটো মেয়ের দুটো বাড়ী থাকবে।
সেটা ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল
সিদ্ধান্ত। সেই সময় বাড়ীর দাম শুধুই বাড়ছিলো। ভাবলাম আরো বেড়ে
যাওয়ার আগে কিনে নেই। যার জন্য ব্যাংক লোন শোধ হওয়া বাড়ীটাকে ব্যাংকের হাতে দিয়ে আরেকটা বাড়ী
কিনলাম। ভালো দামে ভাড়াও দিলাম।
ভাড়া যা পাই আর অল্প হাত থেকে দিয়ে
আবার লোন চালাই। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সারা ইউরোপ জুড়ে
শুরু হলো অর্থনৈতিক মন্দাভাব। সারা
দেশে বাড়ীর দাম অর্ধেকের বেশী কমে
গেছে। ভাড়া কমেছে অর্ধেক। কাজ কমে
গেছে। এরমধ্যে আমার হাসব্যান্ড অসুস্থ্য হয়ে গেলো। এমনই অসুখ যে আর সুস্থ্য হবার সম্ভাবনা নেই জীবনেও। কি অসুখ?
অসুখের নাম “আলঝেইমার”। মানুষটা
দেখতে সুস্থ্য,কিন্তু ব্রেন কাজ করেনা।
যখন জানতামনা কি হয়েছে,তখন খুব
সমস্যা হতো। ঝগড়া ঝাটি লেগেই থাকতো। কিছু একটা আমার কাছে না
রেখেও বলতো আমার কাছে রেখেছে।
বিশেষ করে টাকা পয়সা, আমার কাছে না রেখেও আমার কাছে ফেরত চাইতো।
কোথা থেকে দিবো আমি,তখন
আমাকে মিথ্যেবাদী বলতো। আমি জোর
করে তার পকেটে হাত দিতাম,দেখা যেতো
টাকা নিজের পকেটেই। এমনি আরো
অনেক কিছু। একসময় ভাবলাম, কেন
এমন করে, ডাক্তারের কাছে নিয়ে দেখি।
সেও যেতে চায়না,সে ভাবে সে ঠিক আছে,
আমি মিথ্যে বলছি। তারপর একদিন নিয়ে
গেলাম ডাক্তারের কাছে জোর করেই।
ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই জবাব
দিলো। এই রোগের প্রাথমিক অবস্থটা খুব
খারাপ,যতক্ষন না জানা যায় সমস্যাটা কি
আসলে। ডাক্তারের কাছে সব বল্লাম,
ডাক্তার বল্লো,এটাতো তার দোষ নয়,সে
অসুস্থ্য।
তো যা বলছিলাম,বাড়ীর কথা,আমি খুব একা হয়ে গেলাম। সব হঠাৎ করেই এসে
আমার উপর পরে গেলো। এককথায় বলতে গেলে আমার মাথাটার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরলো। কিভাবে কি করবো! বাড়ী,কাজ,মেয়েগুলো,রোগী।
সব মিলিয়ে আমার পাগল হয়ে যাওয়ার
অবস্থা। আগের মতো কাজও নেই,যেটুকু
আছে সময়ও দিতে পারছিনা। বাড়ীর লোনটা না চালাতে পারলে দুটো বাড়ীই ছাড়তে হবে। বারের খরচ,বাড়ীর খরচ
পারছিনা আর চালাতে। ষোল’শ ইউরো শুধু বাড়ীর জন্য। মেয়েরা আমার অবস্থা দেখে বল্লো,”ছেড়ে দাও বাড়ী,আমরা ভাড়া
থাকবো কোথাও।” সাড়ে চার’শ দিয়ে বাড়ী ভাড়া পাওয়া যায়, ষোল’শ ইউরো দেয়ার দরকার নেই।” বলে মুখে,কিন্তু আমি জানি
এই বাড়ীটা ওদের কত প্রিয়। এ’বাড়ীতে তারা বড় হয়েছে,ছোট মেয়েটা এ’বাড়ীতে
হাঁটতে শিখেছে। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না
দেখে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তই নিলাম।
ব্যাংকের লোন চালানো বন্ধ করে দিলাম।
দু’তিন মাস পর ব্যাংক আমাকে ডাকলো।
কেন লোন চালাচ্ছিনা জানতে চাইলো,বল্লাম, পারছিনা আমি একা কাজ করি,নিয়ে যা তোদের বাড়ী। তারা লোক
পাঠিয়ে বাড়ী মাপলো,দামদর করলো আবার। আমাকে আবার ডাকলো,আমার হাসব্যান্ডের ব্যপারে ডাক্তারী রিপোর্ট চাইলো,সব দেখে এই সিদ্ধান্তে এলো যে, আমাকে নয়’শ আশি ইউরো করে মাসে,
দিতে হবে। আর না হয় বাড়ী আমি নিজে
বিক্রি করে তাদের পয়সা ফেরত দিতে।
ব্যাংক বাড়ী ফিরিয়ে নেবেনা। বিক্রির চেষ্টাও করেছি,এক এজেন্সীর সাথে কথা বলেছিলাম,তারা বাড়ীর কেনা দামের অর্ধেক বলে। তাই আর বিক্রি করিনি।
এই নয়’শ আশি ইউরো দিয়েই চালাচ্ছি।
সেই এজেন্সী দু’মাস আগে ফোন দিয়েছে
আবার,আগে যা দাম বলেছিলো তার ডবল বলছে এখন। কারণ,বাড়ীর দাম বাড়ছে আবার।
আট, নয় বছর যাবত সে অসুস্থ্য। সেই থেকেই একা যুদ্ধই করছি জীবনের সাথে।
দিনের পর দিন তার অবস্থা খারাপই হচ্ছে।
গত বছর তিনদিন হারিয়েছে,ঘর থেকে বের হয়, ফিরতে পারেনা। তিনবারই পুলিশ
রিপোর্ট করাতে হলো। শেষেরবার প্রায় তিনদিন পর পাওয়া গেলো। ট্রেনের টিকিট কেটে চলে গেছে অন্য শহরে। পুলিশ খুঁজছে বার্সেলোনায়। পাওয়ার পর জানতে
চাইলাম,” ওখানে কিভাবে গেলে?” বলে,”জানিনা, তবে হঠাৎ খেয়াল হলো, মনে মনে ভাবলাম এটাতো আমার জায়গা
নয়। তারপর,ট্টেন লাইনের উল্টো দিকে গিয়ে আবার ট্রেনে ওঠেছি।”তারপর বার্সেলোনার পুলিশ বাসায় ফোন দিলে
আমরা টেক্সি করে বাসায় নিয়ে এসেছি।
তখনো একটু ভালো ছিলো,এখন প্রতিটা
দিন একধাপ করে খারাপ হচ্ছে।

যে মেয়েগুলো ছিলো তার জান,এখন তারা কি করে,কি পড়াশুনা করে কোন খবরই নাই। অথচ, বাবার কাছেই ছিলো তাদের পড়াশুনার হাতেখড়ি।
মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে যাই,ভাবি দেশে ফিরে যাবো। তার জন্যই ভাবি, আবার তার
জন্যই বিরত হই। তার শুধু ঔষধের খরচটা
বাংলাদেশের টাকায় ৯০ হাজার টাকা।
এখানকার সরকার দিচ্ছে,দেশে আমি
কিভাবে তার চিকিৎসার খরচটা চালাতে
পারবো! তারপর যেকোন মুহুর্তে হসপিটাল,এ্যাম্বুলেন্স কোথায় পাবো! এখানেতো এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে দেরী, আসতে দেরী নেই। দেশে এ’গুলো তো পাবোনা। কত কিছু যে ভাবি!

এখন আর একটা মুহুর্তও তাকে একা রাখা
যায়না। তিনজনের একজন সাথে থাকতেই হবে। প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ করতো,
কান্না কাটি করতো, কেন তার এমন অসুখ
হলো,সামলানো সমস্যা হতো,তখনও
একটু বুঝতো। এখন আর বুঝেওনা, কাঁদেওনা,দুনিয়ার কোন খবরও নেই।
তবে মেয়েগুলো অনেক খেয়াল করে,
যেমন বাবার জান ছিলো তেমনি তারাও জান দিয়ে বাবার যত্ন করে। ওদের একজনের কাছে রেখে আমি কাজে যাই।
দু’জন কখনোই এক টাইমে ঘর থেকে বের
হয়না। এভাবেই আমরা সময় ঠিক করে
নিয়েছি। আর কি করার আছে!
মাঝে মাঝে মানুষটার জন্য খুব কষ্ট হয়,কি
এ্যাকটিভ ছিলো,মেয়েদের জন্য কি উদগ্রীব থাকতো,গাড়ী চালিয়ে কাজে যাওয়া আসা করতো,আজ সে কিছুই বুঝেনা। আমিযে কিভাবে সংসার চালাচ্ছি
কিছুই বুঝছেনা।

তবে মেয়েদুটো অনেক বুঝে,দু’জনই বাবার জন্য করে,আমি নিশ্চিন্তে কাজ করতে
পারি। আমি শুধু কাজই করি,ছোট মেয়েটা
অফিসিয়াল সব কাজ করে,বিল দেয়া,
ফোনে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা,সব কাজ সে করে।

এইতো আমার প্রবাস কাহিনী। জীবন চলছে জীবনের মতো। কি পেলাম, কি পেলামনা সে ভাবনাটা এখন আর ভাবিনা।
দুটো লক্ষী মেয়ে আছে,এটাই আমার বড় পাওয়া। ওহ্,আর একটা কথা, যে মেয়েটা হবে বলে আমি একটু মন খারাপ করেছিলাম সে মেয়েটা আরো বেশী লক্ষী
হয়েছে। পড়াশুনায় বরাবরই ভালো ছিলো।
স্কুলের বৃত্তির টাকা দিয়ে কলেজে পড়েছে,কলেজের বৃত্তির টাকা দিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে,চার বছরের ভার্সিটি কোর্সে একবারও ভর্তির টাকা দিতে হয়নি আমাকে। উল্টো ভার্সিটির তরফ থেকে বার’শ ইউরো হাত খরচ পেয়েছে প্রতি বছর। সত্যি কথা বলতে গেলে সে তার বাবার মতো হয়েছে।
ইকনোমিক্সে গ্রাজুয়েশন করে একটা ভালো জব করছে। সামনের বছর মাস্টার্স করবে। তার বিয়েও দিয়েছি,জামাই থাকে
প্যারিসে। নেত্রকোনার ছেলে।জামাইটা খুব
ভালো হয়েছে।

বড়টা হয়েছে আমার মতো,একটু সহজ
সরল।
সব কিছুর পরও ভালো আছি বলবো, চলতে পারছি ওদের নিয়ে,আর কিছু
চাওয়ার নেই। শুকরিয়া আল্লাহর কাছে।

যারা এ’কদিন ধৈর্য্য ধরে আমার লিখা পড়েছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

শেষ হলো আজ আমার প্রবাস কাহিনী লিখা।

লেখক ; স্পেন প্রবাসী

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী