তুর্কি পরিবারে ভিন্ন আমেজের ইফতার

জাহিদুল ইসলাম সরকার:  জীবনে প্রথম রোজা দেশের বাইরে- তুরস্কে। এখানে রোজা প্রায় ১৭ ঘন্টা। তবে ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য তেমন কষ্ট হয় না। রোজায় হোস্টেলে ইফতারির সুযোগ হয়েছে খুবই কম। প্রতিদিনই কোন না কোন তুর্কি বন্ধুর পক্ষ থেকে দাওয়াত থাকে। তুর্কিদের মতো অতিথিপরায়ণ জাতি দুনিয়ায় আর কেউ আছে কিনা আমার জানা নেই। একটা উদাহরণ দেই, তুরস্কে বাসা ভাড়ার টু লেটে লিখা থাকে ১+১, ১+২,১+৩ অথবা ১+৪। তার মানে বাসায় বেড রুমের সংখ্যা যাই হোক না কেন, অবশ্যই ড্রয়িং রুম থাকবে একটি এবং তা আকারে দুটো বেড রুমের মতো বড়। তুর্কিরা মেহমানদের খুবই সমাদর করেন। মেহমানের আপ্যায়ন নিয়ে তুর্কি ভাষায় অনেক সুন্দর সুন্দর প্রবাদ-প্রবচন আছে।

আজ কোজায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দাওয়াত দিলেন। পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রলোক নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদের ভার্সিটির গেট থেকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। আবার ইফতার শেষে ড্রাইভ করে আমাদের হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলেন!

চমৎকার সুন্দর আবাসিক এলাকা। পাহাড়ের উপর ১৫ তলার এপার্টমেন্ট। সরকার নির্মিত এ আবাসিক এলাকাকে বলে কেন্ট।
এরদোগান সরকার মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এসব আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন বাসা বানিয়ে লটারীর মাধ্যমে বিতরণ  করে। যে কোন দল-মতের মানুষ বাসা পেতে পারে। অল্প কিছু এডভান্স দিয়ে বাকী টাকা ৮ থেকে ২৫ বছরের সহজ কিস্তিতের শোধ করলেই হল। এভাবে ১৪ বছরের শাসনে এরদোগান তুর্কি জাতিকে লক্ষ লক্ষ এপার্টমেন্ট উপহার দিয়েছে। তুরস্কে এখন গরীব বা মধ্যবিত্ত অধিকাংশ নাগরিকের থাকার মতো একটা আধুনিক ফ্লাট আছে।

যাই হোক, ড্রয়িং রুমে ডুকতে ভদ্রলোকের দুই ছেলে আমাদের সাদরে বরন করে নিল। প্রবেশের সাথে সাথে আরেক দফা মুগ্ধতা। বিশাল ড্রয়িং রুমের কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে মর্মর সাগরের নয়ানোভিরাম দৃশ্য। তারচেয়েও যা বেশী মুদ্ধ করল তা হলো, রুমের ওয়ালে সেট করা বিরাট লাইব্রেরী। প্রায় প্রতিটি তুর্কি পরিবারের পরিচিত দৃশ্য এটি। তুরস্কে যে একটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠছে তা বইয়ের প্রতি তাদের অনুরাগই বলে দেয়।

আজকে মেহমান হিসেবে আছি আমরা দুই বাংলাদেশী, এছাড়া আফগানিস্তান, মরক্কো, চাদ, ইয়েমেনের শিক্ষার্থীরা। ভদ্রলোকের বড় ছেলে শাফা গত সপ্তাহে বাইতুল মুকাদ্দাস ভ্রমন করে এসেছে। জেরুজালেম ও তেলআবিব শহরের জীবন্ত বর্ণনা শুনছি তার মুখে। তুর্কিরা হজ্জ ও উমরার পাশাপাশি কুদস জিয়ারাত খুব পছন্দ করে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ পযন্ত তিন পবিত্র মসজিদের দায়িত্ব ছিল তুর্কি খলিফার হাতে। ব্রিটিশদের চক্রান্তে মুসলমানদের প্রথম কেবলা ইহুদীবাদীদের দখলে চলে গেলেও এর প্রতি তুর্কিদের দরদ কমেনি একটুও। হয়ত অপেক্ষায় আছে আরেকট বিশ্বযুদ্ধের, যখন দখলদার ইসরাইলীদের হাত থেকে

জেরুজালেম মুক্ত করে আবার ফিলিস্তিনিদের হাতে ফিরিয়ে দিবে তুরস্ক। কিছুদিন আগে জেরুজালেমে আযান নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে ইসরাইলী সংসদ বিল পাশ করলে এর বিরোদ্ধে এরদোগানের বজ্র কন্ঠের হুংকারই বলে দেয় তুরস্ক শুধু মোক্ষক সময়ের অপেক্ষা করছে।

সাফার ৬ মাসে শিশু সন্তান উমর এলো কাকার কোলে চড়ে। মায়াভরা ফুটফুটে শিশুটিকে কোলে নেয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা। সবার আগে আমি কোলে নিলাম। আমার কোলে যেন মিশে গেল ওমর। একে এসে সবাই কোলে নিল। তুর্কি শিশুরা যেন একটু বেশীই কিউট হয়।

ইফতার আসন্ন। খাবারের পসরা সাজাচ্ছে পরিবারের ছোট ছেলে আবদুর রহমান। তুর্কিরা খাবারে সবার আগে খাবে স্যুপ। তুর্কি ভাষায় চরবা। সাথে থাকবে বাহারী রুটি। ইফতারের জন্য একে একে এলো শরবত, পোলাও, কোফতা, সিম তরকারি, জেরুজালেম থেকে আনা খুরমা, তরমুজ, চেরী, স্ট্রবেরী, নাম না জানা আরো কয়েক পদ ফল। ড্রয়িং রুমে দস্তরখান বিছিয়ে সবাই গোল হয়ে বসলাম। আযান শুনে ইফতার শুরু হলো।

খাবারের শেষে জামায়াতে নামাজ পড়লাম সবাই। তারপর শুরু হলো আরেক দফা। এবার তুরস্কের মশহুর মিষ্টি বাকলাভা। কয়েক লেয়ার বিশিষ্ট্য এ মিষ্টি যেই মুখে দেয় সেই এ মিষ্টির দিওয়ানা হয়ে যায়। সব শেষে চা। তুর্কিরা তুখোর চা-খোর জাতি। আবার এই পরিবারের আদি বাস কারাদেনিজ এলাকা অর্থাৎ কৃষ্ণ সাগরের তীরে। কারাদেনিজ চা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। আমাদের সিলেটের মতো। অনেক খাবার, অনেক গল্প। এবার বিদায়ের পালা। গৃহকর্তার বড় ছেলে সাফা আগামী শুক্রবার সেনাবাহিনীতে চলে যাবে ছয় মাসের জন্য। সবার থেকে বিদায় নিল। তুরস্কে সব যুবককে কমপক্ষে ছয় মাসের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষন নিতে হয়। যে কোন সময় দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ যাবার ডাক এলে যেন সাড়া দেয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে মরক্কো পযন্ত ভিন্ন দেশের মানুষের এক মিলনমেলা বসেছিল ইফতারে। তুর্কি পরিবারের আন্তরিক আতিথিয়েতায় ভূলেই গিয়েছিলাম কে কোথা থেকে এসেছি আমরা। মনে হচ্চিল আমরা যেন একই পরিবারের সদস্য। তাইতো ভাবি, তুর্কি জাতি এমন ভালবাসা আর সদ্বব্যবহারের গুনেই বিশ্বশাসন করেছে ৭ শত বছর।

লেখকঃ পিএইচডি শিক্ষার্থী, খোজায়েলী বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী