“তুমি কি পছন্দ করো মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে?”-পর্ব- ২

আবুল কালাম ওয়াহিদঃ

পবিত্র কুরআনের তিনটি সূরায়, সূরা“হুজুরাত”, সূরা“হুমাযাহ”এবং সূরা“কালাম”এ আল্লাহ্‌ তায়ালা চরমভাবে নোংরা, ঘৃণিত এই অভ্যাসগুলি এবং তার শাস্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই অভ্যাসগুলি আল্লাহ্‌ তায়ালার নিকট কতোটা ঘৃণিত তা বুঝানোর জন্য আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা“হুমাযাহ”নামে একটা সূরা নাযিল করেছেন।“হুমাযাহ”নামের অর্থ হোল“অপবাদকারী বা মিথ্যা-দোষারোপকারী”।

সূরা হুমাযাহ আয়াত -১ এ আল্লাহ্‌ তায়ালা বলছেনঃ

অর্থের বাংলা অনুবাদঃ

“ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনা সামনি) লোকদের ধিক্কার দেয়(হুমাযাহ) এবং (পিছনে) নিন্দা করতে অভ্যস্ত(লুমাযাহ)।

তাফসীরে জালালাইন  বলা হয়েছে যে “হুমাযাহ”এবং “লুমাযাহ”শব্দ দুইটির অর্থ নিয়ে তাফসীর কারকদের ভিতরে কিছুটা মতবিরোধ আছে তবে  অধিকাংশ তাফসীর কারকদের মতে “হুমাযাহ”এর অর্থ হচ্ছে গীবত অর্থাৎ পশ্চাতে পরনিন্দা করা এবং “লুমাযাহ”এর অর্থ হচ্ছে সামনা -সামনি দোষারূপ করা ও মন্দ বলা। কুরআন ও হাদিসের নানা বর্ণনা মতে এই দুইটি কাজই জঘন্য গুনাহ।

মাওলানা মওদূদী (রঃ) এর লিখিত   তাফসীর “তাফহীমুল কুরআন”এ  বলেছেন যে, “যেহেতু “হুমাযাহ”ও “লুমাযাহ”শব্দ দুইটা এক সাথে এসেছে, তাই উভয় মিলে এখানে যে অর্থ দাড়ায় তা হচ্ছে, “সে কাউকে লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। কারো প্রতি তাচ্ছিল্য ভরে আঙ্গুলি নির্দেশ করে। চোখের ইশারায় কাউকে ব্যাঙ্গ করে কারো বংশের নিন্দা করে। কারো ব্যক্তি সত্তার বিরূপ সমালোচনা করে। কারো মুখের উপর তার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে।কারো পিছনে তার দোষ বলে বেড়ায়। কোথাও চোগলখুরী করে এবং এর কথা ওর কানে লাগিয়ে বন্ধুদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। কোথাও ভাইদের পারস্পারিক ঐক্য ফাটল ধরায়। কোথাও লোকদের নাম বিকৃত করে খারাপ নামে অভিহিত করে। কোথাও কথার খোঁচায় কাউকে আহত করে এবং কাউকে দোষারূপ করে।এসব তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে”।

শাস্তি হিসাবে তাদের “হুতামা” নামক জাহান্নাম বা দোযখের আগুনে ছুড়ে ফেলা হবে। পবিত্র কুরআনের একমাত্র সূরা “হুমাযাহ” ছাড়া আর কোথাও জাহান্নামের আগুনকে আল্লাহ্‌ এর আগুন বলা হয় নাই। এখানে এই আগুনকে আল্লাহের সাথে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে এর আগুনের প্রচণ্ডতা ও ভয়াবহতারই প্রকাশ এর সাথে সাথে এদের প্রতি আল্লাহের প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্রোধের দৃষ্টিকেও বর্ণনা করা হয়েছে”।

সূরা হুজরাতের   ১১ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ

অর্থের বাংলা অনুবাদঃ

“ হে মুমিনগণ! কোন পুরুষ যেন অন্য পুরুষকে উপহাস/বিদ্রুপ না( “La yaskhar) করে; কেননা যাকে উপহাস/বিদ্রুপ করা হয়, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস/বিদ্রুপ না করে; কেননা যাকে উপহাস/বিদ্রুপ করা হয় সে উপহাসকারিণীর অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারূপ করোনা( La talmizū) এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকোনা( La tanābazūbil-alqābi)। ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা এ ধরনের আচরন হতে নিবৃত্ত না হয় তারাই যালিম”।

ইমাম কুরতুবি(রাঃ) বলেন ঃ কোন ব্যক্তিকে হেয় ও অপমান করার জন্য তার কোন দোষ এমন ভাবে উল্লেখ করা যাতে শ্রোতাগণ হাসতে থাকে , তাকে “সাখখার বলা হয়। এটা যেমন মুখে সম্পন্ন হয়, তেমনি হাত-পা ইত্যাদি দ্বারা ব্যাঙ্গ অথবা ইঙ্গিতের মাধ্যমেও হতে পারে। কারো কথা শুনে অপমানের ভঙ্গিতে বিদ্রুপ করার মাধ্যমেও হতে পারে।

 এই আয়াতের, “তালমিযু” এর অর্থ হচ্ছে, “কারো দোষ বের করা, দোষ প্রকাশ করা এবং দোষের কারনে ভর্ৎসনা করা। ইরসাদ করা হয়েছে যে, “লা তালমিযু আন ফুছাকুম”–অর্থাৎ তোমরা নিজেদের দোষ বের করোনা অর্থাৎ তোমরা অন্যের দোষ বের করলে সেও তোমাদের দোষ বের করবে। কারন দোষ থেকে কোন মানুষ মুক্ত নয়।

এই আয়াতের, “tanābazūbil-alqābi” এর অর্থ হচ্ছে,“অপরকে মন্দ নামে ডাকা, যার দারুন সে অসন্তুষ্ট হয়। উদাহরন স্বরুপ শারীরিক পঙ্গুত্ব আছে এমন কাউকে তার সেই পঙ্গুত্ব উল্লেখ করে ডাকা অথবা অপমানজনক নামে সম্বোধন করা।

ইবনে আব্বাস(রাঃ) বলেছেন, “তানাবাজু বিল আলকাবি”(tanābazūbil-alqābi), এর অর্থ হচ্ছে, কেউ কোন গোনাহ বা মন্দ কাজ করে তাওবা করার পরও যদি সেই মন্দ নামে ডাকা”। উদাহরন স্বারুপ, চোর, ডাকাত, ব্যভিচার অথবা মদ্যপান ইত্যাদি থেকে তাওবা করে নেয়, তাকে তার অতীত কুকর্ম দ্বারা লজ্জা দেয়া ও হেয় করা হারাম।

এর পরের আয়াতে (আয়াত ১২) তে বলা হচ্ছেঃ

অর্থের বাংলা অনুবাদঃ

হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ অনুমান(ẓani)  হতে দূরে থাকো, কারন অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ এবং একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করোনা(tajassasū) এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা(yaghtab )করোনা। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষন করতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো এটাকে ঘৃণা করো। তোমরা আল্লাহ কে ভয় করো। আল্লাহ তাওবা গ্রাহনকারী, পরম দয়ালু”।

এই ১২ নং  আয়াতে তিনটি বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (১) “যান”(ẓann) অর্থাৎ “অনুমান করে কথা বলা” বা “সঙ্গত কারন ছাড়াই কোন ধারনা বা অনুমান করা”(conjecture, assumption, opinion)  ; (২)“tajassasūঅর্থাৎ একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করা বা গোপনে লক্ষ্য করাবা অন্যায় কৌতূহল ভরে কোন কিছুর সম্বন্ধে খোঁজ-খবর নেয়া(spy on/ pry on) ; (৩) গীবতকরা (“yaghtab”) অর্থাৎ একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করা, এমন কথা বলা যা সে শুনলে কষ্ট পাবে।

এই আয়াত দ্বারা কোন মোসলমানের অসন্মান করাকে ও অপমানকে তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমতুল্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সামনে উপস্থিত থাকলে এই অপমান জীবিত মানুষের মাংস টেনে টেনে খাওয়ার সমতুল্য হবে। একে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

তাহলে আমরা  দেখি, সূরা হুজরাতের ১১ও ১২ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ তালা কঠোর আদেশকরেছেন মোমিনগন যেনঃ

(১) কখনো কোনোভাবেই কাউকে উপহাস/বিদ্রুপ না  করে; (২) কখনো কোনোভাবেই একে অপরের প্রতি দোষারূপ  না করে; (৩) কখনো কোনোভাবেই  একে অপরকে মন্দ নামে না ডাকে; (৪) কখনো কোনোভাবেই অনুমান-ভিত্তিক কথা না বলা থেকে বিরত থাকে; (৫) কখনো কোনোভাবেই একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান না করে; (৬) কখনো কোনোভাবেই একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা না করে।

এই ছয়টি অভ্যাসগুলিকে চরমভাবে  ও কঠোরভাবে ঘৃণিত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর সেই ঘৃণ্যতার নীচতাকে আরও কদর্য ভাবে ও নিষিদ্ধতার কঠোরতাকেআরও শক্তিশালী ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য আল্লাহ্‌ ঘোষণা দিচ্ছেন যে, এই কাজগুলি করা মানে হল নিজে নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমতুল্য। কিন্তু কোন মৃত মোসলমানের মাংস খাওয়া যেমন হারাম ও চূড়ান্ত নীচতা তেমনি গীবত করাও হারাম ও চূড়ান্ত নীচতা।

 চোখের ইশারায়, অঙ্গভঙ্গিতে, শ্রবণে ও লিখনে গীবত :

পরনিন্দা কেবল মুখের বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং চোখের ইশারায়, অঙ্গভঙ্গিতে, শ্রবণে ও লিখনের দ্বারাও গীবত হয়ে থাকে। সর্বপ্রকার গীবতই হারাম। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন, একদিন আমি হাতের ইশারায় এক স্ত্রীলোককে খর্বাকৃতি বললে’রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে আয়েশা। তুমি গীবত করেছ, থুথু ফেলো। তৎক্ষণাৎ আমি থুথু ফেলে দেখলাম তা কালো বর্ণের জমাট রক্ত।

ইবাদতের ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখপূর্বক সমালোচনা করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন অমুক ব্যক্তি উত্তম রূপে নামাজ পড়ে না অথবা রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে না অথবা নফল নামাজ পড়ে না অথবা রমজানের সবগুলো রোজা রাখে না অথবা মাকরুহ্ ওয়াক্তে নামাজ পড়ে।

চোগলখুরী বা নামীমাহ এর বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছে সূরা আল-কালাম এর ১১ নং আয়াতেঃ

অর্থের বাংলা অনুবাদঃ

(১০) “এবং অনুসরন করোনা তার যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত; (১১)“যে পশ্চাতে নিন্দা করে(হাম্মাযি), একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে ফিরে(নামীম)”।

চোগলখুরী (নামিমাহ-Nameemah):ঝগড়া বিবাদ, ভুল বুঝা-বুঝি,মনোমালিন্যের উদ্দেশ্যেএকজনের কথা অন্যজনের নিকটে বলাকেই ইসলামের পরিভাষায় নামীমা বা চোগলখুরি বলে। সকল ইসলামী চিন্তাবিদগন এ সম্পর্কে একমত পোষণ করেন যে, চোগলখুরী সম্পুর্ণ হারাম।

“তাফসীর তাদাব্বুর আল-কুর’আনে (Tafsir Tadabbur al-Quran) মুফতি Amin Ahsan Islahi বলেছেন যে “হাম্মায” হোল “হামাযা” এর জোরালো রূপ। এর মানে হোল মন্দ বা আজেবাজে  অঙ্গভঙ্গিকারী বা ইশারা কারী। এদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হোল এরাউপহাস করার উদ্দেশে যে কোন ধরনের আজেবাজে ভাবে শারীরিক বা মৌখিক অঙ্গভঙ্গি করে কেউকে অন্যদের চোখে কেউ নিচু করতে চান”।

“গীবত, পরনিন্দা করা বা চোগলখুরী” এই তিনটি অভ্যাসই জঘন্যতম পাপ। এখন দেখবো হাদিসে এই জঘন্য নোংরা অভ্যাসগুলির শাস্তি ও পরিনতি সম্পর্কে  কি বলা হয়েছে ।

গীবতের পরিণতি বা শাস্তি :

গীবত, পরনিন্দাকরাবাচগলখুরি ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

(১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা অপরের গীবত করা থেকে সর্বদা নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করো। কারণ, গীবতের ভেতর তিনটি মারাত্মক আপদ রয়েছে, (এক) গীবতকারী ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। (দুই) তার কোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। (তিন) তাকে অসংখ্য পাপরাশির বোঝা বহন করতে হয়”। (মুকাশাফাতুল কুলুব)

(২) হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজ্বের ভাষণে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “হে লোকসকল। তোমাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের উপর হারাম করা হল।”এ প্রসঙ্গে মহানবীর আরেক হাদীসে উল্লেখ আছে, “কোন মুসলিম ব্যক্তির নিহত হওয়ার তুলনায় সমগ্র পৃথিবীর পতন আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ব্যাপার।”

(৩) হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সন্দেহ থেকে বেঁচে থাক, সন্দেহ সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা’; আড়ি পেতে শোনাতে যেওনা; একে অপরের উপর গোয়েন্দাগিরি  করোনা;  ঘৃণা করো না; পরস্পর ঈর্ষা করো না; পরস্পরকে ত্যাগ কোরো না; একে অপরের প্রতি ঘৃণা করো না।একে অপরের সাথে ভাইয়ের মতো হও, হে আল্লাহের বান্দাগন।( আল-বুখারি। ৫১৪৪; মুসলিম, ২৫৬৩)

(৪) গীবতের পরিণাম সম্পর্কে নবি করিম (সা.) বলেছেন, “আগুন যেমন শুকনো কাঠ জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে ফেলে, গীবতও তদ্রূপ মানুষের সওয়াবসমূহ ধ্বংস করে ফেলে”।

(৫) গীবতের শাস্তি সম্পর্কে আবু দাউদে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : মিরাজের রাতে যখন আসমানের ওপর গমন করি, তখন এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যারা তাদের চেহারা ও মুখমণ্ডল তাদের নখ দিয়ে (কোনো কোনো রেওয়ায়েতে তাদের নখ ছিল তামার) আঁচড়াতে ছিল। তখন আমি জিজ্ঞেস করি, হে জিব্রাইল, এরা কারা? তিনি বলেন, এরা তারা যারা দুনিয়াতে অন্য লোকের গোশত ভক্ষণ করত (অর্থাৎ গীবত করত) এবং মানুষের ইজ্জত নষ্ট করত।(আল-বুখারি৬০৯৫; আবু দাউদ-৪২৫৩)।

(৬)রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন, “ যে ব্যক্তি কোন মোসলমানকে এমন গুনাহ দ্বারা লজ্জা দেয় যা থেকে সে তাওবা করেছে, তাকে সেই গোনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছিত করার দায়িত্ব আল্লাহ্‌ তায়ালা গ্রহন করেন(কুরতুবী)।

গীবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক:

 হযরত আবু সাঈস এবং জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত। উভয়ে বলেন, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ গীবত করা ব্যভিচার করার চেয়েও জঘন্য। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল,গীবত কি করে ব্যভিচারের চেয়ে জঘন্য হয়?

রাসূল সাঃ বললেনঃ নিশ্চয় ব্যভিচারকারী ব্যভিচার করে তওবা করে থাকে, ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, কিন্তু গীবতকারীকে ক্ষমা করা হয় না, যতক্ষণ না যার গীবত করেছে সে তাকে ক্ষমা করে।
(বায়হাক্বী, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৬৩১৫, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস ৬৫৯০)

 চোগলখুরীর শাস্তিঃ

 (১) সাহিহ বুখারি ও সাহিহ মুসলিমে হযরাত ইবনে আব্বাস(রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসুলুল্লাহ(সাঃ) দুটি কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমন করার সময় বলেনঃ “ এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, আর এদেরকে খুব বড় পাপের কারনে শাস্তি দেয়া হচ্ছেনা। এদের একজন প্রসাব করার সময় পর্দা করতনা এবং অন্যজন ছিল চোগলখোর

এ হাদীসে, “কোন বড় ধরণের গুনাহের জন্য তারা শাস্তি ভুগছে না”এ উক্তির অর্থ একটাই, তাদের ধারণায় তাদের কৃত গুনাহ তেমন বড় ছিল না। এজন্য কোন কোন বর্ণনাতে রয়েছে, রাসুল(সা) বলেছেন, “তবে অবশ্যই তা কবীরা গুনাহ ছিল”।

(২) রাসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,“চোগলখোর” জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (বুখারি ৬০৫৬,মুসলিম ১০৫,আবু  দাউদ,তিরমিযি)

(৩)রাসুল(সা) বলেছেন, “তোমরা সবচেয়ে অধম লোক দেখতে পাবে সেই ব্যক্তিকে, যে বিভিন্ন জনের কাছে গিয়ে নিজেকে বিভিন্নভাবে বা বিভিন্ন আকারে প্রকাশ করে। আরযে ব্যক্তি পৃথিবীতে দ্বিমুখী আচরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে দুটি আগুনের জিহবা দিবেন।[বুখারি,মুসলিম,মুয়াত্তা]

দ্বিমুখী আচরণ(চোগলখোরী) দ্বারা এখানে দুজনের সাথে দুধরণের কথা বলার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বলেছেন, “দ্বিমুখী লোক বলতে সাধারণত চোগলখোরকে ধরে নেয়া হয়, যে ব্যক্তি একজনকে গিয়ে বলে ;অমুক তোমার সম্পর্কে এরুপ কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট দুপক্ষের যে কোন পক্ষ অথবা তৃতীয় কোন পক্ষ যে গোপনীয় বিষয় অপছন্দ করে তা প্রকাশ করা। প্রকাশিত ব্যাপারটি কারো কথা, কাজ বা কোন দোষ ত্রুটি যাই হোক না কেন ।

অতএব চোগলখুরী হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কেউ বা তৃতীয় কেউ অপছন্দ করে এমন তথ্য ফাঁস করা। মানুষের যে অবস্থা দৃষ্টিতে পড়ুক না কেন, তা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করায় যদি কল্যাণ না হয় এবং এর দ্বারা সমাজকে কোন গুনাহ থেকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।”

যে সব ক্ষেত্রে গীবত, পরনিন্দা করা অনুমোদিত (জায়েয):

অন্য কোন বিকল্প উপায় না থাকলে এবং যৌক্তিক ও যথা উপযুক্ত নৈতিক কারন থাকলে,কিছু কিছু গীবত বা পরনিন্দা করা অনুমোদিত।কোনো কোনো রেওয়ায়েত থেকে প্রমাণ হয় যে, গীবতসংক্রান্ত উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস সমূহে সব গীবতকেই হারাম করা হয়নি এবং কিছু গীবতের অনুমতি আছে আর তখন সেগুলোকে গীবত বলা হয় না এই অনুমোদিত “গীবত বা পরনিন্দাগুলি নিম্নরূপ:

 (১)  কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী এমন ব্যক্তির সামনে বর্ণনা করা, যে তার অত্যাচার দূর করতে সক্ষম।কোনো প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরী হলে তা গীবতের মধ্যে দাখিল নয়, তবে প্রয়োজন ও উপযোগিতাটি শরিয়তসম্মত হতে হবে।

(২) কুরাআন, হাদিস এবং ফুকাহাগনের ঐকমতের দ্বারা নিষিদ্ধ বা ভুল কাজ বন্ধের জন্য ও অন্যায়কারীদের সংশোধন করার সদিচ্ছায় সাহায্য চাওয়া।এই ক্ষেত্রে এক জন ব্যক্তি বলতে পারে,” অমুক ব্যক্তি এই এই ধরনের খারাপ কাজে লিপ্ত, তাকে এই গুলি বন্ধে সাহায্য কারুন। যদি ইচ্ছা এমন না হয়, তবে এই ধরনের কথা বা ব্যাবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

(৩)  ইসলামিক ধর্মীয় মতামত বাফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া ও – প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি হোলে।

(৪) পরিবারে বা সমাজে প্রচলিত বা চলমান খারাপ নিষিদ্ধ কাজ সমূহের বিপদ সমুহ নিয়ে মুসলিমদের সতর্ক করা ও উপদেশ দেয়ার প্রয়োজনেঃ

উদাহারন স্বারুপ, কেউ যদি বিবাহের উদ্দেশ্যে কারও কাছে পাত্র বা পাত্রীর সম্পর্কে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করে বা জানতে চায়। তাহলে নিয়ম হল- দোষ-ত্রুটি থাকলে তা বলে দেয়া। তা গীবত হবে না। কারণ ওই পাত্র বা পাত্রীর দোষ-ত্রুটি এখন না বললেও বিয়ের পরে যখন প্রকাশ পাবে তখন দাম্পত্য জীবনে অনেক ফিৎনা-ফ্যাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে ।

(৫) কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি-সমুহ প্রকাশ্য ভাবে ইসলামিক ভাবে নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত  হয় বা থাকে , তার বা তাদের সম্পর্কে বলাঃ উদাহরন স্বারুপ কোন ব্যক্তি সে সাধারন নাগরিক হোক বা ক্ষমতাসীন হোক যদি প্রকাশ্য ভাবে মদ্য পানে লিপ্ত হয় বা অন্য কোন বড় ধরনের অশালীন কাজে লিপ্ত হয়।

(৬) কেউ যদি এমন কোন নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে থাকে যাতে কোন দোষের আভাস পাওয়া যায়, কিন্তু সে নাম নিলে সে দুঃখ পায়না।যেমন প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা(রাঃ )নাম।ইসলাম গ্রহনের পর উনারনাম দেয়া হয় আবদ আর-রাহমান ইবনে শাকর আল-আযদি। যেহেতু উনার অনেক গুলি বিড়াল পালতেন,তাই রাসুল(সাঃ ) উনাকে আদর করে ডাকতেন, “আবু হুরায়রা” বলে যার অর্থ হোল “ বিড়ালের পিতা”। উনি এই নামেই পরিচিত।

মূলকথা হলো কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে যেন তার দোষ বর্ণনা না করা হয়, নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদেই যেন তা করা হয়। (তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন)

 

—-চলবে।

“তুমি কি পছন্দ করো মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে?”- পর্ব- ১

“তুমি কি পছন্দ করো মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে?”

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী