আমেরিকান চাইনিজ সেলুনে যেভাবে ধরা খেলাম

ড. রউফুল আলমঃ

চুল কাটাতে গেলাম। দোকানের নাম চং সেলুন। চাইনিজ সেলুন। আমেরিকার যেনো-তেনো সেলুনে চুল কাটাতে লাগে কুড়ি ডলার। চাইনিজ সেলুনে গেলে লাগে অর্ধেক। তাছাড়া, টিপসও দেয়া লাগে না। মানুষের বদনজরে মাথার চুলগুলো কমে গেছে। এই সামান্য কয়টি চুলের জন্য বিশ ডলার খরচ করার কোন মানে নেই।

দোকানে ঢুকেই দেখি কয়টি মেয়ের বড়ো বড়ো ছবি ঝুলানো। সবগুলোই চাইনিজ মেয়ে। হয়তো চীন দেশের মডেল কিংবা বিখ্যাত অভিনেত্রী। কিন্তু এই ছবিগুলো এখানে টানিয়ে রাখার কোন কারণ খুঁজে পেলাম না। দুনিয়াতে মানুষ অবশ্য কারণ ছাড়াই বহু কাজ করে। একটু পর পর একটি মেয়ে কণ্ঠ বলে উঠে—ওয়েলকাম টু চং সেলুন! এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম, শব্দটা আসে একটা ঘড়ি থেকে। একই দোকানে পুরুষ ও নারীর চুল কাটানো হয়। এক চেয়ারে একজন পুরুষ কাজ করছেন। অন্য চেয়ারে একজন নারী। দুজন সম্ভবত স্বামী-স্ত্রী। চাইনিজ দম্পতিরা একসাথে দোকান চালায়। তাদের মধ্যে এটা খুবই প্রচলিত।

সিরিয়ালে আমি তিন নম্বর। আমার আগে যে দুজন বসে আছে, তারা সম্ভবত ভারতীয় যুগল। তরুণ বয়স। ইউপ্যানের স্টুডেন্ট হবে হয়তো। বসে বসে পিস্টাচিও বাদাম খাচ্ছে। একজন ভেঙ্গে খোসা ছাড়িয়ে অন্যজনকে দিচ্ছে। কট কট আওয়াজ হচ্ছে। বাদাম খাওয়ার এই স্টাইল ভারতবর্ষ ছাড়া দুনিয়ার আর কোথাও দেখিনি। ‘এসো নিজে করি’ শিখেও আমরা এই কাজটা নিজে করি না। বাদামের খোসা ছাড়িয়ে প্রিয়তমার হাতে দেয়া, আমাদের সংস্কৃতিতে একটি ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে।

চাইনিজ সেলুনগুলোতে সাধারণত চাইনিজ ছেলেদের দেখা যায় না। চাইনিজ ছেলেরা ইউরোপ-আমেরিকায় আসার আগে একটা চুল কাটার মেশিন নিয়ে আসে। চীন দেশে চার-পাঁচ ইয়েন দিয়ে চুল কাটা যায়। বিদেশে এসে বেশি টাকা খরচ করে তারা চুল কাটতে আগ্রহী না। আমি যতো চাইনিজ সহকর্মী পেয়েছি, তারা সবাই নিজের চুল নিজেই কাটে। তাদের মাথায় চুল খাবলানো খাবলানো হয়ে থাকে। এ নিয়ে ওরা মোটেও বিব্রত হয় না। বাঙালী অবশ্য চুলের সৌন্দর্যের ব্যাপারে খুবই সচেতন। আমরা গড়ে দশবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল ঠিক করি। বাঙলার বহু পুরুষ, পকেটে একটি চিরুনি রাখে।

চুল কাটাতে চেয়ারে বসলাম। লোকটা কথা কম বলে। সম্ভবত ইংরেজিতে দুর্বল। লোকটা শুধু ওকে ওকে করে। কিছু বলার আগেই তিনবার ওকে বলে। কথা কম বললেও, মুখে হাসি লাগিয়ে রাখে। তাকে শুধু বললাম সিজর সিজর! এর মানে হলো কাঁচি ব্যবহার করো। তা না হলে মেশিন দিয়ে চুল ছেঁটে মাথার তালু দৃশ্যমান করে দিবে। চুল কাটতে কাটতে এক পর্যায়ে সে আমার মুখোমুখি হলো। চোখ উঁচু করে তাকাতেই তার নাসারন্ধ্রে চোখ গেলো। তার নাক ভর্তি চুল। বিশ্রী রকমের অবস্থা। সে সম্ভবত নাকের লোম বড়ো রেখে গিনিস রেকর্ড করতে চেয়েছিলো। কী অদ্ভুত! যে লোকটা শত শত মানুষের চুল কেটে দিচ্ছে, তার নাক ভর্তি চুল! সে চুল কাটার সময় তার নেই। তার স্ত্রী চাইলে তাকে ওয়াক্সিং (waxing) করে দিতে পারতো!

আমি চোখ বন্ধ করে রাখলাম। চোখ খোলার কোন ইচ্ছে আমার নেই। মিনিট দশের পর সে বললো, ওকে, ইউ গুড, ইউ গুড। আমি চোখ খোললাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি মাথার সামনের চুলগুলোকে কপালের ছাদে তুলে দিছে। এ কী দশা! হায় খোদা! এই বুড়োকে এখন কী বলি আমি! তার মুখের দিকে তাকাতেই নিষ্পাপ একটা হাসি দিয়ে বসে আছে। হাসিটার অর্থ হলো, তোমাকে দেখতে সুন্দর লাগছে। তুমি টাকা দিয়ে বিদায় নাও! গুণে গুণে তাকে এক ডলারের দশটি নোট দিলাম। বলতে চাইছিলাম, তোমার নাকের চুলগুলো কেটে নিও। টাকা লাগলে আমি দিবো! বলতে পারিনি। ’সস্তার তিন অবস্থা’ ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরলাম।
…….
লেখকঃ গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী