বিপ্লব করতে হলে অভদ্র হতে হয় না

জয়নাল আবেদীনঃ একদম পাড়া গাঁ থেকে বের হওয়া সাধারণ পরিবারের যে সব ছেলে মেয়েরা পাবলিকে লেখাপড়া করছে তাদের অনেককে দেখে ইদানিং নিরাশ হতে শুরু করেছি।
এক সময় মনে হত হিমালয় পর্বতের চূড়ায় মানুষ এত কষ্ট করে উঠে কেন? হেলিকপ্টার নিয়ে উঠলেই তো হয়। পরে বুঝতে পারলাম এত কষ্ট, ঝুঁকি আর ত্যাগ স্বীকার উপরে উঠার মাঝেই স্বার্থকতা, গৌরব। পাড়া গাঁ থেকে পাবলিকে চলে আসাটাও এরকম এভারেস্ট জয়ের মতোই গৌরবের।
এদের দেখলে তাদের অজান্তেই গর্বিত হই। আমার গ্রামের কাদামাটির সুগন্ধ অনুভব করি। তাদেরকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।

তবে নিরাশ হচ্ছি কেন?

এদের মধ্যে অনেকেই তাদের অবস্থান ভুলে যাচ্ছে। হঠাৎ পাওয়া রঙিন জীবন তাদের চোখের সামনে পর্দা টেনে দিচ্ছে। আমার ভয়টা সেখানেই।

সিগারেট খাওয়াকে আমি খারাপ চোখে দেখি না। টং দোকানে বন্ধুদের সাথে চা খেতে খেতে আড্ডা দেয়া আর সিগারেট খেতে খেতে আড্ডা দেয়ার মাঝে খুব একটা তফাৎ নেই।
কিন্তু এক সময় সিগারেট দেখে বমি করা ছেলে মেয়েরা যখন যখন কেবল ভার্সিটি প্রভাবে সিগারেট ধরে ফেলে তখন বিস্মিত হই। বিস্মিত হই যখন তারা এই শলাকাকে স্মার্টনেসের জন্য অত্যাবশকীয় হিসেবে ধরে নেয় এবং মুখের সম্মুখে সর্বদা একটা ধুম্রকুন্ডলী সাজিয়ে রাখাকে ভার্সিটি জীবনের জন্য ফরজ হিসেবে বিবেচনা করে।

গ্রামের এ রকম ছেলেদের অনেকেরই একটা সিগারেটের দাম যোগানোর জন্য তার বাবাকে দুইটা ৫০ কেজির বস্তা পিঠে টানতে হয় নতুবা পাঁচটা মাটির ঝুড়ি মাথায় নিতে হয় কিংবা ১১০ টা রিকশার প্যাডেল পায়ে চাপতে হয়।
গভীর উদ্বেগের সাথে দেখেছি অনেকে কেবল সিগারেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাথে গঞ্জিকা বা তরলের সাথে সখ্যতা শুরু করে দিচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার তারা এসবের জন্য মোটেই অনুতপ্ত হয় না। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরকম হতে পারার জন্য গর্ব অনুভব করে।

পোশাক বা গেট আপ যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু সারা জীবন মাথায় সরিষার তেল দিয়ে সিঁথি করে চুল আচড়ানো ছেলের মাথায় আচমকা সন্ন্যাসীর মতো চুল বা মুখে বেসাইজের দাঁড়ি দেখি তখন চমকে যাই।
তারা সাইজের চুল দাঁড়ি না রেখে বা না কেটে নিজেদের কি প্রমাণ করতে চায় বুঝতে পারি না।
বেসাইজের চুল দাঁড়ি রাখার কারণে সভ্যতা বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করব না। কিন্তু মাধ্যমিক বা প্রাইমারির শিক্ষকরা তাদের এক সময়ের প্রিয় ভদ্র ছাত্রের এ রকম অবস্থা দেখে যে গভীর দুঃখ অনুভব করেন সেটা তাদের বোঝা উচিত ছিল না?

বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের শরীর ও মনে প্রেম নামক জটিল বায়োক্যামিকাল মেকানিজম চলে আসবে এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রেম সাম্যবাদী অনুভূতি, ধণী গরীব বোঝে না।
তাই বলে বাবার ইনকামের পুরো এক সপ্তাহের টাকা দিয়ে প্রেমিকা নিয়ে হ্যাং আউট করতে যাওয়াকে আমি সমর্থন করতে পারি না।
যেমন মানতে পারি না ঘরের চালা ফুটো রেখে কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বন্ধুদের সাথে আকাশ-নদী-পাহাড় দেখতে গিয়ে প্রকৃতিকে ধন্য করাকে।

গ্রামের ছেলেরা কলেজ-ভার্সিটিতে রাজনীতি করুক এটা আমিও চাই। রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের সামনে হাত কচঁলে হাতের রেখা তুলে ফেলাতেও দোষ নেই।

কিন্তু এদের একাংশই ব্যক্তি জীবনে চরম অভদ্র হয়ে যায়। বিনয় নামক জিনিসটা বিরল হতে হতে বিলুপ্তির পথে চলে যায়। “বড় ভাই” কে করা অতিরিক্ত সম্মান ঘাটতি ফেলে দেয় নিজের বাবা মা বা শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানে।
বেদনার কারণ এটাও।

ফেসবুকে কিছু কিছু মেয়ের পাউট মুখের সেলফি দেখি। কারো কারো আইডিতে গিয়ে বাবা মায়ের সাথে তোলা ছবি পাওয়া যায়। সে সব ছবিতে মেয়ে সাধারণ, মা সাধারণ। মায়ের পরণে সস্তা ছাপার শাড়ি।
এই মেয়েরাই কলেজ ভার্সিটিতে এসে অসাধারণ হয়। স্বচ্ছ কাপড়ের জামার হাতা কাঁধ অবধি উঠে পড়ে। সাধারণ বিবেচনায় বুঝতে পারি অর্ধ শরীর ঢেকে রাখা এই জামা দিয়ে ঐ মায়ের পুরো শরীর ঢেকে দেয়া ১২ হাতের ১২ টা শাড়ি কেনা যেত।

…কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমি বলার কেউ নই।
তারপরও ঐ পাড়া গাঁয়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি কিছু বলার অধিকার রাখি।

পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। ধীরে ধীরেই পরিবর্তন আসুক।
ছেলেটা সিগারেটের টান দেয়ার আগে তার বাবার ঘর্মাক্ত মুখটা একবার মনে করার চেষ্টা করুক।
সিগারেট ছাড়তে না পারুক, অন্তত সিগারেটের গায়ের “বি এন্ড এইচ” ব্র্যান্ড থেকে একটু নিচে নেমে আসুক।

গাঁজার কল্কিতে মুখ লাগানোর আগে নিজের ছোট ভাই বোনের আদরমাখা মুখ একবার চোখে ভাসুক।
চিন্তা জড়িয়ে যাওয়ার আগে সর্বশেষ ভাবুক এই গাজার টাকার বদলে তার ভাই বোনকে কোন গিফট করলে তারা কত খুশি হত!

প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে বসে চিকেনে কামড় দেয়ার আগে তারা বাবা মায়ের কথা একবার ভাবুক।
জানার চেষ্টা করুন পরিবারে কবে সর্বশেষ ভালো খাওয়া হয়েছিল।
বাবা ডালের প্লেটটা চেটেপুটে যে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছেন সেটার কারণ ডাল না, কারণ মেডিকেল-ভার্সিটি-বুয়েটে পড়া ছেলে মেয়ে।
আঙুল চেটে খাওয়ার সময়ও ভাবছেন “ছেলে আমার বড় হবে”।

মাথায় উস্কো খুস্কো চুল, মুখে দাঁড়ি, মাথায় চে ক্যাপ নিয়ে বিপ্লবী হওয়ার চেষ্টা নিরর্থক।
গ্রামের ছেলেরা জন্মগত বিপ্লবী। বিপ্লব করেই কোথাও চান্স পেতে হয়। নতুন করে বিপ্লব করার কিছু নেই।

বিপ্লব করতে হলে অভদ্র হতে হয় না, চেহারার গাঞ্জুটি ভাব রাখতে হয় না। ভদ্র চেহারায় বিপ্লব করা যায়।
চে গুয়েভারা বা কাদের সিদ্দিকী বনে জঙ্গলে যুদ্ধ করেছেন। এখনকার বিপ্লবীদের কাউকে বনে জঙ্গলে বিপ্লব করতে হয় না। সুতরাং তাদের চেহারা অনুকরণের দরকার পড়ছে না।

বিপ্লব হলে হোক ভদ্রতা আর বিনয় দিয়ে। রিকশা ড্রাইভার বাবার রিকশার ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে বিপ্লব করার হ্যাডম আছে?
করতে পারলে এটাই হবে সত্যিকারের বিপ্লব। মেডিকেল-ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে রিকশা চালালে মানুষ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখবে। দেখবে সত্যিকারের বিপ্লবীকে।
এখন চুল-দাঁড়ি এবং ইচ্ছেকৃত ছেঁড়া কাপড় পরা বান্দাদের দেখে মানুষ বিপ্লবী না ঘৃণার চোখে কোন গাঁজাখোরকে দেখে।

লেখাটা উচ্চবিত্তদের জন্য নয়। শহুরে উচ্চবিত্তদের নিয়ে আমার আগ্রহ বা মাথা ব্যথা নেই।
আমার হাজারো গ্রামের সংগ্রামীদের নিয়ে আমার কৌতুহল।

চরম মেধাবী হয়েও স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে লাইনচ্যুত হওয়া এসব ছেলে মেয়ে দেখে কষ্ট পাই।
চুল দাঁড়ি, প্রেম, সিগারেট, হ্যাং আউট, রাজনীতি কোন ব্যাপার না। তাতে কিছুই আসে যায় না। সবাই পথ হারাচ্ছে এমনও না।
কেউ কেউ শিকড় ভুলে নৈতিকতার পথ হারাচ্ছে এটাতেই আসে যায়। সারা জীবন মদ খেয়ে অভ্যস্ত কারো মদ খেলেও কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু হুট করে কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া অনেকের নাক মুখ দিয়ে ড্রিংকস বের হয়ে আসে।
স্বাভাবিক জীবনে অভ্যাস বদল ভয়ংকর ব্যাপার।
শেঁকড় ভুলে যাওয়া পেনাল কোড মতে কোন অপরাধ না, তবে নৈতিকতার সংবিধানে বিশাল বড় অপরাধ। আর নৈতিকতা আদালতের অপরাধীরাই এক সময় দৃশ্যমান আদালতের বড় বড় অপরাধী হয়ে গড়ে উঠে।

হে সংগ্রামী ভাই-বোনেরা, বড় হও..মাথা উপরে তোল।
বড় হও বিনয় ভদ্রতা এবং সামাজিকতা বজায় রেখেই।
মাথা উপরে তুলতে তুলতে আকাশ ভেদ করে মহাকাশে চলে যাও। তবে পা দুটো যেন মাটিতেই থাকে।
পা মাটিতে না রেখে উপরে উঠাকে বড় হওয়া বলে না, হারিয়ে যাওয়া বলে।

ইতিহাস সাক্ষী, ইতিহাস বড় হওয়াদের মনে রেখেছে, হারিয়ে যাওয়া কাউকে মনে রাখে নি।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী