বয়ঃসন্ধি সময়ের ভাবনা

নাসিমুন নাহারঃ  মা আমাকে একটি জিলেট রেজার কিনে দাও না প্লিজ—আহ্লাদে গদগদ হয়ে আহু বলল।

টাসকিত হয়ে বললাম— জিলেটে কি হবে ?

আহু– মুখের সুতা কাটব।

দাঁড়িকে আমার আব্বাজান সুতা বলে।
কাঁদো কাঁদো ভাবে ভাবলাম –আহারে আমার বাচ্চাটা বড় হয়ে যাচ্ছে……….

বললাম–আচ্ছা সুতা যখন দেখা যাবে ভালোমতো সেদিনই জিলেট কিনে দিব। কিন্তু জিলেটের কথা কে বলল তোমাকে ?

আহু— টিভিতে দেখেছি। মা জানো মেয়েদেরও না জিলেট আছে। তোমার জন্যও কিনতে হবে।
শ্রদ্ধা কাপুরের একটা এডে দেখলাম। মেয়েদেরও সুতা হয় মা?

বহু কষ্টে হাসি গিলে ফেললাম। এসব সিরিয়াস ডিসকাশনের সময় আমি হেসে ফেললে আহু খুব আনইজি ফীল করে নোটিশ করেছি।

যাহোক সুতার গল্প আজকে বলব না। এটা জমা থাক। আমার ছেলেটার প্রথম সুতা কাটাকাটির দিনে নাহয় সে গল্প লিখব।

আজ শোনাব গতকাল রাতে আহ্ নাফের সাথে পটর পটর করা কথাগুলো। রোজ রাতে ঘুমানোর সময় রাজ্যের আলোচনা করি আমরা।
কাল সে বলেছে—- আচ্ছা মা টিনএজকে কেন ক্রাইসিস পিরিয়ড বলা হয়? এই কথাটা সে ডিসকভারিতে শিশু কিশোরদের নিয়ে বানানো একটা ডকুমেন্টারিতে শুনেছে।

যদিও মা হিসেবে আমি খুবই ফাঁকিবাজ টাইপ। তবে ছেলের বন্ধু হিসেবে এখন পর্যন্ত বেস্ট।
আমাদের আলোচনাটুকু হুবহু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এটা কোন মেডিকেল ডিসকাশন নয়।
ক্লাস থ্রিতে পড়ুয়া এক বাচ্চার সাথে তার মায়ের কথোপকথন। আশা করি বিজ্ঞজনেরা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

—- শোন বাবা টিনএজ হচ্ছে 13 থেকে 19 পর্যন্ত বয়সটা। দেখো এদের শেষে টিন আছে। এ সময়ে তুমি বেবি থেকে ধীরে ধীরে এডাল্ট হতে শুরু করবে। এই ছয় বা সাত বছরে তোমার কিছু physical এবং mental পরিবর্তন হবে। এখন যেমন তুমি আর তোমার বন্ধু প্রাপ্তি যদি এক রকম পোশাক পর, ক্যাপ পর মাথায় দুজনকেই ছেলে মনে হবে। তাই না? কিন্তু টিনেজ পিরিয়ডে তোমাদের শরীরের কিছু হরমোনাল চেইঞ্জ হবে। আর এতে করে ছেলে এবং মেয়েকে এক রকম পোশাক পরলেও দেখেই বোঝা যাবে কে ছেলে আর কে মেয়ে। ছেলেদের সুতা হন, হাতে পায়ে শরীরে লোম হবে, গলার ভয়েস চেইঞ্জ হবে। মেয়েদেরও শরীরে কিছু পরিবর্তন আসবে।

আহু— হরমোনাল চেইঞ্জের সময়ে কি ব্যথা পাব মা ?

আমি— না তো আব্বু। কিন্তু অনেকে এ সময়ে খানিকটা লজ্জা বা ভয় পায়। ধর তুমি তো এখন হাফ প্যান্ট পর। যখন পায়ে বড় বড় লোম হবে তখন হাফ প্যান্ট পরতে অস্বস্তি হতে পারে তোমার। দেখ না স্কুলে ক্লাস সিক্স থেকে ভাইয়াদের আর আপুদের ড্রেস চেইঞ্জ হয়ে যায়।
কিংবা গলার ভয়েস মোটা মোটা হবে বলে রাগ লাগতে পারে তোমার।
মেয়েদের ক্ষেত্রেও শরীরের বেশ কিছু বড় পরিবর্তন ঘটে এ সময়ে।মেয়েরা ইচ্ছে করলেও খুব গরম লাগছে বলে জামা খুলে ফেলতে পারবে না এ সময়ে।

এসব পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মন খারাপ হতে পারে, ভয় লাগতে পারে। তখন অনেকে চুপচাপ হয়ে যায়, রাগ করে, কথা কম বলে, চঞ্চল বাচ্চাটা শান্ত হয়ে যেতে পারে। মনে অসংখ্য প্রশ্ন আসে এ সময়ে।

এসব নিয়ে যদি বাবা মায়ের সাথে কথা বলে তাহলে ভয় কেটে যাবে। তবে সবার সাথে এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো। বাবা মা ছাড়া অন্যরা ভুল ব্যাখাও দিতে পারে। বিদেশে স্কুলে এই টপিকে লেখা-পড়া হয়।
মোট কথা- আব্বু, মনে রাখবা শরীর এবং মনের এই পরিবর্তন হচ্ছে নরমাল লাইফ সাইকেল সব প্রানীর জন্য। লজ্জা, ভয় বা লুকানোর কিছু নেই এখানে।

আহু— থ্যাঙ্কু মা। আমি এখন তাড়াতাড়ি টিনএজ হতে চাই। ব্যাপারটা তো মজার।
একটু থেমে গলা জড়িয়ে ধরে বাবাটা বলল — আল্লাহ কে থ্যাংকস তোমাকে আমার মা করার জন্য। অন্য মা’রা খুব রাগী হয় স্কুলে দেখেছি। এসব জানতে চাইলে আমি সিউর তারা বেবিদের বকা দিবে। বাবা মায়েরা ভাবে বেবিরা ছোট। আমরা কিছু বুঝি না। কিন্তু এটা ভুল।
গুড নাইট। লাভ ইউ মা।
লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী