পরিবার শিশুর প্রকৃত শিক্ষক

জয়নাল আবেদীনঃ বাড়িতে গেলেই আমার তিন বছরের ভাতিজী সার্বক্ষণিক ভাবে আমার পাশে থাকে। একটা তিন বছরের বাচ্চা মানেই একটা কথার ঝুড়ি। আমার ভাতিজী কথার ঝুড়ি না, সে কথার গুদাম।

সে দিন সে আমার পাশে বসে আছে। বাইরে আরো কয়েকটা পিচ্চি খেলছে। আমার ভাতিজী হুট করেই বলল, আব্বু শুনছো পিকু কি বলছে?

পিকু হচ্ছে ৭ বছরের একটা একটা পিচ্চি। সে কি বলছে আমি শুনতে পেয়েছি। সে অন্য কোন পিচ্চিকে পরিষ্কার ভাষায় বলেছে ” আমি তোর মায়েরে *** করি।”

এ রকম একটা ভয়ানক অশ্লীল গালির কথা আমি ভাতিজীর সামনে স্বীকার করতে পারি না। আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, পিকু কিছু বলে নি।

ভাতিজী জোর গলায় বলল, না তুমি শুনতে পাও নি। পিকু বলছে “আমি তোর মায়েরে *** করি।”

আমার এবার আর স্বীকার না করে উপায় থাকল না। আমি বললাম, আচ্ছা সে যা বলার বলছে। এসব পচা কথা শুনতে হয় না। তোমার এসব শোনার দরকার নাই। বুচ্ছো?

সে বলল, আচ্ছা। কেউ ” আমি তোর…… করি” বললে আমি শুনব না।

আমি দেখলাম এ তো মহাবিপদ। তাকে এই লাইন থেকে সরাতেই পারছি না। সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে বললাম, একটু আগে না বললাম এটা পচা কথা! এই কথাটা আর কক্ষনো বলবা না। কোন সময় না। মনে থাকবে?

সে আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, আচ্ছা। ” আমি তোর…… করি” এই কথা আমি আর কখনো বলব না। এইটা পচা কথা। তাই না আব্বু?

প্রিয় পাঠক, একটা অশ্লীল লাইন নিয়ে গল্প লিখতে আমি বসি নি। আমি চাইন্ড সাইকোলজি নিয়ে কথা বলতে চাই।

আচ্ছা বলুন তো আমার ভাতিজীর কানে কিভাবে এই লাইনটা পৌঁছাল? ঐ বাচ্চারা তো আরও অনেক কথা বলেছে আরও অনেক কিছু নিয়ে চিৎকার করেছে। সে সব বাদ দিয়ে এই অশ্লীল লাইনটাকে মেনশন করল কেন?
নিষেধ করা সত্ত্বেও সে বারবার কেন এই লাইনটাকেই ট্যাগ করেছে বলতে পারেন?

এর সহজ কারণ হচ্ছে চিরায়ত চাইল্ড সাইকোলজি। শিশুদের মস্তিস্ক থাকে অবচেতন। তারা শুরু থেকে নিয়েই স্বাভাবিক এবং অস্বাভাবিক এর মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে থাকে। “মা-বাবা” “দাদু-নানু- ভাইয়া- আপু- মামা- চাচা” থেকে নিয়ে “ভাত- পানি- চা- বিস্কিট” এসব শব্দের সাথে তারা প্রথম পরিচিত হতে থাকে। এসব শব্দ এক সময় তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তারা আমাদের ব্যবহার্য সব শব্দই শিখে ফেলে। এর পরই তাদের ব্রেইন খুঁজতে থাকে এবনরমালিটি। একটা বাচ্চা যখনই কোন গালি শুনবে তখনই তার ব্রেইন আরও কয়েকশ শব্দকে স্কিপ করে এই শব্দকে মার্ক করবে। সে গালি দেয়া ব্যক্তির রিএকশন দেখে, শব্দের ডেসিম্যাল হিসেব করে, গালি খাওয়া ব্যক্তির এক্সপ্রেশন ফলো করে ধরে ফেলবে এই শব্দের মধ্যে বিশেষ কোন গুণ আছে।

ব্যস! এই শব্দ মুখস্ত করতে এবং এর চর্চা শুরু করতে তার সময় লাগবে মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

আপনি লক্ষ্য করতে পারেন আপনার বাচ্চা এমন একটা গালি শিখে নিয়েছে যে গালি আপনি নিজেই হয়তো গত দশ বছরে শুনেন নি।
তাহলে সে শিখল কোত্থেকে?

সে শিখেছে পাশের বাসা থেকে আসা কথায়, সে শিখেছে রিকশাওয়ালার মুখ থেকে, সে শিখেছে বাসার নিচে খেলা করা পিচ্চিদের থেকে।
তার সাথে সে সময় হয়তো আপনিও ছিলেন। আপনি খেয়াল করেন নি, সে করেছে।

এখন বলতে পারেন বাচ্চা তো বাচ্চাই। তার ব্রেইন কিভাবে শব্দের ডেসিম্যাল হিসেব করে, কি করে এক্সপ্রেশন খেয়াল করে?
এটা ভাবলে ভুল করবেন। বাচ্চাদের ব্রেইন বয়স্কদের তুলনায় কয়েশ গুণ শার্প থাকে। খেয়াল করে দেখুন আপনি ক্লাস ওয়ানে যত গুলো ছড়া মুখস্ত করেছেন সবকটা এখনো মনে আছে। ক্লাস টেনে যে সব কবিতা পড়েছেন সে গুলো মনে করেন তো?

একটা বাচ্চাকে যত দ্রুত অক্ষরজ্ঞান শেখাতে পারবেন, একজন বয়স্ক মানুষকে কখনোই তত দ্রুত পারবেন না।
ব্রেইন কার ভালো বুঝলেন তো?

যেটা বলতে চাই…

একটা বাচ্চা অন্ধভাবে বড়দের অনুকরণ করে। বড় ভাইয়ের কথা বলার স্টাইলের সাথে ছোট ভাইয়ের কথা বলার স্টাইল মিলে যাওয়া কেবল জেনেটিক নয়। বোনের সাথে বোনের হাঁটার মিল, হাসির মিলও তাই। বাবার মতো ছেলে ভালো বা খারাপ কেবল রক্তের কারণেই হয় না।

বাচ্চাদের জগত মানেই বাবা- মা- ভাই- বোন। বাচ্চাদের জগত মানে বাসার কাজের বুয়া, টেলিভিশন বাক্স, স্কুল টিচার। তার বড় ভাই যেভাবে কথা বলে এটাই তার কাছে দুনিয়ার একমাত্র স্টাইল। তার বড় বোনের হাসির চেয়ে সুন্দর হাসি এই জগতে নেই। তার বাবা যাই করেন সেটাই তার কাছে শুদ্ধ। টিভি বাক্স যাই দেখাচ্ছে সেটাই সত্য।

এ সময়ে বাবা মায়ের জীবনধারা বাচ্চাকে চৌম্বকের মতো টানবে। বাবা অসৎ। তিনি ভাবছেন সেটা বাচ্চা ছেলে কিভাবে ধরবে। ভুল।
বাচ্চা ছেলে ঠিকই ব্যাপারটা ধরে ফেলবে। তবে সে ভুলকে জানবে শুদ্ধ হিসেবে। আর এই ব্যাপারটা ঘটবে অবচেতনভাবে।

বাচ্চা পাশের বাসার বাচ্চাকে মেরেছে। নিজেরা ছোট না হওয়ার জন্য বাচ্চার সামনে তার অপরাধকে অস্বীকার করলেন। বললেন সে নির্দোষ। সে যা করছে ঠিক করেছে।

ভুলটা হবে এখানেই। এই বাচ্চার ব্রেইনে এটা সেট হয়ে যাবে যে এভাবে অন্যায় করা ঠিক। অন্যায় করলেও কেউ কিছু বলে না। সে যখন বড় হয়ে ভুল শুদ্ধ চিনবে তখনো এই ধারা থেকে সে বের হতে পারবে না।

কারণ হচ্ছে এই চাইল্ড সাইকোলজি। বড় বয়সে অপছন্দ করা মানুষকে একটা সময় পছন্দ করা যায়। মনে করে দেখুন তো পিচ্চিকালে যাকে অপছন্দ করতেন এখনো তাকে অপছন্দ করেন কি না?
পিচ্চিকালের কোন কষ্ট এখনো কষ্ট দেয় কি না? ছোটবেলায় স্কুলে অন্যায়ভাবে মারা স্যারের প্রতি এখনো ক্ষোভ আছে কি না?

আমি বলতে চাই খারাপ বাবার ছেলে কেবল রক্তের কারণে খারাপ হয় না। খারাপ হয় তাদের আচরণ দেখে। আপনি তাকে কতটা খাইয়েছেন, কত টাকার ফোন কিনে দিয়েছেন, কতজন টিচার রেখেছেন সেটা তাকে ভালো মানুষ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

একজন বাচ্চাকে নোংরা জগত থেকে কতটা দূরে রাখা গেল তার উপরেই তার ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষ হওয়া নির্ভর করে।
আপনার বাচ্চাকেই সত্যিই যদি ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চান তবে তার জগতটাকে নিজের মতো করে গড়ে নিন। সততা, ন্যায়, মহত্ত্ব তার মাথার ভেতর সেট করতে থাকুন। অন্যায়, অশ্লীলতা, অসততার জগতকে তার থেকে দূরে রাখুন। অতীত জীবনে যাই থাকুন না কেন, সন্তানের জন্য হলেও একজন ভালো মানুষ হয়ে যান। নিজে খারাপ মানুষ হয়ে সন্তান ভালো হবে এই আশা ভুলে যান।

কেন সন্তান আপনাকে ফলো করে জানেন?

কারণ তার জগত এখানেই।
তার মাথায় আরব-ইজরায়েল নেই, তার মাথায় ট্রাম্প নেই, কাতার নেই। ১৪ দল- ২০ দল নিয়ে কোন চিন্তা তার মাথায় নেই। সে চিনে তার পরিবারকে। সে চিনে কাজের বুয়াকে আর টিভিকে। তার যাবতীয় চিন্তা এখানেই। তার ব্রেইন এখান থেকে যাই পাবে সেটাই শুষে নেবে। নেগেটিভ জিনিষ নেবে সবচেয়ে বেশি।

আমার ভাতিজীর মাথা থেকে একটা সামান্য লাইন আমি বের করাতে পারি নি। সে বারবার রিপিট করেছে। আমার ধারণা সে বাইরে গিয়ে অন্য পিচ্চিদের বলবে, “জানিস ‘আমি তর…করি’ এটা একটা পচা কথা। এটা বলতে নেই।
এভাবে চর্চাটা চলবেই।

চাইল্ড সাইকোলজি খুব সেন্সেটিভ বিষয়। এখানে কোন ভুল করা চলবে না। ভুল- শুদ্ধের হিসেবে যদি একচুল ভুল হয় তবে সেটা আর কোনদিন ঠিক হবে তার গ্যারান্টি নেই।

বাচ্চার আপাত সুবিধার জন্য কোন ভুলকে প্রশ্রয় দেবেন না। বাচ্চার সামনে নিজের ভুল জীবনের চিত্র প্রকাশ করবেন না। বাচ্চা আপনাকে সিমপ্লি কপি করবে। করবেই।

একটা বাচ্চা…অনেক দামি, অনেক সুন্দর একটা কম্পিউটার। তার ভেতরের প্রোগ্রাম সেট করতে হবে আপনাকেই। আর কেউ করে দিতে পারবে না, করবেও না।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী