একা থাকা এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী

নাসিমুন নাহারঃ এক
__________

আমার প্রতিবেশী একজন মুরুব্বী, পেশায় শিক্ষক আজ বিকেলে বলছিলেন–একা হয়ে যাওয়া মেয়েরা এমন হয় জানতাম না। তোমাকে এতদিন ধরে দেখে ধারণা বদলে গেল মা।
আন্টির প্রেসার মাপতে মাপতে শান্ত গলায় বললাম –একা মেয়েরা কেমন হয় বলে আপনি ভাবতেন ?
আন্টি — ওরা নামাজ রোজা করে না, খারাপ জামা কাপড় পরে, রাত করে বাসায় ফিরে, বাসায় উল্টা পাল্টা লোকজন আসে, উশৃঙ্খল জীবন কাটায়। কিন্তু তুমি এরকম না। তুমি তো লক্ষী নম্র ভদ্র মেয়ে।
হাসি দিয়ে বললাম— আমি কিন্তু রাগীও বটে আন্টি।
আন্টি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন— এটাই তো তোমার শক্তি, তোমার ব্যক্তিত্ব। আমি সবার কাছে তোমার গল্প করি। একা একা কি সুন্দর করে সব কিছু সামলাচ্ছ।

আমাদের সমাজে ‘ডিভোর্স’ অত্যন্ত ভয়াবহ অচ্ছুৎ নোংরা চূড়ান্ত নেতিবাচক শব্দ। ডিভোর্সী মেয়ে তো বটেই ছেলেও জঘন্য খারাপ মানুষ !
অথচ প্রয়োজনে এবং উপযুক্ত কারণে ডিভোর্সের বিধান ধর্মে এবং সমাজে কিন্তু আছে।উল্টো ধর্মীয় ও সামাজিক ভাবে অস্বীকৃত পরকীয়া,
দাম্পত্য কলহ যা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং সপ্তাহে সপ্তাহে পার্টনার বদলানোকে এই সমাজে তুলনামূলক soft দৃষ্টিতে দেখা হয়। ঘরে জামাই/বৌ রেখে, নিত্য মারামারি, ঝগড়া, অশান্তি করে গলায় বিবাহিতের সাইনবোর্ড লটকিয়ে তুমি এইগুলা করলে কিচ্ছু যায় আসে না। কারন তুমি তো তথাকথিত ঘর সংসারে আছ বৎস।

“””দুনিয়ার সমস্ত অকাজ কুকাজ অন্যায় আকাম কুকামের ছাড়পত্র কবুল বলামাত্রই সমাজ তুমারে দিয়া দিছে, so do ফূর্তি no চিন্তা !””
কি আশ্চর্য হিপোক্রিয়েট এই সোসাইটি !!

দুই
_________

যেহেতু ছেলে/মেয়েটার ডিভোর্স হয়েছে সেহেতু অবশ্যই ছেলেটি/মেয়েটি খারাপ। ভালো ছেলে/মেয়েদের কখন ডিভোর্স হয় না !

—- ওহহ হো এই যে হ্যালো হাই, what do you mean by ভালো ছেলে/মেয়ে ?

আমি যখন স্কুল কলেজে পড়তাম এই তথাকথিত ভালো মেয়ে হবার জন্য শৈশব কৈশোর উৎসর্গ করেছিলাম।
হয়েও ছিলাম—best one !
মিথ্যা বলছি না। আমার লিষ্টে আমার আত্মীয় স্বজন স্কুল কলেজের বন্ধু, শিক্ষক এড আছেন।
তাদেরকেই বলতে শুনেছি— মিম্ মি’র মত হও। কারণ– ভালো ছাত্রী ছিলাম, গান, কবিতা, বিতর্ক, ছবি আঁকাসহ যাবতীয় সৃষ্টিশীল কাজে ভুরি ভুরি প্রাইজ পেতাম এবং খুবই উল্লেখযোগ্য যা তা হলো বাবা-মা সহ সবার ভীষণ বাধ্য ছিলাম। প্রেম করার প্রশ্নই আসে না। ফার্স্ট গার্লরা কখনত প্রেম করে না !
আর্দশ কন্যা আর্দশ ছাত্রীর পারফেক্ট উদাহরণ ছিলাম আরকি।

তো এই আমাকেই যখন একা হতে হল (কি কেন কোন সে কারন তা এই পোস্টের টপিক না।তাই কমেন্টে এটা নিয়ে চিল্লানি দিবেন না প্লিজ) তখন পরিচিত সবার প্রথম এক্সপ্রেশন ছিল— মিম্ মি’র !!! কেমনে ! কেন !! ওর মতো মেয়ের সাথে হলো ! ইত্যাদি ইত্যাদি।

সিরিয়াসলি আমিই চমকে যেতাম পরিচিতদের রিয়াকশনে। আসলেই কি এতটা ভালোবাসা ডিজার্ভ করি ? আমার স্কুলের বহু ক্লাসমেট ঐ ঘটনার পর যখন ওদের সাথে দেখা হয়েছে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে……… বলেছে তোমার সাথে কেন ? কেন ?

এমনকি বর্তমানেও এমন ঘটনা ঘটে নিত্য। বর্তমান জীবনে আমি নিজেই মানুষের সঙ্গ এভোয়েড করি। আমি আসলে কাউকে সুযোগই দিতে চাইনা আমাকে নিয়ে গসিপ করার। আমি চিনি এই সমাজকে !

তাই প্রয়োজনের বাইরে কারো সাথে হাই হ্যালো বলি না, সামাজিক অনুষ্ঠানে যাই না, ফ্যামিলি ফ্রেন্ডস গ্যাদারিং এ আমাকে পাওয়া কঠিন ব্যাপার। বরং মানুষ ই আমাকে ইনভাইট করে, কারো পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে অনেক রাতে ফোন আসে আমার কাছে, আমার ছেলের প্যারেন্টস মিটিং এ অভিভাবকরা ফোনে অনুরোধ করেন আমি যেন অবশ্যই যাই, যেহেতু আমি ডাক্তার সেহেতু তাদের ধারনা টিচাররা আমার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবেন।

আমার ছেলেকে আজকে পর্যন্ত কখনো শুনতে হয়নি ও তো ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে ওর সাথে মিশবা না (writing this line I can’t stop my tear )। বরং ওর স্কুলের ওদের সেকশনের ইনচার্জ টিচার নিজে আহ্ নাফকে ডেকে বলেছেন তার ছেলেকে যেন ও manners lession বুঝিয়ে দেয়। ও তো তার বাচ্চার বড় ভাইয়ের মতো। যেকোন প্রোজেক্ট তৈরি করতে হলে সবাই আহুকে ডাকে। কারণ এনসাইক্লোপেডিয়া মুখস্থ তার।

আমার বর্তমান জীবনের মানুষেরাও অবাক হয়ে প্রশ্ন করে —কেন ? কেন আমার মত মেয়ের সাথে এমন হলো? কেন ?
কোন এক অদ্ভুত অজানা কারনে অসামাজিক হবার পরেও অনেকেই আমার ভেতরে “ভালো মেয়ে” দেখতে পারেন !

—-আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনা।
কান্নাকাটি বরাবরই কম আসে আমার। চোখের পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে ফেলেছি তথাকথিত ভালো মেয়ের চিহ্ন…..

তিন
____________

আসলে ভালো/ খারাপ খুবই আপেক্ষিক শব্দ। একজন মানুষ একা কখনো ভালো/খারাপ হতে পারে না। তার আশেপাশের মানুষ পরিবেশ তাকে ভালো/খারাপ বানায়। আমার শৈশব কৈশোরের পরিবেশ ছিল স্বপ্নের থেকেও সুন্দর। আমার আম্মু শুধু মাথায় ঢুকিয়েছে লেখাপড়া কর, লক্ষী ভদ্র শান্ত মেয়ে হও। আব্বু জীবনে মাত্র একবার বলেছিল– নামাজ না পড়লে মৃত্যুর পর আমার আব্বুকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ব্যাস সেই পিচ্চি বেলার কথা এই এত বড় বয়সে এসেও ভুলতে পারিনি।

পরবর্তীতে যাদের সাথে আমার সম্পর্ক তৈরি হবার পরেও continue করা সম্ভব হয়নি, যাদের চোখে আমি ছিলাম শুধুমাত্র— বড়লোকের আহ্লাদি মেয়ে, যে কোন কাজকর্ম পারে না লেখাপড়া করা ছাড়া, স্পেশ্যালী রান্না না জানাটা পাপ ছিল আমার জন্য, সেই সাথে তাদের ছেলেকে capture করে মাথা চিবিয়ে(!!) খাবার মত শক্তিশালী, বাসায় স্যন্ডেল, ইস্ত্রি করা কাপড় পরে পরিপাটি হয়ে থাকা এবং যেহেতু আমার কোন ভাই নেই সেহেতু পুত্র সন্তান গর্ভে ধারন করতে পারব কিনা(!!) সন্দেহের তীর ইত্যাদি অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে চলে আসা অথবা এক কাপড়ে বের করে দেয়া এই আমাকেই কিছু বছর পরে ঐ পরিবারের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মূলত যার জন্য আমার জীবনটা আর দশটি মেয়ের মত হয়নি তিনিই বলেন — মিম্ মি মেয়ে টা আসলে ভালো ছিল ! বয়স কম ছিল তাই ঘর সংসার মেডিকেলের লেখাপড়া বাচ্চা বুঝে উঠতে সময় লাগত। ওকে আর একটু সময় আমাদের দেয়া উচিত ছিল।

ধন্যবাদ অতীত জীবনের মানুষেরা !


চার
________

কিন্তু সময় সবকিছু বদলে দেয়। সময় আমাকে জানিয়েছে—- আমি একা একাই আইডেন্টিটি তৈরি করতে পারি।আমি একা একাই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারি। আমি একা একাই ভালো থাকতে পারি।
হুমমমম অসহনীয় কষ্টের অবর্ণণীয় অপমানের পথ আমি পাড়ি দিয়েছি এবং ঠিকই উঠে দাঁড়িয়েছি। তো কি হয়েছে ! মাঝের কিছু বছর এলোমেলো হয়েছে। সারাজীবন ভুল মানুষের সাথে ভুল পরিবারে অশান্তিতে তো কাটাতে হচ্ছে না— এটাই তো আমার ভাগ্য। তাদেরও ভাগ্য আমার মতো দুনিয়াদারি সম্পর্কে এলেমেলো মোটেও বৈষয়িক না, উড়ালপঙ্খী স্বভাবের ভাবুক নীতিবাগীশ টাইপ ছেলের বৌয়ের সঙ্গ বেশিদিন ভোগ করতে হয়নি।
আদতে খুবই ভালো হয়েছে।হাহাহা।

পাঁচ
____________

অনেকেই বলে সমাজ, পরিবার, বাচ্চা, আশ্রয় ইত্যাদির কথা ভেবে অশান্তির সংসার টেনে যান সারা জীবন ধরে।
পাশাপাশি আমি যদি বলি অনেকেই পারে না অভিনয়ের জীবন কাটাতে, নিত্য ওয়াইফের স্বেচ্ছাচারী জীবনটা মেনে নিতে, স্ত্রীকে চোখের সামনে পরকীয়া করতে দেখতে, স্ত্রীর দেয়া মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে অথবা স্বামীর অপমান, অত্যাচার মেনে নিতে, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে, স্বামীর হাতে মাইর খেতে খেতে রোজ রোজ মরে যেতে সবাই পারে না। তাহলে কি খুব ভুল হবে ?

পৃথিবীতে সবার জীবনবোধ, বেঁচে থাকার কারণ কখনোই এক হয় না। তাই যার যার অবস্থানে হয়তো সে সঠিক, হয়তো বেঠিক—— একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানে না আসলে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল।আমাদের মত সাধারন মানুষের সাধ্য কই আরেকজন মানুষকে জাজ করার ?

মূল্যায়ন করুন একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে, তার কাজ, আচরণ, জীবন পদ্ধতি দিয়ে,
তার ব্যক্তিগত জীবনের একান্তই নিজস্ব সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়।

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী