“তুমি কি পছন্দ করো মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে?”

আবুল কালাম ওয়াহিদঃ

পর্ব- ১

আমাদের অনেকেই আজকাল দুপুরে অফিস পাড়ার আশেপাশের রেস্তোরাঁতে খাওয়া-দাওয়া করি। অনেকে আবার বিশেষ বিশেষ দিনে সপরিবারে বা বন্ধুবান্ধবসহ নামকরা ফাস্টফুড এর রেস্তোরাঁতে খেতে যাই। মাঝেমাঝে শুনি ঐ সব রেস্তোরাঁতে বা ফাস্টফুড এর কোন কোন দোকানে মরা মুরগি বা কুকুরের মাংস রান্না করে বা ফ্রাই করে বিক্রি করার অপরাধে জরিমানা করা সহ বিভিন্ন শাস্তি দেয়া হয় আইন অনুযায়ী। কিন্তু যারা ঐ সব দোকানে খেতে যান, তারা যখন জানেন বা শুনেন যে তারা আসলে মরা মুরগি বা কুকুরের মাংস খেয়েছে, ঐ মুহূর্তে তাদের অনুভূতিটা কি রকম হয়? নিশ্চয়ই নিজের অজান্তে একটা বমিবমি ভাব চলে আসে বা অনেকে হয়তো বমি করেই ফেলেন। কিন্তু আমরা যে প্রতিনিয়ত নিজেদের অজ্ঞাতসারে মৃত ভাইয়ের মাংস খেয়ে চলেছি, সেই ব্যাপারে কি আমাদের কতটা সচেতন আছি? শুধু তাই নয়, মৃত ভাই এর মাংস খাওয়ার সাথে সাথে, নিজের মায়ের সাথে যিনা করার মতো পাপের সাথে নিজেকে জড়াচ্ছি( হে আল্লাহ্‌ আপনি আমাদের মাফ করুন), সেই ব্যাপারে কি আমাদের কোন খেয়াল আছে? স্বাভাবিক জ্ঞান বলে, এই রকম চিত্র কল্পনা করার আগেই মনে হবে, “হে ধরিত্রী, তুমি দুই ভাগ হয়ে যাও, আমি তোমার ভিতরে লুকিয়ে আমার লজ্জা ঢাকি”। কিন্তু আমাদের কি তা হয়? বরং আমরা সবাই প্রতিনিয়তই এই পাপের কাজগুলি করে যাচ্ছি।

শ্রদ্ধেয় ভাইবোনেরা, আমি “গীবত, মিথ্যা পর-নিন্দা, চগলখুরী” সম্পর্কেই কথাই বলছি। গীবত, মিথ্যা- পরনিন্দা বলতে বা শুনতে পছন্দ করেনা এমন মানুষের সংখ্যা বোধ করি খুবই কম। আমরা যেন গীবত, মিথ্যা পর-নিন্দা, চুগলখুরী নামক এই দুর্গন্ধময় নোংরা অভ্যাসগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে, অনেক সময় দরকার হলে খুঁড়ে বের করে আনতে খুব আনন্দ পাই। প্রাত্যহিক খাওয়া-দাওয়ার মতো এই ঘৃণিত নোংরা অভ্যাসগুলি আমাদের চিন্তাধারা, আচরণে, কথাবার্তায় এমন ভাবে মিশে গেছে যে অনেক সময় আমরা বুঝলেও এর থেকে বের হয়ে আসতে পারিনা। মনের অগোচরে এসেই পড়ে এই অভ্যাসগুলি। এই অভ্যাসগুলিকে আমরা অবসর সময় কাটানোর জন্য একটা মোক্ষম উপায় হিসাবে ব্যবহার করি। এই গুলি আমাদের

দৈনন্দিন আচারের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যে আমরা এখন এইগুলিকে স্বতঃসিদ্ধভাবেই খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করি। হয়তো ব্যতিক্রম আছে কিন্তু তাদের সংখ্যা হয়তো খুবই নগণ্য।

স্বাভাবিক রুচিতে ও নৈতিক-জ্ঞানে আমরা সবাই জানি যে কোন ব্যক্তির সামনে বা পিছনে তার সম্পর্কে সত্য বা মিথ্যা অপবাদ দেয়া, একজনের কথা অন্যজনের কাছে খারাপ উদ্দেশে বলা, খুবই খারাপ প্রবৃত্তি কিন্তু তারপরও আমরা এই অভ্যাস ত্যাগ করতে পারিনা।আমরা হয়তো জানিনা বা মনেই করিনা যে কুরআন ও হাদিসে এই ব্যাপারে খুবই কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কেন জানি এক ধরনের ভালোলাগা রসনামূলক হজমি বড়ির মতো কাজ করে এই অভ্যাসগুলি। মদ্য পান,জুয়া খেলা, যিনা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে বেশীর ভাগ মুসলিমরা যতোটা সতর্ক কিন্তু গীবত,পরচর্চা, চোগলখুরী করা যে আরও বেশী মারাত্মক পাপের ব্যাপার, এই সম্পর্কে আমরা যেন প্রচণ্ড রকম গাফেল।

যে কোন আসরে বা কোন আলাপচারিতায় বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম নিন্দনীয় ভাবে গীবত এবং পরচর্চা করা যেন স্বভাবসুলভ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈঠকে গীবত, পরচর্চা ছাড়া পুরো আলোচনাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।পারস্পারিক যোগাযোগের যতোগুলি মাধ্যম আছে এরা কোনটাই এখন বাদ নাই যেখানে এই গুলির নিরবিচ্চিন্ন চর্চা হয়না।অনেকটা নিরাপদ হবার কারণে Facebook হয়েছে উঠেছে গীবত করার জন্য একটা উৎকৃষ্ট মাধ্যম।

বর্তমানে তো একে পাপ বা নিষিদ্ধ কোন কিছু বলে মনেই করা হয় না। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে সঙ্গত

কারণেই আমাদের দেশের প্রচলিত ধারার রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের সমাজের বেশিরভাগ লোকদের তেমন শ্রদ্ধার ও সন্মানের স্থান নাই কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত আলেমদের প্রতি একটা বিশেষ শ্রদ্ধার ও সন্মানীয় স্থান ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হোল এখন আমরা দেখছি, সংখ্যায় খুবই নগণ্য হলেও, কিছু কিছু ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত আলেমগন বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। তার চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হোল, ইসলামিক ভাবে কোন বৈধ কারণ ছাড়াই কেউ কেউ অন্যকে “কাফের” এর মতো ভয়ানক উপাধিতে অভিযুক্ত করছেন। এটাই হোল শয়তানের খুবই সূক্ষ্ম চাল ও প্রতারণা। তাই কুরআনে ও হাদিসে আমাদের সবাইকে কঠোরভাবে নিষেধ করে সতর্ক করে দেয়া সত্ত্বেও এই ব্যাপারে একটা অগ্রাহ্য করার মনোভাব কাজ করে আমাদের মনোজগতে ও নৈতিক জগতে।

আমরা বাংলাভাষী মুসলিমরা সাধারনত পরনিন্দা, পরচর্চা ইত্যাদিকে সামগ্রিকভাবে “গীবত” বলে থাকি কিন্ত “ইসলামিক” পরিভাষায় এর ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশী। এই ধরনের মিথ্যা, আক্রমণাত্মক আলোচনা বা সমালোচনাকে “ইসলামিক পরিভাষায়” কয়েকটি ভাগে দেখা হয়।

ইসলামিক পরিভাষায় এই কুঅভ্যাসগুলিকে মোটামোটি তিন ভাগে দেখা হয়েছেঃ

১) গীবত ( Gheebah; Back-biting);

২) মিথ্যা অপবাদ বা মিথ্যা-দোষারোপ করা ( Buhtan; Slandering or False accusation);

৩) চোগলখুরী ( নামীমাহ-Nameemah বা Tale carrying): ঝগড়া ফাসাদ বা ভুল বুঝা-বুঝি বা গণ্ডগোল সৃষ্টি বা যে কোন খারাপ বা অসৎ উদ্দেশে একজনের কথা অন্যজনের নিকটে বলা।

রাসুল(সাঃ) উনার এক বিখ্যাত হাদিসে “গীবত”(Back-biting) এবং মিথ্যা অপবাদ বা মিথ্যা-দোষারোপ করা ( Buhtan) এর সংজ্ঞা সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। নবী করীম(সাঃ) বলেছেনঃ তোমরা কি জান, গীবত কি? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ গীবত হল তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। প্রশ্ন করা হলঃ আমি যা বলেছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থেকে থাকে, তাহলে আপনি কি বলেন? তিনি বললেনঃ তুমি তার সম্পর্কে যা বলেছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তো তুমি তার প্রতি “মিথ্যা-অপবাদ” বা “মিথ্যা-দোষারোপ” – (বুহতান) আরোপ করলে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৮৯, ৭০, বুখারী/৫৬১৩, আবূ দাঊদ/১৭৯৯, সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস নং-১১৪৫৪)

এই হাদিস থেকে বুঝা গেল যে ,“গীবত” হল কারো সম্পর্কে তার অনুপুস্থিতিতে সত্য হলেও এমন কিছু আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। ইংরাজীতে বলে “Back-biting”।

“বুহতান” বা “মিথ্যা-অপবাদ বা“ মিথ্যা-দোষারোপ করা” (Slandering or False accusation) হোল কারো সম্পর্কে মিথ্যা নিন্দা বা মিথ্যা দোষারোপ করা।

চোগলখুরী (নামীমাহ-Nameemah))হোল ঝগড়া ফাসাদ বা ভুল বুঝা-বুঝি বা গণ্ডগোল সৃষ্টি বা যে কোন খারাপ বা অসৎ উদ্দেশে একজনের কথা অন্যজনের নিকটে বলা।

কুরআন-হাদীস অনুযায়ী এই গুলি হলো মারাত্বক ও খুবই বড় ধরনের (কবীরা) গুনাহ এবং “ গীবত” এর চেয়েও আরও বড় ধরনের পাপ হোল “মিথ্যা-অপবাদ” বা“ মিথ্যা-দোষারোপ করা”।

মানুষ কেন গীবত, পরচর্চা ও পরনিন্দা করার বা চোগলখুরী করেঃ

গীবত, পরচর্চা ও পরনিন্দা করার অভ্যাস যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে ছিল এবং আজও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বলাই বাহুল্য যে এটা চলতে থাকবে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমরা অন্যের দোষ ত্রুটি উল্লেখ করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতে চাই ।তাই গীবতকে বা পরনিন্দাকে আমরা একটা আনন্দের ব্যাপার হিসাবে গ্রহণ করি। আবার অনেক সময়, নিজের কোন দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা অন্যের নিন্দা করে পার পেতে চাই। আবার অনেক সময়, আমরা আমাদের ইগো বা অহংকারকে চরিতার্থ করতে অন্য কারো গীবত বা পরনিন্দা করার মাধ্যমে নিজেকে বড়ো মাপের কেউ বলে পরিচিত করতে চাই। ব্যাপারটা এইরকম – অমুকের এই এই দোষ ত্রুটি আছে, আমার নাই তাই, আমি তার চেয়ে ভালো। কোন কোন সময় গীবত বা পরনিন্দা করার মাধ্যমে আমরা কারো ওপর আমাদের নিজেদের কোন ব্যর্থতার, অসাফল্যতার রাগ ক্ষোভ প্রকাশ করি।

গীবত, পরনিন্দা বা পরচর্চা আমাদের জীবনে কত ক্ষতি করে তা যদি আমরা বুঝতে পারতাম তাহলে আমরা আর এইগুলির চর্চা করতাম না। সমস্যা হচ্ছে ক্ষতির দিকটা আমরা কেউই সহজেই ও তাড়াতাড়ি দেখতে পাই না। আবার অনেক সময় বুঝতে পারলেও বা দেখতে পেলেও আমরা বিভিন্ন কারণে সেইগুলি নিয়ে তেমন মনোযোগ দেইনা।

আসলে এইগুলি যে অতি জঘন্য ও ঘৃণিত পাপ, এই সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা ও অসচেতনা, তদুপরি কুরআন ও হাদিসে এই অভ্যাসগুলিকে কি কঠোর ও ঘৃণিত ভাবে নিষেধ করা হয়েছেন, সেই সম্পর্কেও আমাদের প্রচণ্ড অজ্ঞতা ও অসচেনতা এবং অবজ্ঞাই মূলত দায়ী আমাদের এই নোংরা ঘৃণিত অভ্যাসগুলিতে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে। আরও দুঃখের বিষয় হোল যে, আমাদের দেশের ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিলে এমনকি ক্ষুদ্র পরিসরে শুক্রবার জুমুয়া খৎবাতে, কোন ঘরোয়া ধর্মীয় আলোচনায়ও গীবত, পরনিন্দা এবং চগলখুরী নিয়া কুরআন হাদিসে কি বলা হয়েছে খুব একটা আলোচনা হয়না।

গীবত, পরনিন্দা/পরচর্চা এবং চগলখুরি সম্পর্কে আমাদের কিছু ভুল ধারনাঃ

(১) “আমিতো কারো গীবত বা পরনিন্দা/পরচর্চা করছি না, এটাতো সত্য কথা বা ঘটনাতো সবাই জানে”। যারা অন্যের গীবত বা পরনিন্দায় লিপ্ত থাকে, এটাই হোল “গীবত বা পরনিন্দা/পরচর্চা” সম্পর্কে তাদের সবচেয়ে সবচেয়ে মারাত্মক অজ্ঞতা ও ভুল ধারণা। তাদের বদ্ধমূল ধারনা যে, কেউর সম্পর্কে “মিথ্যা কথা বললে বা রটালেই” সেটা গীবত বা পরনিন্দার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু আসলে কি তাই? গীবত ও পরনিন্দা সম্পর্কে রাসুল্লুল্লাহ(সাঃ) এর পরিস্কার হাদিসতো তা বলেনা। এর একটাই অর্থ হোল আমরা “গীবত ও পরনিন্দা” সম্পর্কে একটা অজ্ঞতা বা অস্পষ্ট ধারনা থেকেই এই রকম ভাবনা করছি। এবং এই অসত্য, অস্পষ্ট ধারনা বা

অজ্ঞতাই হোল আমাদের গীবত বা পরনিন্দা চর্চা করার মতো জঘন্য নোংরা অভ্যাসে লিপ্ত হবার মূল কারন।

(২) “আমিতো কারো পিছনে নিন্দা করছিনা, সবাই এই গুলি ইতিমধ্যে জানে, আমি বললে অসুবিধা কোথায়?”

এমন একটা মনোভাব অনেকের ভিতরে কাজ করে। এই রকম মনোভাব যদি কেউর ভিতরে কাজ করে, সে শুধু পরনিন্দা/পরচর্চা করেছেনা, সে একই সাথে মোনাফেকের পথ আনুসরন করছেন।আমরা কি একবারও ভাবতে পারিনা যে যদি সবাই ইতিমধ্যে জেনেই থাকে, তাহলে আমি কেন আগ-বাড়িয়ে বলে শুধু শুধু পাপের ভাগী হবো? ইতিমধ্যে জানা কথাগুলি কি আবার নুতন করে মানুষের মধ্যে ছড়ানো আমার জন্য খুবই জরুরী?

চলবে…

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী