সুলতান সুলাইমান ও হুররামের সমাধীতে (পর্ব- ১)

জাহিদুল ইসলাম সরকার: 

সুলতান সুলাইমান সিরিজের কারণে বাংলাদেশী দর্শকদের খুব পরিচিত মুখ সুলতান সুলাইমান। তিনি ছিলেন ওসমানী খিলাফাতের স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ সুলতান। তার শাসনকাল ছিল ১৫২০ থেকে ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান সুলাইমান তৎকালীন যুগের সুপার পাওয়ার ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপশালী সুলতান ছিলেন। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল অংশ নিয়ে ছিলো তার সাম্রাজ্য। পৃথিবীর ৬ টি সাগরের মধ্যে ছিল তার নৌবহর। ভূমধ্যসাগর দাপিয়ে বেরানো ওসমানী নৌবহরের দাপটে তটস্থ থাকতো ইউরোপের রাজা-বাদশাহরা।

এ মহান সুলতানের সমাধীতে যাওয়ার সুযোগ হলো তুরস্কে এসে। ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটির ছাত্র মামুন ভাই প্রস্তাব দিল, কাল ফজরের নামাজ পড়ব আমরা সুলতান সুলাইমান মসজিদে। প্রস্তাবটি খুব ভাল লাগলো। কিন্তু এতো সকালে ফিন্দিকজাদে থেকে ইমিনুনুতে কিভাবে যাব? ফজরের অনেক আগে ঘুম থেকে ওঠলাম। রাস্তায় কোন গাড়ী নেই। ট্যাক্সী ভাড়া করে আমরা ৫ বাংলাদেশী ছাত্র রওনা দিলাম।

শেষ রাতের আলো আধারীতে যেন বিমূর্ত হয়ে ওঠেছে হাজার বছরের ইতিহাস। পথের পাশে কত শত প্রাচীন প্রাসাদ, মসজিদ, ইস্তাম্বুল প্রাচীর একে একে পেছনে ফেলে যাচ্ছি। অবশেষে সুলাইমানিয়া মসজিদের সামনে এলাম। বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার মিমার সিনানের বানানো একটি মাস্টাসপিস সুলাইমানিয়া মসজিদ। ইস্তাম্বুলের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ এটি। নবী ও বাদশাহ সুলাইমানের বানানো বিশাল বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদটি বানিয়ে সুলতান বুঝাতে চেয়েছেন তিনি দ্বিতীয় সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট। বসফরাসের সামনে মুখ করা সাত পাহাড়ের শহর ইস্তাম্বুলের তৃতীয় পাহাড়ের ওপর মসজিদটির অবস্থান। তাই শহরের সব অংশ থেকেই চোখে পড়ে। সামনে বিশাল খোলা প্রান্তর। সবাই মসজিদের দিকে ধাবমান। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। এতো প্রকান্ড মসজিদ কাছে গেলে পুরোটা দেখা যায় না। তাই দূর থেকে মসজিদের পূর্ণাঙ্গ রূপটি দেখতে চাইছি।

প্রকান্ড গম্বুজের পাশে দাড়িয়ে থাকা ২৩৬ ফুট উচু ৪ টি অভ্রভেদী মিনার যেন এখনো গৌরবের সঙ্গে প্রকাশ করছে ওসমানী সাম্রাজের শান শওকত। মিনারের ১০ টি ধাপের মানে সুলাইমান দশম সুলতান। সে সময় রাজ ফরমান অনুযায়ী, শুধু সুলতানের নির্মিত মসজিদে ৪ মিনার নির্মাণের অনুমতি ছিল। শাহজাদাদের নির্মিত মসজিদ ২ টি ও সাধারন মানুষের মসজিদ ১ টি মিনার। হঠাৎ আযানের শব্দ কানে এলো। বিশাল মসজিদের মিনারের আযানের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি যেন কেপে কেপে ইস্তাম্বুলের ইথারে ছড়িয়ে পড়ছে। সাড়ে চারশ বছর ধরে এখান থেকে মুয়াজ্জিন অবিরত ডেকে যাচ্ছে “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম”…. ওহে গাফেল মুসলমান, ঘুম হতে নামাজ ভাল।

এরদোগান সরকার মসজিদটিকে আধুনিক আলোক সজ্জায় সজ্জিত করেছে। ১৭৪ ফুট উচ্চতার গম্বুজ ও মিনারে আবছা আলোর দ্যুতিতে মসজিদটিকে রুপকথার রাজপ্রাসাদের মতো অপরূপ লাগছে। কামাল পাশার সময় তাদের ইসলাম বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে মসজিদের বড় জামায়াত থেকে গনপ্রতিরোধ আসতে পারে ভেবে সেক্যুলার সরকার তুরস্কের অনেক বড় মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছিল। এমনকি কিছু মসজিদকে ঘোড়ার আস্তাবল হিসেবে ব্যবহার করার মতো বেয়াদবী করা হয়েছে। বড় বড় বিলাসী প্রাসাদ বানালেও মসজিদগুলো রক্ষনাবেক্ষনে কোন বরাদ্দ ছিলো না। শ্যাওলা আর আগাছায় মলিন হয়ে উঠেছিল মসজিদের প্রাঙ্গন। এরদোগান ইস্তাম্বুলের মেয়র হয় ১৯৯৪ সালে। তিনি ইস্তাম্বুলের প্রাচীন সব মসজিদের সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের প্রকল্প হাতে নেন। শত বছরের অবহেলার ধুলি সরিয়ে আবার ফুটিয়ে তু্লে মধ্যযুগীয় ওসমানী শান-শওকত। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রায়ই বড় মসজিদে নামাজ পড়েন এরদোগান। ফলে মসজিদগুলোর যত্ন-আত্তিতে কারো অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

লেখকঃ পিএইচডি শিক্ষার্থী, খোজায়েলী বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী