একা মা

নাসিমুন নাহারঃ সম্ভবতঃ মেডিকেল হোস্টেলে বাচ্চাসহ বসবাসের বিরল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ডাক্তার আমি !
তাও ছেলে বাচ্চা নিয়ে লেডিস হোস্টেলে মাসের পর মাস কাটানো জিদি মা !
আমার ফ্লোরের বেশিরভাগই ছিল ফাইনাল প্রফ পরীক্ষার্থী, আমার জুনিয়র কিন্তু ভীষন কো অপারেটিভ ছিল প্রত্যেকে। আর আমার ছেলে তো best kid of the world………..

আমার মেডিকেল কলেজের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করে, কান্নাকাটিসহ মইরা যামু বাচ্চা ছাড়া ময়মনসিংহে থাকতে হলে/বাচ্চা নিয়ে ইন্টার্ন করতে না দিলে জীবনেও ইন্টার্নশীপ শেষ করমু না/ প্রয়োজনে তিনবেলা ডিউটি কইরা দিমু/বেতন লাগবে না/এক মিনিট দেরী করে ওয়ার্ডে আসমু না কসম কাটাসহ যাবতীয় ঘ্যানঘ্যান করে তাদেরকে ত্যাক্ত বিরক্ত করে শেষ পর্যন্ত আমার প্রচন্ড জিদ “ছেলেকে সাথে নিয়েই কর্মজীবন শুরু করব এবং আমি পারব ই” বাস্তবে রূপ নেয়।সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আর আমার অপরিসীম মনের জোরের জন্যই ঠিকই পেরেছিলাম নিজের দায়িত্ব ভালো ভাবে বুঝে নেবার আগেই সন্তানের দায়িত্ব একা নিয়ে, দায়িত্বশীলভাবে ফাঁকিবাজীর তকমা না পাওয়া বরং সিনসিয়ার ইন্টার্ন হিসেবে ইন্টার্নশীপ শেষ করতে।

ফলে আমাকে তেমন কোন সমস্যাতেই পড়তে হয়নি হোস্টেলে বাস করা নিয়ে।
কেন যেন সারাজীবন ই কিছু মানুষের অন্ধ ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং ভরসা আমি পেয়েই যাই………….

হোস্টেলের বেডগুলো সাধারণত ছোট ছোট হয়। তাই দুটো সিঙ্গেল বেড জোড়া দিয়ে ডাবল বেড বানানোর বুদ্ধি আমার রুমমেট এবং হোস্টেলমেটরা দিল।

রাইস কুকারে রান্না করতাম বাবুর জন্য নুডলস, সুজি, সেমাই, ডিম পোচ, সবজী খিচুড়ি, পোলাও, ভাত, পায়েস, মাংস………..গোসলের গরম পানিও ফুটিয়ে নিতাম এই রাইস কুকারেও ! স্মৃতি হিসেবে ঐ কুকারটি এখনও আমার সংসারে স্থান দখল করে রেখেছে।

হোস্টেলের এক খালার নাতনী তখন প্রেগন্যান্ট ছিল। পারিবারিক কিছু অশান্তি চলছিল মেয়েটার। খালাকে বললাম— তোমার নাতনিকে বলবা কাল থেকে সকাল সাড়ে সাতটা হতে রোজ দুপুর তিনটা পর্যন্ত আমার ছেলেটার সাথে আমার রুমে থাকতে। দেখে রাখবে আমার বাচ্চাটাকে। মর্নিং এ ইন্টার্নদের প্রচুর কাজের চাপ থাকে— ফলোআপ থেকে রাউন্ড, ওটি এসিস্ট, সেমিনার। তাই সকালে বাবুকে নিব না হাসপাতালে। ইভনিং আর নাইট ডিউটিতে নিয়ে যাব বাবুকে আমার সাথে। ও আমার ছেলেকে দেখে রাখবে আর আমি ওর অনাগত বাচ্চার জন্য আমার সাধ্যে যা যা করা সম্ভব তাই তাই করব। খালা কথা রেখেছিল, আমিও চেষ্টা করেছি কথা রাখার জন্য।

একদিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎই আহ্ নাফ দড়াম করে বিছানা থেকে ফ্লোরে পড়ে যায়। তখন ওর বয়স আট-ন মাস হবে, বসতে পারে, ভালো করে হাঁটা তখনও শেখেনি। শব্দটা এত জোরে হয়েছিল পুরো ফ্লোরের মোটামুটি সব মেয়ে দৌঁড়ে ছুটে এসেছিল আমাদের রুমে। সবার সে কি উৎকণ্ঠা। বরফ, ঠান্ডা পানি,  চকোলেট নিয়ে বাবুকে ঠান্ডা করার আপ্রাণ চেষ্টা।
চোখের জল আড়াল করতে করতে বুঝেছিলাম আমরা মা ছেলে পৃথিবীতে একা নই………. বহু মানুষ আছে আমাদেরকে টেক কেয়ার করার জন্য।

—-এটা ছিল আমার মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নশীপের সময়কার হোস্টেল লাইফের ঘটনা।

তখন থেকে আজকে পর্যন্ত আমাকে কখনোই একদিনের জন্য হলেও বেকার জীবন কাটাতে হয়নি। বাচ্চাকে সাথে নিয়েই জব করে যাচ্ছি।
প্রয়োজনে জব চেইন্জ করেছি, ভালো জবের অফার ফিরিয়ে দিয়েছি। তবুও বাবাটাকে বাসায় একা রেখে জব করিনি।
যে শূন্যতা আমার ছেলের জীবনে আছে, যার জন্য সে নিজে কিছুতেই দায়ী নয়, সেই শূন্যতা কে খানিকটা কমানোর চেষ্টা আমাকেই তো করতে হবে, তাই না ?

কিছু বছর শেষে আজ যখন দেখি আমার ছেলে বুঝতে পারে মায়ের অনুভূতিটুকু, নিজেই যখন বল–মা কত sacrifice করেছ আমার জন্য……..

তখন সত্যিই অনেক কান্না পায়, আনন্দে।
মায়েরা কখনো সন্তানের জন্য sacrifice করছি ভেবে কিছু করে না। এটাই তার কাজ, এটাই তার জীবন— এটা ভেবেই সব করে।
সন্তান তো আলাদা কেউ না।
আমারই অস্তিত্ব, আমারই ভবিষ্যত পৃথিবী— আমার আহ্ নাফ।
ভালোবাসি বাবা ……..
ধন্যবাদ, আমার জীবনে আসার জন্য।

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী