মাতৃত্ব একটি পেশার নাম

আফিফা রায়হানাঃ দুই ঘন্টা ধরে চেষ্টা করছিলাম, মেয়ে যাতে একটা ন্যাপ নেয়। ক্রমাগত বিরক্ত করছে, চোখ ডলছে, কিন্তু ঘুমাবে না। আমি চাচ্ছিলাম ন্যাপটা বিকাল ৫ টার ভিতর নিয়ে শেষ করুক, নইলে রাত জাগবে। বাচ্চাদের খাওয়া ঘুম ঠিকমতো না হলে, এদের নিজেদেরও মাথা খারাপ থাকে, মায়েদেরও মাথা খারাপ করে দেয়। অনেকক্ষন বহু সাধ্য সাধনার পর, সমস্ত ধৈর্য্য শেষ করার পর, সে ঘুমালো, তাও ৫ টার পর। রাতে কি সিন হবে বুঝতেই পারছি। মেয়ে ঘুমানোর পর ভাবছিলাম, এই যে দুইটা ঘন্টা, খালি ঘুম পাড়ানোর চেস্টাতেই গেলো। দেখতে গেলে, কাজের কাজ কিছু হয় নাই। ফিজিক্যাল, মেন্টাল পরিশ্রম গেলো, এই সময়টায় যদি বাসার বাইরে শ্রমভিত্তিক/মেধাভিত্তিক কোনো কাজ করতাম, ঘন্টা প্রতি মিনিমাম ওয়েজ হিসাব করলেও, ২০ ডলার আর্ন হতো। এই টাকা দিয়ে অন্য কিছু না হোক, গোটা মাসের জন্য এক বস্তা চাল কেনা যেতো। এক বস্তা চাল না কিনার ব্যবস্থা না করে, আমি একটা বাড়ন্ত বাচ্চার ঘুমের ইন্তেজাম করছি, সোসাইটাল ভিউপয়েন্ট থেকে এটা কোন কাজেরই না। আবার নিজের না হয়ে অন্যের বাচ্চার দেখাশোনা করলেও কিছু পয়সা আসে, এইটাকে বলে বেবিসিটিং, সেটা আবার খালি কাজের না, বেশ কাজের।

বাচ্চা পালা রিপিটেটিভ কিছু কাজের সমন্বয়। বয়স ভেদে প্যাটার্ন চেইঞ্জ হয়, বাট আগাগোড়াই রিপিটেটিভ। ভেবে দেখেন, দিনের পর দিন আপনি একই কাজ করে যাচ্ছেন। ২৪/৭ অন ডিউটি। দিনে-রাতে, সময়ে-অসময়ে। হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে অন্যরা পাশে থাকুক, না থাকুক, মা’কে মায়ের ভূমিকায় থাকতেই হয়। কাউকে আপনি বাচ্চাকে খাওয়াতে দিলেন, সে না পারলে রেখে দিলো। মা’তো আছেই। ঘুম পাড়াতে দিলেন। না পারলে রেখে দিলো। মা’তো আছেই। মা’য়ের কে আছে! পারতে তোমাকে হবেই। দিন শেষে, মা’ও একটা মানুষ। তার শারীরিক-মানসিক কষ্ট হয়। মাসে কিছুসময় মুড সুইং হয়। তার ধৈর্য্য একদিনে তালগাছ হয়ে যায় না। আল্লাহ মা বানিয়েছেন একটা মেয়েকে, তার মানে এই না, সে একই সাথে ১৪ টা বাচ্চা পালার ধৈর্য্য দিয়ে দিয়েছেন বলে ধরে নিতে হবে। কথা হলো, আপনি আর্থিকভাবে ইকনোমিতে কন্ট্রিবিউট করেন কি না করেন, আপনার বাচ্চা অন্য কেউ পেলে দিবে না। মাদারহুড ইটসেলফ একটা প্রফেশন। এই প্রফেশনকে কাঁচকলা দেখিয়ে সোসাইটি যখন বলে- সারাদিন কি করো, কাজ করো না, তখন মন চায়, ঝামা দিয়ে সোসাইটির মুখটা ঘষে দেই। ঘুনে ধরা সোসাইটির শ্রম বিভাজন মানে- পয়সা আসলেই কাজ, না হলে মুড়ি ভাজ’। রিওয়ার্ড অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকে। কেবল এই একটা মাত্র জায়গাতেই সান্ত্বনা। অসহনশীল সোসাইটির অসহনশীল মানুষ অসহনশীলতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। একটা বাচ্চা পালতে যেয়ে বুঝতে পারছি, বাচ্চার জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে, বাচ্চা পালা একটা মায়ের একদম নিজস্ব যুদ্ধ। যতোই আশেপাশের লোকজন থাকুক, এই যুদ্ধ একদম একার। বাচ্চার সাথে সাথে একটা মায়েরও জন্ম হয়। আর বাচ্চার বড় হয়ে উঠার সাথে সাথে মায়েরও মা হিসেবে বেড়ে উঠা হয়। বাচ্চার সাথেসাথে মায়েরও মা হয়ে বেড়ে উঠা আনন্দদায়ক হোক- দু’আ ছাড়া আর কিছু নাই।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী