পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে

জামান অ্যালেক্সঃ  ১….

কয়েকমাস আগের কথা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মী হিসেবে রাতের বেলা এদেশের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলের হাসপাতালে ইমার্জেন্সী ডিউটি দিচ্ছি। রাত দশটার দিকে মোটামুটি ৩০-৩২ বছরের এক মহিলা ৬-৭ বছরের এক মেয়েকে নিয়ে ইমার্জেন্সী রুমে ঢুকলো…..

হাসপাতালে আসার কারণ ক্লিয়ার হলো। ফিজিক্যাল অ্যাসল্টের কেইস। স্বামী পশুর মত পিটিয়েছে। মাকে পেটানোটা মেয়ে সহ্য করতে পারেনি, মাকে জড়িয়ে ধরেছিলো, কিছু আঘাত মেয়ের গায়েও লেগেছে, এক্সেতে হাতের হাড় ভাঙ্গাটাও ধরা পড়লো….

প্রতিটা আঘাত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রেকর্ড করে রাখছি, মাঝখানে একবার আনমনে বলে উঠলাম, ‘মানুষ মানুষকে এমনভাবে মারে!…..’

মহিলাটি সাথে সাথে আমার কথায় রেসপন্স করেছিলো, রেসপন্সটা আমার কাছে ছিলো অপ্রত্যাশিত।নিতান্ত অজপাড়াগাঁয়ের এক পল্লীবধূ সেদিন যে কথাটা আমাকে বলেছিলো সেটা আমি আপনাদের শোনাইঃ

“মাইয়্যা হইয়া জন্মাইছি, মাইর তো খাইতেই হইবো…”

২….

গুলশানের এক আলো ঝলমলে বেসরকারী হাসপাতাল। আমি তখন ওই হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। উচ্চবিত্ত পরিবারের এক Unconscious তরুণীকে রিসিভ করতে হলো। অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। সাধারণত এই ধরণের কেইস কোনো বেসরকারী হাসপাতাল ডিল করে না, বিশেষ বিবেচনায় তরুণীকে অ্যাডমিট করা হলো….

একদিন পর তরুণীর জ্ঞান ফিরলো, আমি ফলো আপ দিতে গেলাম। কথোপকথনের নমুনা দেইঃ

আমিঃ আপনি তো ভালো যন্ত্রণা করেন! এতগুলো ঘুমের ওষুধ খেলেন কেনো?….

তরুণীঃ কি করবো ডক্টর বলেন? প্রতিদিন মার খেয়ে আস্তে আস্তে মারা যাবার চেয়ে একেবারে মরা ভালো…..

তরুণীটি সদ্য বিবাহিত। কাজেই কে তাকে প্রতিদিন মারে সেটা বোধ হয় আপনাদের আর খোলাসা করে বলার প্রয়োজন নেই…..

৩….

আমার দিন কাটে নানা ঝামেলায়। বিশেষত বইয়ের স্তুপের দিকে তাকালে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। এক্সট্রা কারিকুলার অনেকগুলো অ্যাকটিভিটি কমপ্লিটলি বন্ধ করে দিতে হলো। লেখালেখিকেও বিদায় করে দিলাম। তারপরও আবার কিবোর্ডে হাত চালালাম কেনো?

কারণ দুইটা, সেগুলো বলি…..

প্রথম কারণ, গতকাল ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে একটা স্ট্যাটাস নজরে পড়লো। আমাদেরই সেক্টরের এক সদস্য ফেসবুকে সগর্বে ঘোষণা করলো তার হবু স্ত্রী যদি তাকে রান্না করে না খাওয়ায় তবে থাপড়ায়ে মেয়েটিকে বাপের বাড়ী পাঠানো হবে। পারিবারিক শিক্ষা কত নিম্ন পর্যায়ের হলে একটা মানুষ ফেসবুকে এমন একটা স্ট্যাটাস দেয়!…..

দ্বিতীয় কারণটার সাথে এক ইঞ্জিনিয়ার জড়িত। বই দাগাতে পেন্সিল কিনতে এলাকার ‘স্বপ্ন’ তে ঢুকলাম। বের হয়ে এক বন্ধুর সাথে দেখা, অবিবাহিত, বিয়ের জন্য ডাক্তার মেয়ে খুঁজছে, যে মেয়ে ডাক্তারী ইস্তফা দিয়ে তার পরিবারের দেখাশোনা করবে। যাবার আগে হাসতে হাসতে আমাকে একটা সুপরামর্শও(!) দিলোঃ “বুঝলি, নারী আর ঢোলরে অলওয়েজ মাইরের উপরে রাখতে হয়….”

মানুষ সামাজিক জীব। তবে সামাজিক জীব হবার কিছু যন্ত্রণা আছে। মানুষরূপী কিছু ছাগলের সাথে তাকে প্রতিনিয়ত হাসিমুখে চলতে হয়। আফসোস…..

৪…

এবার নিজের কথা বলি। লেখার মাধ্যমে তো বহু হাতি ঘোড়া মারলাম। নিজে কেমন?

পুরুষশাষিত সমাজে পুরুষ রূপে বেড়ে উঠেছি। কাজেই আমার সাবকনশাস মাইন্ডের স্ট্রাকচার অন্যদের থেকে আলাদা হবে, সেটা আশা করা বোকামী। পুরুষ হিসেবে নারীর উপর কর্তৃত্বই যদি ফলাতে না পারলাম, তবে আমি আবার কেমন পুরুষ!

তবে জীবন চলার পথে কোনো না কোনো এক সময় নিজের চিন্তার দুয়ারকে উন্মুক্ত করতে হয়েছে, স্বচ্ছভাবে চিন্তা করতে হয়েছে। সে সময় মনে হয়েছে যদি একজন নারীকে আমি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে এটাও মানতে হবে সে একটি স্বাধীন স্বত্বা, আমার মতই স্বাধীন স্বত্বা। আমার নিজের যেমন আনন্দ, বেদনা, জাস্টিফায়েড ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে, সেটা একজন নারীরও আছে। আমি যেমন অন্য কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছা দ্বারা ম্যানিপুলেটেড হতে অস্বস্তি বোধ করি, একজন নারীও নিশ্চয়ই তেমনি। আমি যদি শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে না চাই, তবে একজন নারীর জাস্টিফায়েড ওয়েতে মুক্তবিহঙ্গ হতে বাঁধা কোথায়?……

কাজেই নিজেকে পরিবর্তন করতে হয়েছে।মানুষ মাত্রই ভুল করবে সেটা স্বাভাবিক, কাজেই মানুষ প্রমাণ করার জন্য আমাকেও নিশ্চয়ই ভুল করতে হয়েছে, তারপর সংশোধিত হতে হয়েছে। ভুল করাটা দোষের না, ভুলের উপর স্থির থাকাটা দোষের…..

কথাগুলো নিজেকে সাবজেক্ট বানিয়ে বললাম। মেসেজটা সবার জন্য প্রযোজ্য….

৫….

যে প্রসঙ্গে কথা বলছি, সে প্রসঙ্গে কনক্লুশান টানতে গেলে ধর্মের কথাও জানতে হবে। যে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেই ক্লিয়ার কনসেপ্টে পৌঁছানো যায়, সেখানে ধর্মকে টানতে হবে কেনো?

কারণ ধর্মের বিকাশ যারা ঘটিয়েছে তারা আমার, আপনার মত সাধারণ লোক নন, তারা Rational way তে সীমার মাঝে অসীমতাকে ধারণ করতে পারতেন, তাঁদের চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপকতা ছিলো, তাঁরা মহামানব, তাঁদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে, তাদের জীবনাদর্শনকে শ্রদ্ধা করতে হবে…..

অন্য ধর্মের কথা আমি বলবো না, অন্য ধর্মের ব্যাপারে আমার তথ্যমূলক ঘাটতি আছে, আমি ইসলাম ধর্মের অনুসারী, কাজেই আমি সে প্রেক্ষাপট থেকেই কথা বলি।আমরা কতজন মুসলিম হিসেবে নবী করিম (সা:) এর জীবনাদর্শকে জানার চেষ্টা করেছি? আমাদের নবী তাঁর স্ত্রীদের সাথে কেমন ব্যবহার করতেন? যদি সত্যিকার অর্থে সেটা জানতাম তবে রান্না না করলে বউকে থাপড়ায়ে বাপের বাড়ি পাঠানোর কথা মাথায় আসতো না…..

আমরা বাঙালিরা আসলে হাড়ে-গোশতে বজ্জাত। ধর্মের সে অংশটুকুই আমরা আসলে প্রচার করেছি যেটা প্রচার করলে পুরুষত্ব ফলাতে কোনো ঘাটতি হবার কথা নয়…..

৬….

আমার বড় মেয়ের বয়স চার বছর। এই চার বছরে আমি কোনোদিনও তার গায়ে কোনো হাত তুলি নাই, বরঞ্চ বলা ভালো-এই ধরণের কোনো চিন্তাও আমার মাথায় ঠাঁই নেয় নাই।অবশ্য মেয়ের মা’র ব্যাপারটা ভিন্ন, একাধিকবার মেয়েকে তার মায়ের কঠিন শাসনের মাঝ দিয়ে যেতে হয়েছে।সেই কঠিন রাতগুলো আমি পার করেছি আমার মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে…..

বেড়ানোর উদ্দেশ্যে একবার মেয়েকে নিয়ে ঢাকা থেকে বের হলাম। গ্রামের রাস্তা দিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। এমন সময় তার চোখে পড়লো কচুরীপানার বেগুনী ফুলগুলো, ফুলগুলো দেখে সে অভিভূত। বেগুনী-হলুদ ফুলগুলো নিয়ে আসা হলো। মেয়ের হাতে দিলাম। ফুলগুলো সে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। তার সে কি আনন্দ!

অপার্থিব সেই সৌন্দর্যকে আমি ক্যামেরাবন্দী করে রেখেছিলাম। আগে আনন্দ নিয়ে ছবিগুলো দেখতাম, এখন আতঙ্ক নিয়ে দেখি…..

জীবন চলার পথে আমার মেয়েকে নিশ্চয়ই কোনো ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে। কেমন হবে সেই জীবনসঙ্গী?

তার মা তাকে শাসন করলে যে মমতা নিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি, যে আনন্দ নিয়ে তার ছোট দু’হাত আমি বুনোফুল দিয়ে ভরিয়ে দেই–সে আনন্দ, সে মমতা কি তার নতুন জীবনসঙ্গী বজায় রাখবে? নাকি এলোমেলো কোনো বাতাস তার জীবনটাকে তছনছ করে দিবে? তাকে কি চলে যেতে হবে পুষ্পশূন্য কোনো দিগন্তের পথে?…..

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী