ওরাও মানুষ

জোরাইয যাহরা: –একটু ভাত দিবে মা! অনেক দিন হলো কিছু খাই না। বড্ড খিদে পেয়েছে,কাল সারারাত কিচ্ছুটি খাই নি. . .  এমতে বললেই ওরা আমারে খাইতে দিবো খালা!
— হু। যা, গিয়া দেগতে পারশ। (মাথা ঝাকিয়ে) দিবো দিবো…এই বলে তিনি তার কাজে লেগে গেলেন, ফুলের মালা বানাচ্ছে মহিলাটি। খালি গায়ে হাফপ্যান্ট পড়া কালো ছেলেটির নাম আবীর। রোদে পুরো ত্বক পুড়ে গেছে মনে হয়,বয়স খুব বেশী হলে ১০হবে। নতুন পেশায় নেমেছে আবির, পেশা ফুল বিক্রি । তাই শুরুর দিকে সমস্যা হচ্ছে। 
আজকে ওদের দল পার্কে গিয়ে ফুল বেচবে আর সাথের কয়েক জন ভিক্ষা করবে। যা টাকা আয় হবে খালাকে জমা দিতে হবে সন্ধ্যায়। আবীর এসবে নতুন তাই ওর বন্ধুরা ওকে শিখিয়ে নিচ্ছে, ওরা জানে টাকা আদায় করার প্রসেস। চলতি পথে ওর বন্ধুরা ওকে শিখাতে শিখাতে এগুচ্ছে, –হুন, যদি ছেরা ছেমরী এক লগে দেখশ, ফুল টা নিয়ে ছেমরীর হাতে দিয়া দিবি। আর বলবি “আফার জন্য একটা ফুল নেন ভাইয়া”, ঠিক এমনে কইরা ক’বি, দেখবি সব বেঁচা শেষ। আবীর মনোযোগ দিয়ে শিখে নিচ্ছে সব।
সামনেই একটা বেঞ্চে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে বসে আছে, ছেলেটির হাতে ক্যামেরা। আবির এগিয়ে গিয়েই কিছু ফুল মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিলো, “আফার জন্য একটা ফুল নেন ভাইয়া”. . . .
— যা ভাগ ব্যাটা! আমরা important কাজে এসেছি। মনটাই ভেংগে গেছে ওর মনে মনে বললো বললো, –আপনেগো important কাজ হগল জানা আছে ভেটকি মাছের মত ছবি তুইল্লা লাইক কইয়া চিল্লান । উল্টো পথে রাশেদ (যে ওকে শিখিয়েছিলো) কে গিয়ে বললো ওর ফুল বেচাঁ হয়নি, বন্ধু মহলে হাসাহাসির ধুম পড়ে গেলো সাথে সাথে।
আবিরের আর কিচ্ছুটিই ভালো লাগছে না..যেদিন থেকে এই পেশায় এসেছে খালি বকা শুনেই যাচ্ছে এক জনের না এক জনের। ও অন্য পথে চলে গেলো…  ঐ তো একটা ধনী লোক দেখা যাচ্ছে, দৌড়ে গিয়ে বললো? “স্যার কালকে সারা রাত কিছু খাইনি, দুটো টাকা দিবে? এই ফুল নিবে !!” –ভিক্ষা করিস কেনো? কাজ করতে পারিস না! যা ভাগ শালা..
— একটা কাজ খুঁজে দেও তাহলে, আমাকেতো কেউ কাজ দেয়না, ফুলই বেচঁতে হয় শুধু।
— তোদের কে জুতো দিয়ে দেয় না যে ভাগ্য ভালো।
আবীরের ভাগ্যটাই খারাপ যাচ্ছিলো , বড় সাহেবটিও কিছু দিলোনা, এদিকে খালার কাছে টাকা জমা না দিলে যে খেতেও দিবে না। আজ যে “ব’ড্ড ক্ষিদা লাগে আমার, দুইডা ভাতা খাইতে চাই, “ও আল্লাহ আমারে দুইডা খাইতে দেও, বড্ড ক্ষিদা লাগছে, হাটতে পারিনা !”
গত কাল বিকালে রাস্তায় একটি কলা কুড়িয়ে খেয়েছে, গাড়ী থেকে বড় সাহেবরা খোসা ছুড়ে মেরেছিলো। কিন্তু ভিতরে কিছুটা বাকি ছিলো তাই খেয়েছে …. 
ওর পাশেই আরেকটা লোক যাচ্ছে কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো, আবীর শেষ চেষ্টা করতে চায় তুবুও।
–ভাইয়া কালকার থেইকা খাই নাই ! একটা ফুল নিবেন?
–চল ব্যাটা একসাথে নাস্তা করি আমিও খাই নাই।
–সত্য! আমার লগে খাইবেন? আবীর যেনো স্বপ্ন দেখছে..
–তুইকি মানুষ নারে! সেদিনের আগন্তুকটি একজন ছাত্র ছিলো, কোচিং থেকে ফিরে নাস্তা করতে যাচ্ছিলো আবীর কেও নিয়ে নিলো সাথে। খাসীর পায়া আর নান রুটি খেয়েছে ওরা, ভরপেট খাইয়েছে ওকে, ও’র চোখে মুখে ছিলো তৃপ্তির ছাপ, কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি। আগন্তুকটি চলে গেলো। আবীর বেড়িয়ে পড়লো নতুন জোগাড়ের সন্ধানে।
দুনিয়াটা যার তিনি কাউকে না খাইয়ে রাখেন না, একটা না একটা উছিলায় ওদেরও পেট ভরে । ধনীর দুলালিরা যখন না খাওয়ার বায়না ধরে ওরা তখন ক্ষিদার জ্বালায় হাহাকার করে। পান্তা ভাত আর ইলিশ ধনীদের কাছে এক দিনের উৎসব হলেও ওদের কাছে একবেলা এই ভাত জোটাই ঢের। এইতো ওরা-“যাদের মুল্য আমরা কানা- কড়িও দেই না, আর তাদের জন্যই ৫০০ বছর আগ থেকে জান্নাত বুকিং করে রেখেছেন তিনি”। বেশ তো!!

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী