মনের ভেতরে গোড়ামী পুষে রেখে নারীমুক্তি বা নারী-স্বাধীনতা সম্ভব নয়

নাসিমুন নাহারঃ চিল্লাচিল্লি গলাবাজি করে পুরুষকে গালি দিয়ে নিজেকে নারী হিসেবে জাহির করার যুদ্ধে নামা নারীবাদীদের প্রতি বহু যুক্তিসংগত কারনেই প্রবল এলার্জি আমার। আজ অনলাইনের বিখ্যাত পোর্টালের বদৌলতে বরাবরের মতই আবারো বুঝলাম আমার এলার্জি ভুল না।

আমি কখনোই এইসব নারীবাদী ট্যাগ লাগানো সুশীলদেরকে দেখিনি টু শব্দটি করতে কিছুদিন আগে যখন ঢাকা এবং বগুড়া মেডিকেলে নারী চিকিৎসক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লেগেছিল। নারী স্বাধীনতা বইল্যা চিল্লাও অথচ কর্মস্হলে নির্যাতিত নারীর বিপদে পাশে না থাকার নীরবতা আজব মনে হয়েছিল।

তারা তাদের নিজেদের পোর্টালে/মিডিয়াতে পুরুষকে গালি দেয়া একপেশে লেখা যেভাবে পাবলিসড করে তাতে মনে হতেই পারে ‘পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ এক একটা দাঁত নখ সমৃদ্ধ চিড়িয়া শুধু !’
এই কথার আবার ভুল ব্যাখ্যা কইরেন না সুশীল সমাজের নারীরা। আমি নিজেই একজন সাফারার। কিন্তু তাই বলে এটা কখনোই বিশ্বাস করি না ‘সকল পুরুষ ই নির্যাতনকারী !’ আবার সকল পুরষকেই প্রেমিক ভাবার মতো বিশাল হৃদয়ের নই আমি।

অনলাইনে এটাও প্রমাণ হলো তারা শ্রেণী বৈষম্যে কতটা গোঁড়া। এলিট ক্লাসকে সাপোর্ট করতে যেয়ে শুধু গরীর শ্রেণীকেই হেয় করা হয়েছে তা নয় বরং শিশু শ্রমের মতো সেনসেটিভ ইস্যুকে খেলো করা হয়েছে।

এসি রুমে বসে পাটভাঙ্গা জামদানি পরে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে ‘ক্লাসি’ হয়তো হওয়া যায় তবে তাতে আর যাই হোক নারী মুক্তি আসে না। নারী শুধু এলিট পরিবারের সদস্য না, নারী সেই হতদরিদ্র পরিবারের সাবিনা থেকে গার্মেন্টসে কর্মরত কুলসুম, নারী একা হয়ে যাওয়া জীবন যুদ্ধে জড়িয়ে টিকে থাকা মেয়েরাও, সারাদিন ঘর সংসার সামলাতে ব্যস্ত হোম মেকার মেয়েটিও, সকাল সন্ধ্যা অফিস সামলিয়ে ঘরকন্না করা মেয়েরাও এবং মেয়ে তারাও যারা আছে বলেই তাদের উপর ঘর বাচ্চা রেখে আমরা অফিসে কয়েকঘন্টা শ্রম দেবার সুযোগটা নিতে পারি। এদের সবার অধিকার আদায় করে শুধু সম্ভব নারীর সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করা সমাজে।

যেহেতু আমাদের দেশে কর্মস্হলে ডে কেয়ার সুবিধা খুবই অপ্রতুল সেহেতু ঘরে সাহায্যকারী মেয়েটির উপর নির্ভর না করে উপায় কি ? হুমমম অস্বীকার করার উপায় নেই অনেক সময়ই তাদের কাছে জিম্মি আমাদেরকে হতেই হয়। তবে এখানেও চিন্তার এবং কাজ করার ব্যাপার আছে। শ্রমের সাথে শ্রমের মূল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করার সুবাদে একটা সত্য কথা জেনেছি। বহু মহিলা শ্রমিক একথা বলেছেন–ম্যাডাম মাইনষের বাড়িতে কাম করলে টেকা পাওয়া যায় ঠিকই তয় সম্মান নাই। গরীব বইলা কি আমরা মানুষ না?

কথা কিন্তু সত্য। আমরা যারা অফিসে কাজ করি আটটা পাঁচটা তাদের সাথে তুলনা করলে চব্বিশ ঘন্টার শ্রমের মূল্য লজ্জা পাবে। তার থেকেও বড় কথা আমরা কি তাদেরকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ণ করি ?  এখনও বেশিরভাগ এলিট সম্প্রদায় রান্নাঘরের ঘুপচিতে ঘুমাতে পাঠান কাজের মেয়েটিকে ! নিজের সাথে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে খেতে দেই কজন আমরা ? আমার বাচ্চা যে লালন পালন করছে তাকে নিজের বিছানায় বসার অনুমতি কি দেই আমরা ? সর্বোচ্চ আউটকাম পেতে হলে ইনপুটও কিন্তু সর্বোচ্চ ই হতে হবে!
গৃহকর্তার সাথে গৃহকর্মীকে পেঁচিয়ে যাই বলি না কেন আমরা, এখানে মনে রাখা উচিত গৃহকর্মী কি গৃহকর্তা কে সিডিউস করছে !!! নাকি আমি আপনিই ব্যর্থ হচ্ছে ঘরের কাজে সহায়তা করা মেয়েটিকে নিরাপত্তা দিতে ? একবার ভাবুন তো অফিসে আপনার বস যদি আপনাকে use করে সেখানে আপনি ভিক্টিম হলে গৃহকর্মী ভিক্টিম না হয়ে উস্কানিদাত্রী কিভাবে হয় ?!!!

এই মনোভাব নিয়ে নারীবাদিতা !!!!
হাস্যকর।
অনেক কিছু আসলেই ভেবে দেখার দরকার আছে।

” গৃহকর্মী যখন গৃহকর্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখে” টাইপ বাক্যে কি প্রবল নারী বিদ্বেষ এবং মানসিক দীনতা ফুটে উঠেছে।  এত গোড়ামী মনের ভেতরে পুষে রেখে আর যাই হোক নারীমুক্তি নারী স্বাধীনতা সম্ভব নয়।

নারী স্বাধীনতা মানে এটা না পুরুষ হতে চাইবার চেষ্টা করা, জামা কাপড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ কমিয়ে বাড়িয়ে ফেলা, রাত বিরাতে bf এর টাকায় ইনজয় করা, জামাইর টাকায় সোনায় বাধানো বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে কিটি পার্টি করে বেড়ানো এবং অবাধ উশৃঙ্খল অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা।

নারী স্বাধীনতা হচ্ছে —- স্বাধীন ভাবে চিন্তাভাবনা করার বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা, নিজের আইডেন্টিটি তৈরি করা এবং ‘পুরুষের মত হতে চাই’ বলে প্রতিযোগীতা না নেমে বরং মানুষ হতে চাইবার চেষ্টাটুকু করা।

(বি .দ্র—- পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি so called নারীবাদীরা আমাকে শ্রাব্য অশ্রাব্য ভাষায় ভাসিয়ে দিবার আগে আমার মতো জন্মসূত্রে প্রাপ্ত এলিট পরিচয় এবং আশেপাশের সুবিধা আদায়ের পথগুলো আলমারিতে তুলে রেখে নিজের আইডেন্টিটি সম্পূর্ণ নিজে তৈরি করে দেখান সৎ এবং সম্মানজনক পথে এই দেশে -এই সমাজে। তখন দেখবেন জীবনের বাস্তবতা আর ঢাকা শহরে নিজ ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা দিয়ে অথবা বিদেশে বসবাস করে লেকচার দেয়াতে নারীবাদীতা আসলেই হয় না।)

লেখকঃ চিকিৎসক, কলামিস্ট।
.

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী