যেভাবে ভেঙ্গে যায় সুখের সংসার !

ডাঃ নাসিমুন নাহারঃ

শেষ পর্যন্ত সংসারটাই আর করা হলো না টুশির।কারনটা যদি এক লাইনে বলি তাহলে বলতে হয়—- যতটা না টুশি আর আবিদ (টুশির এক্স বর)নিজেদের ঘর ভাঙ্গার জন্য দায়ী, তার থেকে বহুগুণ উৎসাহী ছিল তাদের দুজনের মা এবং বোনেরা তাদেরকে আলাদা করার ব্যাপারে।ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও সত্যি।আবিদের মায়ের শুরু থেকেই টুশিকে অপছন্দ কারন ওর গায়ের রং।আর টুশির মায়ের আবিদকে অপছন্দ কারন ওদের বিয়েটা ছিল নিজেদের পছন্দের।যদিও পারাবারিকভাবে ঘটা করে এই ডাক্তার জুটির বিয়েটা হয়েছিল।

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ হচ্ছে জাষ্ট স্লো পয়জন।স্পেশ্যালী দু পরিবারের সদস্যরা যখন এখানে ঢুকে পড়েন তখন কিছুতেই সেই সংসার আসলেই টেকানো সম্ভব হয় না।দু’পক্ষের ইগো, জিদ, হারজিত সবকিছু মিলিয়ে লেজেগোবরে হয়ে যায় সম্পর্কটা।

আমাদের সমাজে ছেলের মায়েরা এমনিতেই ছাড় দেবার মানসিকতার হন না।তিনি ছেলের মা— এটাই ছেলের বিয়ের সময় এবং পরবর্তীতে তার ডেজিগনেশন হয়ে ওঠে ! আগে এই ইস্যুতে মেয়ের মায়েরা মোটামুটি চুপচাপ ই থাকতেন।মেয়ের মায়ের আবার ভয়েস কি ! কিন্তু আজকাল মেয়েরাও উচ্চশিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হচ্ছে বলেই কিনা ( আমি যদিও সিউর না এই পয়েন্টে।তবে মনে হচ্ছে এটাই কারন হতে পারে ) মেয়ের মায়েরাও দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছেন ! কিসের ছাড় দিবে আমার মেয়ে ? আমার মেয়ে কি কম নাকি ? আদরে যত্নে বড় করেছি/ডাক্তার ইন্জিনিয়ার বানিয়েছি/কিসের কমতি খামতি আমার মেয়ের মাঝে ইত্যাদি—অনেকটা এমনই মনোভাব তাদের।আবারো বলছি এই পয়েন্টটাতে আমার ভুল হতে পারে।

আচ্ছা তাহলে কি লেখাপড়া শেখাটাই পাপ হচ্ছে মেয়েদের জন্য ?!!!!
এটা কিন্তু স্বাভাবিক একজন উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে আর এইচ এস সি পাশ করা মেয়ের ভাবনা চিন্তা জীবনবোধে আকাশ পাতল পার্থক্য হবেই।আর এতদিন যেহেতু financial contributions শুধু ছেলেরা করত বলেই মেয়েরা ঘর সংসারের অনেক কিছুই ‘মনে না নিয়েও মেনে নিত’।
কারন মেনে না নিয়ে আর কোন অপশন নেই তার সামনে।কি খাবে? কই থাকবে ?—– সবথেকে ভাইটাল ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু যেহেতু আজকাল অর্থনৈতিকভাবে মেয়েরাও যথেষ্ট ভালো অবস্থানে যাচ্ছে সেহেতু সবাই বাধ্য হতে পারে না ‘মনে না নিয়েও মেনে নিতে’। হতেই পারে এমন।কারন জরুরী না যে সবার জীবন একই গত বাঁধা ছকে হতে হবে।
স্রোতের বিপরীতে কেউ কেউ আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

তবে শিক্ষিত অশিক্ষিত/ছেলে মেয়ে যাই হোক না কেন আমাদের দেশে এখনও সন্তানের লেখাপড়া থেকে শুরু করে বিয়ে, ক্যারিয়ার, কখনোবা সন্তান নেবার ইস্যুতেও পরিবার সিদ্ধান্ত (সরাসরি বললে শব্দটা হবে–নাক গলায়) নেয় !

এইটুকু পড়ে অনেকেই গালাগাল দিবেন আমাকে, জানি।কিন্তু এই কথাটা ভয়াবহ রকমের সত্য।আমাদের দেশের বাবা মায়েরা সন্তানকে সব সময়ই কেন যেন “খোকা খুকি বা বাবু” ইমেজে দেখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।সন্তান যে একজন আলাদা মানুষ, একটা বয়সের পর বাবা মায়ের প্রভাব মুক্ত হয়ে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব যে গড়ে ওঠে এই অবধারিত সত্যটা অনেক বাবা মা’ই মানতে নারাজ।অনেকেই ভাবেন সন্তান সব সময়ই শিশুবেলার মত বাধ্য হয়ে থাকবে।

আমি বলছি না সন্তান অবাধ্য হোক।কিন্তু সন্তান কার্বন কপি/তোতা পাখি হবে –এটা আশা করা কি যৌক্তিক ? কার্বন কপি না হলেই সেই সন্তান অবাধ্য, নষ্ট হয়ে গেছে, পচে গেছে, উচ্ছন্নে গেছে, গোল্লায় গেছে এসব ভাবাটা কি অদ্ভুত না ? বাধ্য সন্তান হতে যেয়ে বহু সন্তান নিজের লেখাপড়া, ক্যারিয়ার পর্যন্ত বাবা ময়ের পছন্দে তৈরি করছে।আর অনেক মেয়ে দেখি আশেপাশে যারা মায়ের শলা পরামর্শে শ্বশুরবাড়ি deal করতে যেয়ে বেড়াছেড়া লাগিয়ে ফেলছে।আর ছেলেরা মায়ের , বোনের মুখের কথা ভেবে তাদের পরামর্শে বৌকে টাইটের উপরে রাখে ! As a result অশান্তির সংসার।

সংসার আসলেই এক বিচিত্র জায়গা! এখানে কেউ হারতে চায় না।সবাই জিততে চায়।সবাই চায় প্রভাব বিস্তার করতে। আর এক্ষেত্রে সব থেকে পছন্দের experimental element হচ্ছে—-নিজ সন্তান ! ভালো চেয়েই সন্তানের জীবনের খুঁটিনাটিতেও আমাদের দিশের বাবা মায়েরা জড়িয়ে থাকতে চান।তবে এই মাত্রাতিরিক্ত জড়িয়ে থাকার ফলাফল সব সময় সুখোকর নাও হতে পারে।

যাহোক অনেক এলেবেলে কথা লিখলাম।একটা ভালো কথা দিয়ে লেখাটা শেষ করছি।
নিজেকে মোটিভেট করতে প্রায়ই একটা কথা আমি নিজেকে বলি —– আমার জীবনটা শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র আমার ই ।এটাই সত্য।
আমার দুঃখ কষ্ট হাসি আনন্দ কেন অন্যদের ইচ্ছায় তৈরি হবে ? নিজের ভালো থাকার ইস্যুতে হলাম না হয় self-centered.
.

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী