ইস্তাম্বুলে ঈদ উদযাপনের অন্যরকম অভিজ্ঞতা

জাহিদুল ইসলাম সরকার:  জীবনে প্রথম দেশের বাইরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ঈদ করছি। বাংলাদেশী বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ করতে খোজায়েলী শহর থেকে ইস্তাম্বুলে আসা। তুরস্কের রাজধানী আনকারা হলেও ইস্তাম্বুলের সাংস্কৃতিক মুল্য অনন্য। প্রায় ১৬০০ বছর ধরে ইস্তাম্বুল ছিল রোমান, বাইজেন্টাইন ও অটোমান (উসমানী)-এ তিনটি প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের রাজধানী। এ সুদীর্ঘ সময়ে একে শাসন করেছে ১২০ জন সম্রাট ও সুলতান। এমন গৌরবময় ইতিহাস পৃথিবীর আর কোন শহরের নেই। সেই সাথে ৫০০ বছর ধরে ইস্তাম্বুল ছিল মুসলিম খিলাফাতের রাজধানী।

মসজিদের শহর নামে খ্যাত ইস্তাম্বুলে রয়েছে নয়নাভিরাম ও প্রকান্ড সব মসজিদ। ঈদের নামাজ পড়ার জন্য তুরস্কের বিখ্যাত সুলতান আহমেদ মসজিদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঈদের দিন সকালে ট্রামে উঠে দেখি এই সাত সকালেও বিভিন্ন দেশের নামাজিদের ব্যাপক ভীড়। একটা উৎসবের আমেজ সবার চোখে মুখে। কারো গায়ে আরব আলখেল্লা, কারো গায়ে আফ্রিকান পাঞ্জাবী। বহুজাতির মানুষের আবাস ভূমি ইস্তাম্বুল। তাই ট্রামে বাহারী পোশাকের মেলার দেখা মেলে।

সকাল ছয়টায় মসজিদের সামনে এসে পৌঁছলাম। ঈদ জামাত সকাল সোয়া ছয়টায়। সিদ্ধান্ত নিলাম মসজিদের ভেতরে নামাজ পড়বো। ওসমানী সুলতান প্রথম আহমেদের শাসনামলে ১৬১৬ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এটি ব্লু মসজিদ নামে বিদেশেীদের কাছে বেশী পরিচিত। মসজিদের ভেতরে মূল্যবান নীল টাইলস দিয়ে সাজানোয় মসজিদের ভেতরে এক ধরনের নীলাভ দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ায় একে ব্লু মসজিদ নামে ডাকা হয়।

বসফরাসের নীল জলরাশির পাশে অবস্থিত নীল মসজিদে রয়েছে ৬ টি সুউচ্চ মিনার। গগনচুম্বি মিনারগুলো দেখে মনে হয় নীল আসমানের সাথে যেন তাদের গভীর মিতালী। এখানে প্রায় ১০ হাজার মুসলমান একসাথে নামাজ পড়তে পারে।

ট্রাম স্টেশন থেকে মুসল্লীদের ঢল নেমেছে মসজিদের প্রাঙ্গনে। এই ইয়েমেনীকে আটকে দিয়েছে পুলিশ। তাদের ঐহিত্যবাহী আরবীয় পোষাকের সাথে কোমরে গুজানো থাকে এক ড্রাগার। আরবীতে নাম জাম্বিয়া। কিন্তু পুলিশ এই ধারালো অস্ত্রসহ তাকে মসজিদে যেতে দিবে না। ভীড় ঠেলে সামনে এগুলাম। সুলতান আহমেদের বিশাল খোলা ময়দানে মসুল্লিদের ভীড়।

পুরুষদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মহিলা মুসুল্লি নামাজ পড়তে এসেছে। অনেকে পুরো পরিবার নিয়ে নামাজে এসেছে। তুরস্কের সব মসজিদের নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকে তাই বিপুল সংখ্যক নারীও মসজিদে নামাজ পড়ে। বিশেষ করে বিশেষ ধর্মীয় উৎসবে এ হার আরও বেড়ে যায়। অনেক অমুসলিম পর্যটকও এসেছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ উৎসব দেখতে।

মসজিদের প্রবেশ পথে সবাইকে ওয়ান টাইম জায়নামাজ দেয়া হলো পৌরসভার পক্ষ থেকে। বিশাল মসজিদ কানায় কানায় পূর্ন হয়ে গেল। যারা ভেতরে জায়গা পায় নি তারা মসজিদের সামনের প্রাঙ্গনে ওয়ান টাইম জায়নামাজ বিছিয়ে বসে গেল।

ঈদের নামাজে ইমামের দরাজ কন্ঠের দীর্ঘ তিলাওয়াত শুনে মনটা গভীর আবেগে উদ্বেল হয়ে ওঠল। মনে হলো হায়, রমজান তো চলে গেল। আজ ঈদের নামাজ পড়ে কেউ সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরবে। আমি অধম কি আছি সেই সৌভাগ্যবানদের কাতারে?

নামাজের পর খুতবায় শাহী ইমাম মুসলিম বিশ্বের শান্তি কামনা করে দোয়া করলেন। আরাকান, সিরিয়া ফিলিস্তিন সহ সব নিপীড়িত মুসলমান দেশের নাম ধরে ধরে তাদের জন্য দোয়া করলেন। তুরস্কের মসজিদগুলোতে সব মোনাজাতে শামিল থাকে সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য ফরিয়াদ। সেই কবে ইস্তাম্বুলে অস্তমিত হয়েছিল খিলাফাতের সূর্য। তবে তুর্কিরা আজও সারা বিশ্বের মুসলমানদের খোজ খবর নেয়া থামায় নি। পুরো রমজান মাস জুড়ে তুর্কি ত্রানের বহর পৌছে গেছে সোমালিয়া, ইয়েমেন, গাজা কিংবা আরাকানসহ সারা বিশ্বের গরীব মুসলমানদের ঘরে। এখনো বিশ্বের সব নির্যাতিত মুসলমান দেশ বিপদে তুরস্কের দিকে তাকায়। সামরিক সহযোগীতার সক্ষমতা কম থাকলেও পুরো সামর্থ্য দিয়ে মানবিক সাহায্য পাঠায় তুরস্ক। এরদোগানের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে তুরস্ক এখন শেষ আস্থার জায়গা হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে মুসলিম মিল্লাতের মনে।

নামাজের পর সবার সাথে কোলাকোলি করলাম। এমন সময় আমাদের মুখে বাংলা কথা শুনে কিছু মানুষ এগিয়ে এসে পরিচিত হলো। তারা ইস্তাম্বুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরীজীবি বাংলাদেশী। বাংলা ভাষার সূত্র ধরে পেয়ে গেলাম কিছু দেশী ভাইকে। বুকে বুক মেলালাম। স্বজন-প্রিয়জন ছাড়া দূর বিদেশে একজন দেশী মানুষ পেলেও তাকে বড় আপন মনে হয়। সবাই একসাথে ছবি তুললাম।

মজার বিষয়, তুরস্কে ঈদুল ফিতরকে বলা হয় সেকের বাইরাম বা চিনি উৎসব। এই দিন তুর্কিরা শিশুদের সালামীর পাশাপাশি বিভিন্ন মিষ্টান্ন উপহার দেয়। মসজিদের সামনে দেখা মিলল এরকম দৃশ্যের। কিছু তুর্কি নাগরিক বিভিন্ন ধরনের চকলেট বিতরন করছেন নামাজে আগত শিশুসহ সব বয়সের মানুষদের। এছাড়া, নামাজের পর মুসল্লিদের মোবাইল কার থেকে স্যুপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

ঈদ উপলক্ষে তুরস্ক সরকার, ইস্তাম্বুলের জাদুঘরগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অন্যসময় দুর্লভ প্রত্মতাত্বিক নির্দশন সম্বলিত এ সব জাদুঘরে প্রবেশে চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয় পর্যটকদের।

বিকেলে ইস্তাম্বুলে অবস্থানরত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পিকনিক করার পরিকল্পনা করা হলো। ইয়েনি কাপিতে মর্মর সাগরের সৈকতে বসে একসাথে খাওয়া দাওয়া ও গল্প হবে। এভাবে বাংলাদেশী কমিউনিটি মিলে মিশে স্বজনের শূন্যতা কিছুটা হলেও কমিয়ে ঈদ উদযাপন করছে তুরস্কে।

লেখকঃ পিএইচডি শিক্ষার্থী, খোজায়েলী বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী