শিশুদের কমফোর্ট জোন

কানিজ ফাতেমাঃ মানুষ মাত্রই তার কমফোর্ট জোনের ভেতরে থাকতে চায়, কমফোর্ট জোনের বাইরে বের হতে সবারই অস্বস্তি বোধ হয়, কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে নিজের ওপর জোর প্রয়োগ করতে হয়। একারণেই আমরা সচরাচর নিজেদের কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে চাইনা। এমনকি আমরা যদি জানিও যে আমাদের কমফোর্ট জোনের কোনো একটি ব্যাপার আমাদের জন্য ক্ষতিকর, তারপরও আমরা সহজে এর থেকে বের হতে পারিনা।

আমাদের এই কমফোর্ট জোন মূলত তৈরী হয় ছোট বয়সে, বিশেষ করে জোনের ভিত্তিটা। বয়স যত বাড়তে থাকে এই কমফোর্ট জোন পাল্টানো ততটাই কঠিন হয়ে পরে। তাই ছোট বয়স থেকেই শিশুর কমফোর্ট জোন তৈরীর দিকে বাবা-মায়ের খেয়াল রাখা জরুরী।

কেসস্টাডি –

আয়েশার বয়স নয় বছর। সে মসজিদে যেতে পছন্দ করে, প্রতি শুক্রবার সে তার বাবাকে তাড়া দেয় তাকে মসজিদে নেবার জন্য। সামিন তারই কাজিন, একই বয়সের। কিন্তু সে মসজিদে যেতে চায়না – মসজিদ বোড়িং। বাবা-মা সামিনকে এখন মসজিদে নিতে অনেক চেষ্টা করছে – কিন্তু সে কোনো না কোনো বাহানা বের করে মসজিদে না যাওয়ার জন্য।

সামিনের বয়স যখন ১৬ সে তখন আর মসজিদে যায় না, ফ্রাইডে নাইট পার্টিতে যায় বন্ধুদের সাথে। বাবা-মা তাকে মসজিদে নিতে চাইলে সে বলে- তারা তার স্বাধীনতায় ইন্টারফেয়ার করছে। তার লাইফ, সে তার নিজের “পছন্দ মতো” চালাতে চায়। ফ্রাইডে নাইট পার্টিতে যেতে নিষেধ করলে তার যুক্তি – পার্টি ফান।

কয়েক বছর আগে-
৫ বছর বয়সে আয়েশা তার বাবার সাথে প্রতি শুক্রবার মসজিদে যেতো জুমার নামাজে। সে খুব একটা নামাজ পরেনি, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলেছে। খেলার ফাঁকে ফাঁকে নামাজে দাঁড়িয়েছে, নামাজ শেষে বাবার সঙ্গে মসজিদের ম্যাট গুছিয়ে দিয়েছে, চেয়ার সাড়ি করতে সাহায্য করেছে। ফলে মসজিদ তার জন্য কমফোর্ট জোন, এখানে সে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, মসজিদে আসা অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। একারণেই এখন সে মসজিদে যেতে লজ্জা বোধ করে না, তার অস্বস্তি বোধ হয়না, বরং না আসলে তার ভালো লাগে না।

সামিন এর তখন ৫ বছর। সামিনকে নিয়ে তার বাবা-মা মসজিদে খুব একটা যায়নি। বাবা-মা মনে করেছে সে এখনো ছোট, তার জন্য মসজিদে যাবার থেকে অন্যান্য একটিভিটি জরুরী, আরেকটু বড় হলে তারপরে মসজিদে নেয়া যাবে। তারা তাকে নিয়ে নিয়মিত পার্কে গিয়েছে, সে বন্ধুদের বার্থডে পার্টি জয়েন করেছে, সে সকার প্র্যাকটিসে গিয়েছে। বাবা -মা তাকে নিয়ে সবকিছুই করেছে; কিন্তু মসজিদে তেমনটা নেয়নি। ফলে নয় বছর বয়সে এসে মসজিদ তার কাছে কমফোর্ট জোন নয়, বরং বার্থডে পার্টি তার কাছে বেশী পরিচিত পরিবেশ। মসজিদে সে অস্বস্তি বোধ করে, একারণেই মসজিদ তার কাছে ভালো লাগে না। মসজিদে তার কোনো বন্ধু নেই; তার বন্ধুরা সব অন্যান্য জায়গায়। মসজিদে আসা অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে সে ঠিক মিশতে পারছে না, তার খুব সংকোচ বোধ হয়। ষোলো বছর বয়সে এসে সে মসজিদে একেবারেই যায়না, তার পাঁচ বছরে তৈরী হওয়া কমফোর্ট জোনের ওপর ভিত্তি করে সে তার চারপাশ তৈরী করছে।

একইভাবে ছোটবেলা থেকে কোরআন তেলোয়াত শুনতে অভ্যস্ত শিশুদের জন্য এটাই হবে তার কমফোর্ট জোন, আর মিউজিক শুনতে অভ্যস্ত শিশুদের জন্য সেটাই হবে কমফোর্ট জোন। তবে এর অর্থ এই নয় যে পার্ক, বার্থডে পার্টি, সকার , সুইমিং , বা মিউজিক খারাপ। মূল কথা হলো ছোট বয়সেই খেয়াল রাখতে হবে শিশুর কমফোর্ট জোন কোথায় তৈরী হচ্ছে, কারন কিশোর বয়সে তারা এর ওপর ভিত্তি করেই তাদের বলয় তৈরী করবে।

লেখকঃ শিক্ষক, ক্যালগেরী ইসলামিক স্কুল, কানাডা

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী