নারী ও ক্যারিয়ার

চিন্তিত চিন্তাফা(ছদ্মনাম)- কোনো মেয়ে পড়াশুনায় খুব ভালো, রেজাল্টও ভালো করেছে সারাজীবন, সেই মেয়ে যদি বিয়ের পর সিদ্ধান্ত নেয় সে সংসার করবে ও সন্তান লালন-পালন করবে, সমাজের অনেকেই মনে করবে, আহারে মেয়েটার এত মেধা কাজে লাগাতে পারলো না।
বাইরে চাকরী বাকরী বা আয় রোজগার করা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ, কিন্তু ঘর সামলানোও কিন্তু কম কঠিন নয়।

আপনারা সকলে নিজেদের মায়ের দিকেই যদি তাকান অনেক সময় মনে হবে, এর চেয়ে কোনো এসি রুমে টেবিল চেয়ারে বসে কাজ করাটা সহজ, অথচ তিনি হয়তো সারাদিন ঘর থেকেই বের হন না। কিন্তু গৃহিনীদের ব্যাপারে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, উনি কি করেন, বলা হয় উনি কিছু করেন না (এটাই আমাদের সমাজে প্রচলিত উত্তর)। এতো গেল বাইরে। এছাড়াও তাকে যে জিনিসগুলো সহ্য করতে হয়:

এক. স্বামী যখন বিরক্ত হয়ে বলেন, সারাদিনতো বাসায় থাকো, অমুক কাজটাও করতে পারোনি?

দুই. তুমি (যেকোনো গুরত্বপূর্ণ বিষয়) বোঝো কি?

৩. স্বামী যখন তার সামনেই অন্য এক ভাবীর সফল ক্যারিয়ার নিয়ে উচ্ছাসিত প্রশংসা করেন। সমাজে কোনো মেয়ের মতকে বেশী গুরত্ব দেয়া হয় জাস্ট সে ক্যারিয়ারে সফল বলে।

৩. মায়ের যত মেধাই থাকুক, ছেলেমেয়া রা বলে তারা বাবার মত বড় হতে চায়।

৪. স্বামীর বাবা-মা স্বামীর ক্যারিয়ার নিয়ে সমাজের সবার কাছে গর্ব করেন, অথচ মেয়েটার বাবা-মা সেটা করতে পারেন না, কিন্তু মেয়েটার মেধা হয়তো কোন অংশেই স্বামীর চেয়ে কম ছিলনা। কিছু শ্বশুর শাশুড়ি ইভেন মেয়ের যে সাত কপালের ভাগ্য তার ছেলের মত বিরাট চাকরি করা জামাই সে পেয়েছে তা উঠতে বসতে শোনাতে দ্বিধা করবেনা।

৫. সারাদিন গাধার খাটুনি বা স্বামীর সমপরিমাণ খাটুনি খাটার পরও তার কোন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকেনা। তাকে কিছু একটা কিনতে হলে স্বামীর অভিযোগ শুনতে হয় (হয়তো জেনুইনই, এযুগে একার পক্ষে সংসার চালাতে অনেকেরই হিমশিম খেতে হয়।) স্বামীর বাবা-মা অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লে সে সহজেই তাদের সাহায্য করে, কিন্তু যে মেয়ে চাকরি করেনা, তার বাবা-মায়ের অর্থনৈতিক সাহায্য প্রয়োজন হলে সে অসহায় বোধ করে। এমনকি তাদের সেবার প্রয়োজন হলে সে নিজের বাসায় এনে রাখতে পারেনা, রাখতে নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

৬. তার চেয়েও বড় কথা সারাদিন চাকরি করে আসার পর, কোন মেয়ের রান্না বান্না, বাচ্চা সামলানোকে অ্যাপ্রিশিয়েট করা হলেও, সারাদিন ঘরে থাকা গৃহিনীরটা প্রশংসা বা না উৎসাহ দ্বারা অ্যাপ্রিশিয়েট করা হয়না। ধরেই নেয়া হয়, আর করবে কি।

৭. অনেকে আকার ইঙ্গিতে তার শ্বশুরবাড়ি বা স্বামীকে দোষারোপ করে, নানা স্পেকুলেশন করে যে নিশ্চয় তাদের চাপেই মেয়েটা ক্যারিয়ার গড়তে পারেনি। এছাড়াও মেয়েটাকে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে সবার সামনে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সে তার বন্ধুবান্ধবকে ক্যারিয়ারের ভালো করতে দেখে এবং এতে করে তার মনের মধ্যেও একধরনের চাপ সৃষ্টি হয় এবং সে তার সিদ্ধান্ত নিয়েও হীনমন্যতায় ভুগে।

মেয়েদের ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে এখন হিটেড ডিবেইট চলছে। অনেকেই পক্ষে বিপক্ষে রায় দিচ্ছেন। মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষমতা অর্জনকে অনেকেই নারীবাদীতার বড় ছাতার নিচে ফেলে সেটার প্রতি একমুখী আচরণ করছেন, যা ফেয়ার হচ্ছেনা। কারন উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাজে বিদ্যমান। এবং এই মানসিকতাগুলোর পরিবর্তন না করা গেলে মেয়েরা ক্যারিয়ার বা জবের দিকে ঝুকবেই। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো পরিবর্তন দরকার। আপনার নিজের বাসা থেকেই।

তাহলেই একজন মা, একজন স্ত্রী তার প্রকৃত জব নিয়ে সত্যিকারের সুখী হতে পারবে। আমি মেয়েদের ক্যারিয়ারের বিপক্ষে নই, আবার যেই মেয়েটা নিজের ক্যারিয়ার ত্যাগ করে সংসার করার সিদ্ধান্ত নেয়, আমি তাকে সমাজের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য যেকোন পেশাজীবি র মত সমান সম্মান পেতে দেখতে চাই। এই আকাঙ্ক্ষাতেই এই লেখাটা লিখেছি।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী