ধর্ষণ এখন জাতীয় দূর্যোগ

ডা. মো. তাজুল ইসলামঃ 

বজ্রপাতে প্রচুর মানুষ মারা যায় বলে বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে।  বাংলাদেশে ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত মৃত্যুর হারও অনেক। এখন সময় এসেছে এটিকেও দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার। আমাদের অনেকে গর্ব করে বলেন, অপরাধ, ধর্ষণ ইউরোপ-আমেরিকায়ও অনেক হয়।   কিন্তু তারা এটি বলে না, সেখানে ধর্ষণের হার ক্রমেই কমে আসছে। আমেরিকায় নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ধর্ষণ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তারা এটিও বলে না, ওই সব দেশে প্রতিটি অপরাধ, ধর্ষণের তদন্ত ও বিচার হয়। আর আমাদের দেশে শিশুকন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে অপমান-অভিমানে হজরত আলী তাঁর মেয়েসহ ট্রেনের নিচে আত্মাহুতি দেন।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষিতা হওয়ার পর পাপিষ্ঠদের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতি জেগে উঠেছিল। কিন্তু আবারও সেই বনানীতেই একই কায়দায় জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে এক অভিনেত্রীকে ধর্ষণের সংবাদ এসেছে। ধর্ষণের এ ধারা কি চলতেই থাকবে। রেইনট্রির সে খবর সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচণ্ড প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় প্রভাবশালী হলেও আসামিরা ধরা পড়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার, এক শ্রেণির মানুষ নির্যাতিতা মেয়েদের পোশাক, অবাধ মেলামেশাসহ তাদের অভিভাবকদের নিয়ে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে চলেছে।

কিন্তু মোটা দাগে কয়েকটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে:  ধর্ষণ কোনো যৌন বিষয়ক সমস্যা নয়, এটি একান্তই নারীর প্রতি সহিংসতা ও অপরাধ বিষয়ক ঘটনা।  ধর্ষণ নির্যাতিতা নারীর জীবনে এক চরম বেদনাদায়ক এবং অপমান ও গ্লানির ঘটনা। এটি মানব- সৃস্ট দূর্যোগের অন্যতম একটি, যে স্মৃতির যন্ত্র্রণা তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। একজন নারীর বুনিয়াদী সত্তাকে এটি ভেঙ্গে চূড়ে দেয়। সমাজের কাছে সে ও তার পরিবার কি নিগ্রহের মধ্যে পড়ে তা একমাত্র ঐ নির্যাতিতা ও তার পরিবার জানে। কোথায় তাদের প্রতি সহমর্মি হয়ে তাদের দূর্ভোগ ও কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করবো, না উল্টো তাদের গভীর আবেগীয় ক্ষতে “অপবাদ, দুর্নামের লবন ছিটিয়ে” দিয়ে তাদের ক্ষত আরো গভীর করে তুলছি। অথচ ইসলাম ধর্মেও ধর্ষনের শাস্তি পাথর মেরে হত্যা করার কথা বলা আছে।

কিন্তু নর- নারীর সমতা বিষয়ে আমাদের অগ্রগতি গত কয়েক শতকের মাত্র। এ অগ্রগতির কিছু দিক তাৎপর্য্যপূর্ন হলেও কিছু দিকের অগ্রগতি নিতান্তই হতাশাজনক। তার অন্যতম একটি হলো নারীর “মানুষ” হিসেবে পরিচিতির স্বীকৃতি। পুরুষের কাছে নারীর এখনো মূখ্য পরিচয় “বিনোদন সঙ্গী, কাম সঙ্গী” হিসেবে। শিক্ষিত, সুশীল পুরুষরা বাহ্যিক ভাবে নারীর প্রতি তাদের কাম ভাবনাকে সফিস্টিফিকেসনের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করে, তবে দানব প্রকৃতির পুরুষ সরাসরি হামলে পড়ে- এ হচ্ছে পার্থক্য। নারীকে যৌনতার বাইরে রেখে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার সাংস্কৃতিক চেতনার বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত কিছু পুরুষের কামনার দ্বারা নারীর ধর্ষিতা হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
ধর্ষণের ঘটনাগুলো কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

১. পরিস্থিতি অনুযায়ী : অভিসার বা দাওয়াত ধর্ষণ (বনানীর ধর্ষণ), শিশু ধর্ষণ (যোনি কেটে বড় করে ধর্ষণের মতো চরম নিষ্ঠুর ঘটনা কিছুদিন আগের খবর মাত্র), জেলখানায় ধর্ষণ, পরিচিতজন দ্বারা ধর্ষণ (বেশির ভাগ ধর্ষণ এ পর্যায়ের), সম্মতি দেওয়ার বয়স হয়নি তেমন বালিকা ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, দাম্পত্য ধর্ষণ, নিকটাত্মীয় দ্বারা ধর্ষণ ইত্যাদি।

২. ধর্ষকের লক্ষ্য অনুযায়ী: ক) ক্রুদ্ধ ধর্ষক : এদের লক্ষ্য হচ্ছে নির্যাতিতাকে অপদস্থ, অপমান করা, তার চরিত্র নষ্ট করা। এরা ধর্ষিতাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে থাকে। খ) ক্ষমতা দেখানো ধর্ষক : এদের নিজের সামর্থ্য, সক্ষমতা সম্পর্কে থাকে নেতিবাচক ধারণা। এই মানসিক ঘাটতি পূরণ করতে তারা নিজেদের কর্তৃত্ব, শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা দেখাতে ধর্ষণ করে থাকে। এরা মৌখিকভাবে হুমকি দিয়ে, অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে থাকে। তারা ধর্ষণ নিয়ে ফ্যান্টাসিতে মত্ত থাকে এবং নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দেখে।

সিলেটের বালাগঞ্জে চার সন্তানের মাকে গণধর্ষণ করে মেরেই ফেলা হলো; পাঁচ বছরের মেয়েকে ব্লেড দিয়ে তার যোনিপথ বড় করে ধর্ষণ; রাস্তার যে ভিখারি নারী ধর্ষিত হয়েছিল তাদের গায়ে কি উগ্র যৌন আবেদনময়ী পোশাক ছিল, তারা কি গ্লামারাস নারী ছিল? মনে রাখতে হবে, ধর্ষিত হয় সব বয়সের নারী, সব সংস্কৃতি-সমাজ-জাতি-ধর্মের মানুষ। ধর্ষকের কোনো বাছবিচার নেই। তাই এটি নারীর প্রতি সহিংসতা, গুরুতর অপরাধ।

পুরুষরা অধিকতর যৌনকাতর, তারা সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। তাই কোনো না কোনোভাবে তাদের তাড়না মেটাতে হবে, এটিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিজস্ব বানানো ধারণা। প্রকৃতপক্ষে নর ও নারী সমান যৌন চাহিদাসম্পন্ন। সমাজ নারীদের চাহিদাকে দমিয়ে রাখার শত বন্দোবস্ত করে রেখেছে। অন্যদিকে পুরুষের লালসা চরিতার্থ করার নানা রকম কুপথ খুলে রেখেছে। বেশির ভাগ পুরুষই নারীর মতো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শুধু গুটিকয়েক পুরুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না।

যদি আগে কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়েও সে অধিকার থাকবে, নারী একবার কাউকে সম্মতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সব সময়ের জন্য সেটি বহাল থাকবে। যেকোনো মুহূর্তে নারী তার মত বদলাতে পারে এবং পুরুষকে সেখানেই থেমে যেতে হবে। তা না হলে সেটি ধর্ষণ (এমনকি বিবাহিত জীবনেও এটি সত্য)।

কেউ কেউ বলে থাকেন রাত-বিরাতে নারীর একা চলাফেরা ধর্ষণের একটি কারণ। মনে রাখা প্রয়োজন, মাত্র ১০ শতাংশ ধর্ষণ ঘটে বাইরের অপরিচিত লোকদের দ্বারা। তা ছাড়া ধর্ষণ হয় ঘরে, কর্মস্থলে, কলেজ ক্যাম্পাসে, যেগুলোকে আমরা নিরাপদ ভাবি। তাই এই খোঁড়া অজুহাতে নারীকে ঘরবন্দি করে রাখা, মুক্ত জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত করা অন্যায় কাজ। জঙ্গির ভয়ে সরকার যখন আমাদের পুরুষদেরও সন্ধ্যার আগে সব অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে ঘরে ফিরতে বাধ্য করে তখন কি আমরা বলি না, নাগরিকের নিরাপত্তা সরকার দেবে, কেন আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা দেবে? একই কথা নারীর বেলায় কেন খাটবে না?

ধর্ষিতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই, হাড় ভাঙেনি, তাহলে তার নীরব সমর্থন ছিল। প্রথমত অকস্মাৎ আক্রমণ, হুমকির মুখে নারী ফ্রিজ হয়ে যেতে পারে। আকস্মিক বিপদে পড়লে আমাদের ব্রেইন তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়—ফ্লাইট (দৌড়ে পালানো); ফাইট (লড়াই করা) এবং ফ্রিজ (নিশ্চল হয়ে পড়া, মূর্তির মতো অচল হয়ে পড়া)। সংগত কারণেই ধর্ষণজনিত পরিস্থিতিতে ব্রেইন ফ্রিজ হওয়াকে চয়েজ করবে। এই চয়েজ তাত্ক্ষণিক ও অটোমেটিক। এতে ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো সুযোগ নেই।

সমাজ নারীকে ‘ডি-পারসোনালাইজ’ করে অধিকতর ‘সিঙ্গুলাইজ’ করার নানা পন্থা বের করে রেখেছে; নারীর যৌন স্খলন মানে সব পবিত্রতা নষ্ট, অন্য সব পুুরুষের জন্য সে শরীর ঘৃণ্য—এমন ধারণাসহ ওপরে বর্ণিত মিথগুলো না ভাঙতে পারলে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা কমার সুযোগ কম। তবে এসব দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের আগে ধর্ষিতা নারীর আবেগগত ক্ষত নিরাময়ে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কিথ নামে এক বিদেশি ধর্ষিতা নারী বলেন, ‘আমার এ ক্ষত প্রকৃতপক্ষে নিরাময় হতে শুরু করে তখন, যখন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, যা ঘটেছে তার জন্য আমি দায়ী নই। ’ আসুন, এই নির্যাতিতা, অপমানিত, বিপর্যস্ত নারীদের পাশে দাঁড়াতে না পারলেও তাদের আবেগীয় ক্ষতের ওপর ‘বদনামের, অপবাদের’ লবণ ছিটিয়ে সে ঘাকে আরো গভীর করে না তুলি।

লেখকঃ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান; কমিউনিটি এন্ড সোশাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ
জাতীয় মানসিক স্বাস্হ্য ইনস্টিটিউটও হাসপাতাল

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী