তবুও অচেনা!

আবু এন এম ওয়াহিদঃ

আমরা জানি, জানাশোনার ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা আছে। যেমন ভাসা ভাসা জানা এক কথা আর সম্পূর্ণরূপে গভীরভাবে জানা আরেক কথা। কোনো কিছু ভালোভাবে জানতে হলে এ সম্বন্ধে পড়তে হয়, তাকে দেখতে হয়, বুঝতে হয়, হৃদয়ঙ্গম করতে হয়, কিন্তু এ কাজগুলো বলা যত সহজ করা ততই কঠিন। আমি যখন নতুন কোনো জায়গায় যাই তখন চিলের মতন চারদিকে চোখ ফেলে দেখি, কিন্তু সব কিছু সমানভাবে আমার নজর কাড়ে না। যে-সব দৃশ্য কিংবা ঘটনার প্রতি আমি আকৃষ্ট হই সেগুলো ভালো করে দেখি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, সে সম্পর্কে যতদূর সম্ভব তাৎক্ষণিক জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি। অজানা জায়গায় অচেনা মানুষের কাছ থেকে এতসব জানতে গেলে মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। একবার কাতারের দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত এক দেশী ভাইয়ের কাছে পর পর কয়েকটি প্রশ্ন রাখায় তিনি রীতিমত রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘কে আপনি? কোত্থেকে এসেছেন? আমাকে পুলিশের মতন জেরা করছেন?’ শান্ত হয়ে নরম সুরে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর, মহূর্তের মধ্যে দেখলাম ভদ্রলোক মোমের মত গলে গেলেন এবং যতটুকু জানতে চেয়েছিলাম তারচেয়ে কম নয়, বরং বেশিই বললেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বললেন।

এ-ভাবে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ হোটেলে ফিরে ভুলে যাওয়ার আগে টুকে রাখি। কাগজ না পেলে বিজনেস কার্ডের পেছনে লিখি, বিজ্ঞাপনপত্রে লিখি, রসিদের উল্টোপৃষ্ঠায় লিখি, ব্যবহৃত খামে লিখি, ঠোঙ্গায় লিখি, হাতের কাছে যা পাই তাতেই লিখি। এতে কিছুটা অসুবিধা হলেও সুবিধা অনেক। এলোমেলো বিক্ষিপ্ত লেখাগুলোকে ক্রমানুসারে সাজিয়েগুছিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা একটা কাজ বটে, তবে করতে পারলে তা যে কাজে লাগে তার প্রমাণ আমার আজকের এই লেখাটি। অবশ্য সফরে গেলে সব সময় সব কিছু নিয়মমাফিক হয়ে ওঠে না।পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরজমিনে জোগাড় করতে না পারলে সুযোগ বুঝে কম্পিউটারে গিয়ে উইকিপিডিয়া এবং গুগ্ল-এর সাহায্য নেই। কখনো হোটেলে বসেইসারি, কখনো বাড়িতে এসে।

ভূমিকা এবং লেখালেখির তরিকা শেষ করে এবার আসি আসল কথায়। দু’দু’বার ব্যর্থ চেষ্টার পর আমি চীনের উত্তর-পূর্ব প্রদেশ,‘জিলিন’-এর প্রধান নগরী চ্যাংচুন দেখে এলাম। সেখানে ছিলাম টানা পাঁচ দিন। এলোপাতাড়ি ঘোরাঘুরি করেছি বেশ। হোটেলের দু’দিকে অবস্থিত ‘জিলিন’ এবং ‘নর্থইস্ট নরম্যাল’ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে মিটিং করেছি তিনদিন। এক দিন ডিনার শেষে রাত ১১টায় রেস্তোরাঁ থেকে ফেরার সময় ট্যাক্সিচালক পথ হারিয়ে বাহান্ন রাস্তা তিপ্পান্ন গলি ঘুরে আধা ঘন্টার জায়গায় এক ঘন্টায় হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিল। এতে সময় লাগলেও চ্যাংচুন সিটিসেন্টারসহ রাতের আলো ঝলমল নগরীর রূপ দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। শুনে অবাক হবেন, দীর্ঘ সময় ধরে ৬০/৭০ কিঃ মিঃ পথ ঘোরার পর ট্যাক্সির মিটারে বিল ওঠেনি আট ডলারও!

যে ক’দিন সেখানে ছিলাম তার একদিন বাদে বাকি সব দিনই কোনো না কোনো কাজে রেরিয়েছি। যে-দিন হোটেলে কাটালাম সেদিনের অভিজ্ঞতাও কিন্তু কম নয়! স্মরণে থাকলে এ কথায়ও ফিরে আসব শেষে। অল্পদিন থাকলেও আমন্ত্রয়িতাদের সহৃদয়তার কারণে যেতে পেরেছি বিভিন্ন জায়গায়। দেখেছি অনেক কিছু। জানাশোনা হয়েছে বেশ ক’জনের সাথে। চার দিনে পাঁচটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে লাঞ্চ-ডিনার খেয়েছি। খেতে খেতে সে দেশের বিজ্ঞজনদের সাথে আড্ডাও হয়েছে বিস্তর। তাই বলে কি বলতে পারি, আমি চ্যাংচুন দেখেছি, চীনা মানুষদের জেনেছি, চিনে ফেলেছি চীনকে? না, মোটেও না। এত বড় দেশ, এত পুরনো সভ্যতা, অসংখ্য মানুষ – পর্যটক হিসেবে জীবনভর দেখলেও তো এ দেখা শেষ হবার নয়,তবে আমার এই সফরকে ঘিরে চীন, চীনের ইতিহাস, সমাজ, জীবন ও জীবনযাত্রা সম্বন্ধে সামান্য যেটুকু ধারণা পেয়েছি অনেক দিন পর তা নিয়েই আজ হাজির হয়েছি আপনাদের সামনে।

দু’হাজার সতেরো সালের ২১শে জুন স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে দশটার দিকে অবতরণের জন্য আমাদের বিমান যখন চ্যাংচুন-এর আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, বস্তুতপক্ষে তখন থেকেই আমার চীন দর্শন শুরু হয়ে গেছে। আমি চ্যাংচুন-এর মাটিতে পা রাখার আগেই শহরটাকে দেখতে চেয়েছিলাম, আর তাই ইচ্ছে করেআমার যাত্রাপথের শেষ উড্ডয়নে (ষধংঃ ষবম) জানালার পাশের আসনটি চেয়ে নিয়েছিলাম। ভূপৃষ্ঠ দৃষ্টিসীমার ভেতরে আসতে না আসতে যা দেখেছিলাম তা অনেকটা ঢাকা শহরের সাথে তুলনীয়।চারদিকে আলবাঁধা ছোট ছোট ধানক্ষেত, এলোমেলো ঘন সবুজ গাছের মেলা, নিচু জলা জমি, জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে – যেমনটা বর্ষাকালে দেখা যায় ঢাকার আকাশ থেকে। চীনের লোকসংখ্যা অনেক হলেও দেশটা বিশাল বড়, জনবসতি বাংলাদেশের মতন এত ঘন নয়। দূরে দূরে কৃষকদের বাড়ি, দু’চালা ছোট ছোট ঘর – কোনোটার রূপালী ঢেউটিনের ছাদে সূর্যের আলো পড়ে চোখ ঝলসে দিচ্ছে, কোনোটায় লাল খাপরার ছাউনি, পাকা দালানও আছে কিছু কিছু, তবেমাটি, খড় ও বাঁশ-বেতের তৈরি কোনো বস্তি আমার নজরে পড়েনি। বিমান আরো নীচে নেমে এলে রাস্তার ধারে, মাঠে, ঝোপঝাড়ে মানুষজনকে কাজ করতে দেখেছি।

এক দিকে দু’চোখ ভরে যখন দেখছি চীন, চীনের প্রকৃতি ও পরিবেশ, চীনা মানুষদের বসতবাটি ও তাদের জীবনযাত্রা,অন্য দিকে বুঝতে পারছি উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনায় মন উদ্বেলিত হয়ে উঠছে, শরীরে শিহরণ লাগছে, বার বার গা কাঁটা দিয়ে উঠছে, কারণআমার অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি চীনের মাটি স্পর্শ করব! বা! কী আনন্দ! কী অদ্ভূত, কী মজার অনুভূতি! আমার চোখের দৃষ্টি এবং মনের গতিপ্রকৃতির মধ্যেও এক ধরনের টানাটানি অনুভব করলাম। চোখ দেখছে বর্তমান চীনকে, কিন্তু অন্তর বার বার চলে যেতে চাইছে শৈশবে, কৈশোরে। একে একে মনে পড়তে লাগলো, ছোটবেলায় শোনা মহাপ্রাচীরের কথা, কনফুসিয়াসের কথা, অ্যাবাকাস, কাগজ ও বারুদের কথা, আফিম যুদ্ধ, চীন-জাপান ও চীন-ভারত যুদ্ধের কথা। আরো মনে পড়লোকমিউনিস্ট বিপ্লবের কথা, মাও সে তুং-এর ‘সাংস্কৃতিক পরিসুদ্ধি’, ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ এবং কৌমিনট্যাংদের সাথে কমিউনিস্টদের গৃহযুদ্ধের কথা। ‘জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও’, বুঝলাম, এ কথাও মনে আসছে, কিন্তু আমি কোনো ডিগ্রি হাসিল করতে যাইনি সে দেশে।গিয়েছি অল্প দিনের জন্য সামান্য কাজে, আরো গিয়েছি একটি অজানা দেশ দেখতে, কৌতূহল মেটাতে, দীর্ঘ দিন ধরে মনের কোণে লালিত বাসনা পূরণ করতে।

রানওয়েতে নামার পর বিমান যখন টার্মিন্যালের দিকে ট্যাক্সি করছে তখন দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির কাতারবন্দি উড়োজাহাজ দেখে একটি পুরনো কথা মনে পড়ে গেলো। ঊনিশ শ’ ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক রুটে উড়ার মতন চীনের কোনো বিমানসংস্থা ছিল না। তারা বিদেশযাত্রায় প্রধানত তাদের বন্ধুরাষ্ট্রের পতাকাবাহী পিআইএ-কেই ব্যবহার করত। আর আজ একটি নয়, দু’টি নয়, চীনের বড় বড় প্রায় ডজনখানেক এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুটে বিরামহীন গতিতে উড়ছে ও যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – এয়ার চায়না, চায়না এয়ারলাইন্স, চায়না সাদার্ন, চায়না ইস্টার্ন, হাইনান এয়ারলাইন্স, সাংহাই এয়ারলাইন্স, শ্যাংডং এয়ারলাইন্স, শেনজেন এয়ারলাইন্স, জিয়ামেন এয়ারলাইন্স, সিচুয়ান এয়ারলাইন্স, বেইজিং ক্যাপিট্যাল, ইত্যাদি। এখানে একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। যে ক’টা এয়ারলাইন্সের কথা বললাম এদের কয়েকটির উপস্থিতি চ্যাংচুনে দেখেছি, বাকিগুলোর কথা জেনেছি ইন্টারনেটসূত্রে। এদের সবার বহরে প্রচুর সংখ্যক ওয়াইড বডি বোয়িং ৭৭৭ আছে। এ-সব যে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক তরক্কির একটি প্রাথমিক আলামত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম চৈনিক অগ্রগতি শুধু ‘কোয়ান্টিটি’ নয় ‘কোয়ালিটি’কেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। যেমন টার্মিন্যালভবন দেখলাম বেশ সুন্দর ও সুনির্মিত। পাশেই আরেকটি বিশাল টার্মিন্যাল তৈরি হচ্ছে। বিমান থেকে বেরিয়ে যে পথে হাঁটছি তার যতদূর দেখা যায় সবই পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন।হলওয়েগুলোকে অত্যন্ত রুচিসম্মতভাবে নান্দনিকতার সাথে সাজানো হয়েছে। এ কাজে তারা অন্ধ অনুকরণের আশ্রয় নেয়নি। সবকিছু করেছে তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও নিসর্গের সাথে মিল রেখে। আরেকটু অগ্রসর হওয়ার পর বুঝলাম, যাত্রীসেবায়ও চীনাদের দক্ষতা ও আন্তরিকতা অতুলনীয়! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মাত্র পাঁচ মিনিটে, ইমিগ্রেশন এবং কাস্টম্স সেরে ক্যারুজেল থেকে বাক্স তুলেআমি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। এ পর্যন্ত আমি অনেক দেশে গিয়েছি, অনেক এয়ারপোর্টের পুলসেরাত পার হয়েছি,চ্যাংচুনের মতন একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার মাত্র আরেকবার, ২০০৯ সালে, সিঙ্গাপুরে,কিন্তু সেটা ছিল গভীর রাতে, ভোর একটা কি দু’টার দিকে আর চ্যাংচুনের ঘটনা ঘটেছেদিনের বেলা, ব্যস্ত সকাল ১১টায়।

চীনের মানুষ একটি মামুলি কাজও যে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব এবং যতেœর সাথে করে, এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার আগেই তা টের পেয়েছিলাম। গাড়ি নিয়ে আমাকে নিতে এসেছিল‘নর্থইস্ট নরম্যাল ইউরিভার্সিটি’-র ছাত্র ‘চেইন’। বাড়ি থেকে রওয়ানা দেওয়ার আগে তাকে আমার একটি ছবি পাঠিয়েছিলাম যাতে সে আমাকে এয়ারপোর্টে হাজারো মানুষের ভীড়ে সহজে চিনতে পারে এবং আরো বলেছিলাম, এক পিস কাগজে যেন মার্কার দিয়ে আমার নাম লিখে কাগজখানা বাহির হওয়া যাত্রীদের দিকে তুলে ধরে, যাতে আমি বুঝতে পারি কে আমাকে নিতে এসেছে। আগমনী এলাকাতে বের হয়েই ‘চেইন’-কে চিনতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি এবং তাকে দেখে আমি অভিভূত না হয়েও পারিনি! দেখি, এক পিস সাদামাটা কাগজের বদলে সে চার-পাঁচ ফুট লম্বা একটি অ্যালুমিনামের খাম্বায় আনুমানিক ৪’ী৩’ একটি হার্ডবোর্ডের ওপর ল্যামিনেটেড কাগজে ছাপার হরফে বড় বড় করে আমার নামের প্ল্যাকার্ড ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সহাস্যবদনে দাঁড়িয়ে আছে! ‘চেইন’ যে কাজ দু’মিনিটে করতে পারত, সেটা সে কতক্ষণে করেছে বা কোথা থেকে করিয়েছে, আল্লাহ্ মা’লুম!

গাড়িতে ওঠার পর জানতে পারলাম চ্যাংচুন বিমানবন্দর শহর থেকে বাইরে, বেশ খানিকটা দূরে, অন্তত ৬০/৭০ কিঃ মিঃ তো হবেই, হোটেলে যেতে ঘন্টাখানেক সময় লাগবে। ভালোভাবে রাস্তার দু’দিক দেখার জন্য আমি সামনে প্যাসেঞ্জার সিটে বসলাম, আমার পাশে গাড়ির চালক, পেছনে বসেছে ‘চেইন’। পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে ইতিমধ্যে গাড়ি গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে, আমি সামনে ও ডানে-বাঁয়ে দেখছি আর ‘চেইন’-এর সাথে একথা সেকথা নানান কথা বলেই চলেছি। দেখলাম, ‘চেইন’ বেশ স্বচ্ছন্দে আমার সাথে ইংরেজি বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছে।

একটি আধুনিক বড় শহরের এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবার রাস্তা যেমন থাকার কথা চ্যাংচুনের বেলা তার কোনো ব্যতিক্রম মনে হলো না। চার (ছ’-লেনও হতে পারে, সঠিক মনে নেই) লেনের চওড়া সড়ক। উত্তর আমেরিকার মতইগাড়ি চলছে রাস্তার ডান দিকধরে। দু’পাশে সুন্দর করে সারিবদ্ধভাবে প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। জায়গায় জায়গায় ফুলের বাগানও আছে। এ পর্যন্ত যে বিষয়টি আমার নজর কাড়লো তা হলো ফুলবাগানে সুগন্ধের চাইতে রঙের প্রাধান্যই বেশি।আরো লক্ষ করলাম, ফুলের বেডে চারা লাগানোর সময় শৈল্পিক নান্দনিকতার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। এ কাজটি তারা করেছে যেমন রাস্তাঘাটে তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও। এত জায়গায় গেলাম, এত বাগান দেখলাম, কোথাও ফুলের রাজা গোলাপ নজরে পড়লো না। এর কি কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে? হতে পারে, যা দেখতে সুন্দর, আকারে বড়, কাজে উপযোগী, চীনা সমাজে তারই মর্যাদা বেশি। গোলাপ সুগন্ধ বিলায় বটে, কিন্তু গন্ধ তো আর চোখে দেখা যায় না, তাই চীনাদের কাছে গোলাপের চেয়ে উজ্জ্বল ও কড়া রঙের রঙিন ফুলের মূল্য বেশি। আমার এ ব্যাখ্যা নিতান্তই অনুমাননির্ভর, সঠিক হতে পারে, নাও পারে।

এ ক’দিনে চ্যাংচুনে আর কী কী দেখলাম তার ওপর এখন আপনাদের একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব। শহরের সবদিকেই বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে উঁচু উঁচু দালানের গুচ্ছ। একেক গুচ্ছে আছে আনুমানিক ৫০/৬০টি দালান; গুচ্ছ বড় হলে শতাধিক দালানও থাকতে পারে। দূর থেকে দেখতে প্রতিটি ইমারত প্রায় একই রকমের। উচ্চতায় কোনোটাই ৪০/৫০ তালার কম নয়। ‘চেইন’-কে বললাম এত সব দালানে কারা থাকে? যারা থাকে, তারা কী করে? সে জানালো, ‘বাণিজ্যিক এলাকায় বেশিরভাগ অফিস হচ্ছে রিয়েল ইস্টেট ডেভোলাপারের। আবাসিক এলাকায় মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্তরা থাকে, তবে মজার ব্যাপার হলো, কি বাণিজ্যিক কি আবাসিক, প্রায় প্রতিটি স্থাপনার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ স্পেস শুরু থেকেই খালি পড়ে আছে। ভাড়াও হয়নি, বিক্রিও হয়নি। বছরের পর বছর এভাবেই আছে’। ঠিক একই অবস্থা দেখেছি দুবাইতেও। এত বিরাট অঙ্কের পুঁজি খাটিয়ে মুনাফা ছাড়া বিনোয়োগকারিরা কিভাবে ব্যবসায় টিকে আছে, সে কথা আমার মাথায় আসেনি। অবশ্য এসব দালানকোঠার কতটি ব্যক্তি খাতে আর কতটি সরকারি উদ্যোগে তৈরি হয়েছে সে ব্যাপারে ‘চেইন’ তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেনি, আমিও আর খুঁজে দেখিনি।

যে কেউ ভাবতে পারেন, সরকারি উদ্যোগে যে সব বিল্ডিং তৈরি হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিতে সেগুলোই হয়তো বা খালি পড়ে আছে। কথাটা যে সেভাবে ঠিক নয়, হোটেলে এসেই হাতেনাতে তার প্রমাণও পেলাম। চ্যাংচুনে আমার এবারকার থাকার জায়গা ৩৫০ রুমের একটি মাঝারি শেরাটন হোটেল। তৈরি হয়েছে ৮ বছর আগে। হোটেল মালিক একই সময়ে হোটেলের পেছনে কৃত্রিম হৃদের ওপারে বড় বড় প্রায় ৩০টি ম্যানশন বানিয়েছেন। প্রতিটি তিনতালা বাড়ি, আমার আন্দাজ, কোনোটাই ৫ হাজার স্কয়ার ফুটের কম হবে না। বাড়িগুলো শুরু থেকেই খালি পড়ে আছে। হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওগুলো খালি পড়ে আছে কেন? এখানে একটা বাড়ির দাম কত? তিনি উত্তর দিলেন, ‘এই সাবডিভিশনের মালিক, ‘ক্লাব হাউস’ হিসেবে দু’-একটা বাড়ি নিজে ব্যবহার করে থাকেন, বাকিগুলো কেন খালি পড়ে আছে, তিনিই কেবল বলতে পারবেন। আর দাম? বাড়িগুলোর কোনো দাম নেই, কারণ এগুলো কখনো বিক্রির জন্য বাজারে আসেইনি’।

চ্যাংচুনের অবকাঠামো ও তার উন্নয়নের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তার রাস্তাঘাট। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অনেক রাস্তা দিয়ে আমি গাড়িতে চলাচল করেছি। তার মধ্যে সবগুলোই নতুন, চওড়া এবং বলতে গেলে নাক বরাবর সোজা। বেশিরভার রাস্তায় মাঝখান বরাবর আছে ডিভাইডার আয়ল্যান্ড, কোনো কোনো জায়গায় উভয় পাশে আরো দু’টো আয়ল্যান্ড আছে। চ্যাংচুনের তাবৎ সড়ক বানানো হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। বেশিরভাগ রাস্তা চার লেন এবং ছ’লেনের। ছ’লেনের সড়কের দু’পাশে পার্কি-এর জন্য আছে আরো দুই লেন। এভাবে আট লেনের রাস্তাগুলো দশ লেনের। চার লেনেরও সড়ক আছে অনেক, তবে সারা শহরে আমি কোথাও দু’লেনের কোনো রাস্তা দেখিনি।

চ্যাংচুনের রাস্তাঘাটের আরেকটু বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। আমার হোটেল যে এলাকায় এটাকে ঠিক আবাসিক এলাকাও বলা যায় না আবার বাণিজ্যিকও বলা যায় না। আশপাশে কোনো দোকানপাট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, ইত্যাদি কিছুই নেই। উল্টোদিকে একটি বিশাল আর্ট গ্যালারি, একটু দূরে বাঁ দিকে বাচ্চাদের জন্য অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। পেছন দিকে ১০ কিঃ মিঃ গেলে উইনভার্সিটি এবং উঁচু উঁচু দালান – হয়তো বা ভাড়ার জন্য অফিসঘর নয়তো বা কন্ডোমোনিয়াম। চেকইন করার পর, হোটেলের সামনে রাস্তায় গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে এলাকাটা সম্বন্ধে একটু ধারণা করতে গিয়ে দেখলাম, দিন দুপুরে রাস্তার ফুটপাথে মানুষজনের চলাচল নেই বললেই চলে। রাস্তায় ট্র্যাফিকও একেবারে হালকা।পার্কিং লেনসহ রাস্তাটি আট লেনের, ভীষণ চওড়া। শুধু তাই নয়, রাস্তার দু’পাশে প্রায় ১০/১২ ফুট বিস্তৃত পাকা ফুটপাথ। ফুটপাথে আবার দু’টো বড় বড় স্ট্রাইপ। একটি ব্রাউন ¯্রাইপ – সাধারণ পথচারীদের জন্য, অন্যটি সাদা – সাদা দ- হাতে নিয়ে অন্ধ মানুষদের হাঁটার পথ। ফুটপাথে অন্ধ তো দূরে থাক আমি হাঁটতে তেমন কোনো মানুষই দেখিনি। ফুটপাথের বাইরে রাস্তার দু’পাশে আরো আছে প্রায় ২০ ফুট খালি জায়গা, যেখানে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে নানান জাতের অসংখ্য গাছগাছালি এবং রঙ রেঙের বাহারী ফুলের বাগান। ফুটপাথের নীচ দিয়ে গেছে পানি নিষ্কাষণের জন্য অত্যাধুনিক নর্দমা ব্যবস্থা, পানির লাইন, গ্যাস পাইপ লাইন, ফাইব্র অপটিক ক্যাব্ল, মাথার ওপর দিয়ে টানা হয়েছে বিদ্যুতের তার।

এতসব দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি! ভেবেছি, রাস্তায় গাড়ি নেই, ফুটপাথে মানুষ নেই, তবুও এতসব কেন? এত বিশাল আয়োজন কেন? কার জন্য? পরে নিজেই উত্তর বের করলাম। আজই ব্যবহারের জন্য চীন এসব বানায়নি। তারা আগামী পঞ্চাশ থেকে এক শ’ বছরের চাহিদা বিবেচনা করে উপযুক্ত অবকাঠামো এখনই তৈরি করে বসে আছে। আমার জানা মতে উন্নয়নের ইতিহাসে কোনো দেশ, কোনো সমাজ এমন কর্মযজ্ঞ ও তার বিশালতা প্রত্যক্ষ করেনি। ইউরোপ-আমেরিকায় অবকাঠামো হয়েছে ক্রমে ক্রমে। যেখানে যখন যা প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তা-ই তৈরি করা হয়েছে। চীন ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে ৫০/১০০ বছর পূর্বে একসঙ্গে সব আগাম তৈরি করে রেখেছে। এটা সম্ভব হয়েছে দুই কারণে। প্রথমত, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থেকে তাদের হাতে জমা আছে লক্ষকোটি ডলার; দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো তৈরির ব্যাপারে চীনে রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন যে সিদ্ধান্ত হয়, তা-ই চূড়ান্ত। প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সরকারকে আদালতে গিয়ে ব্যক্তি মালিকদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা লড়তে হয় না।

শুধু মোটর চলাচলের রাস্তাই নয়। চ্যাংচুনে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য বাস ছাড়াও তিন ধরনের ট্রেন চলে। একটিকে বলে খরমযঃ জধরষ। এটা মাটির ওপরে শহরের বড় বড় রাস্তা দিয়ে চলে যাকে ইউরোপ-আমেরিকায় ঝঃৎববঃ ঈধৎ বলা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়টিকে হলোঐরময ঝঢ়ববফ জধরষ। এটা চড়ে ঘন্টায় ৩০০ কিঃ মিঃ বেগে লোকজন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াত করে। সকালে যায়, বিকেলে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসে। তৃতীয়টি হলো, টহফবৎমৎড়ঁহফ ঝঁনধিু ঝুংঃবস, যেটা আছে পৃথিবীর সব বড় বড় শহরে। এটা মাত্র চালু হয়েছে চ্যাংচুনে, আমি ফিরে আসার পরদিন।

রাস্তা ছাড়া অন্যান্য অবকাঠামোতেও চ্যাংচুন পিছিয়ে নেই। চ্যাংচুনের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশাল বিশাল সরকারি স্থাপনা। এদের মাঝে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাস, স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, স্টেডিয়াম, যাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, থিম পার্ক, প্রদর্শনীর জন্য এক্সপো পার্ক, হাসপাতাল, কনভেনশন সেন্টার, শপিং মল, প্রাকৃতিক পার্ক, পাবলিক লাইব্রেরি, ফুলের বাগান, কৃত্রিম হৃদ, বনায়ন এবং আরো অনেক কিছু। সব কিছু নতুন ঝকঝকে তকতকে। নর্থইস্ট নরম্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. লি-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এগুলো সব কবে হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, এ সবই হয়েছে মাত্র গত ১০/১২ বছরের মধ্যে।

জিলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকতা ড. অ্যামি-কে বলেছিলমা। এ-সব তো দেখলাম তোমাদের নতুন শহর, আমাকে একটু পুরান শহরটা দেখাও না। তার জবাব শুনে আমি হতবাক না হয়ে পারিনি! সে বলল, এখানে পুরান যা ছিল সেগুলো সব ভেঙ্গেচুরে তারা মিসমার করে ফেলেছে। পুরানের ধ্বংসের ওপরই তারা এই নতুন শহর গড়ে তুলেছে। এটা সম্ভব হয়েছে কমিউনিস্ট সমাজ কাঠামো বলে। এটা কোনো পুঁজিবাদী দেশ হলে সরকারের সাথে ব্যক্তি মালিকদের আদালতে মামলা লড়তে লড়তেই চলে যেত ১০/১২ বছর এবং এই সময়ে এই উন্নয়ন সম্ভব হত না।

চীন সম্মন্ধে অনেকগুলো ইতিবাচক কথা বলার পর এবার দু’একটি নেতিবাচক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করব। কোনো দেশে গিয়ে যদি আমি সে দেশের পাবলিক প্লেসে অর্থাৎ – বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, এয়ারপোর্ট, স্টেডিয়াম, পার্ক, সরকারি অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাস ইত্যাদিতে সহজে ও স্বচ্ছন্দে বাথরুম ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে আমি সে দেশকে সভ্য বলতে নারাজ, সে যত শক্তিশালী ও বিত্তবানই হোক না কেন। নিজ দেশের কথা বাদ দিলে অনেক দেশ ঘুরে এ পর্যন্ত আমি এমন বিপাকে পড়েছিলাম চারটি দেশে – গ্রীসে ২০০৩ সালে, সউদি আরবে ২০০৬ সালে (হজ্জ্বের সময়), মালোয়েশিয়ায় ২০০৮ সালে এবং চীনে ২০১৭তে। এখানে চীনের ব্যাপারটা আরেকটু ব্যাখ্যা করা দরকার আছে বলে মনে করি। চ্যাংচুনে আমি এবার দুটো ক্যাম্পাসে গিয়েছি – ‘জিলিন’ এবং ‘নর্থইস্ট নরম্যাল’ বিশ্ববিদ্যালয়। উভয় জায়গাতে বাথরুম ব্যবহার করা আমার পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক মনে হয়েছে। এর কারণ এই নয় যে, ইংলিশ কমোডসহ আধুনিক ফ্ল্যাশ টয়লেট চীনারা বানাতে পারে না। তাদের হাতে সেগুলো বানাবার মত অর্থ আছে, প্রযুক্তিও আছে, কিন্তুবলতেই হয় তাদের মানুষরা এখনো পিছিয়েপড়া। তাদের হাইজিনসংস্কৃতি এখনো অনেক নিম্মামানেরই রয়ে গেছে। তারা ফ্ল্যাশটয়লেট ব্যবহার করতে জানে না, করতে চায় না। একটি কথা আছে, ‘টাকাপয়সা এক জেনারেশনে হয়, কিন্তু আচারআচরণে পরিসুদ্ধি ও উন্নত সংস্কৃতি রপ্ত করতে দু’-তিন জেনারেশন পর্যন্ত লাগতে পারে’। সুতরাং পশ্চিমা দেশের জীবনমান আয়ত্ত করতে চীনাদের এখনো দিল্লি দূরস্ত!

চীনদেশে সেল ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে আমি আরেকটি বিষয় অনুধাবন করলাম। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাথে চীনের একটি খিটিমিটি সম্পর্ক থাকলেও উভয় পক্ষ সতর্কতার সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে চলছে। আমেরিকার সাথেও চীনের ব্যবসায়িক এবং কূটনৈতিক টানাপড়েন লেগেই আছে, তাই বলে এ দু’দেশের মাঝে সম্মুখ সমরের কোনো সম্ভাবনা নেই। তথাপি ভারত-আমেরিকার সাথে মাঝে মাঝে চীনের যুদ্ধ যুদ্ধ বাগাড়ম্বর চলে এবং এটা যে কথার কথা সেটাও সবাই বুঝে। তবে চীন সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে চালিয়ে যাচ্ছে অন্য মেজাজের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে, জানেন? এ যুদ্ধে ‘ফেসবুক’, ’গুগ্ল’, ‘ইউটিউব’ হচ্ছে চীনের প্রতিপক্ষ। আমি একবার হাসতে হাসতে ‘চেইন’কে বলেছিলাম, সব যুদ্ধে জিততে পারলেও এ যুদ্ধে তোমরা জিততে পারবে না, কারণ পশ্চিমা কোম্পানিগুলো যে ব্যবসা করে সেটাও এক কিসিমের যুদ্ধ, এ যুদ্ধে তাদের হারানো বড় মুশকিল। তারা শুধু যুদ্ধে জিতে না, অনেক সময় যুদ্ধ শুরুর আগেই কেল্লাফতে করে ফেলে। এখানে একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি খোলাসা হয়ে যাবে। ঊনিশ শ’ নিরানব্বই সালে কাশ্মীর সীমান্তে কার্গিল ক্রাইসিসের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। এক পর্যায়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এমন এক স্তরে উঠেছিল যে, উভয় দিকে পাঁচ পাঁচ করে দশ লাখ সৈন্য চোখা-চোখি (ঊুবনধষষ ঃড় ঊুবনধষষ) দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাচপাই প্রত্যক্ষ পাকিস্তান আক্রমণের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন। বিষয়টি জানাজানির পর, ‘মাইক্রোসফ্ট’-এর বিল গেট্স এবং ‘ওরাক্ল’-এর ল্যারি অ্যালিসন বাচপাই-কে ফোন করে বলেছিলেন, যুদ্ধ শুরু হলেই তাঁরা তাঁদের ব্যাক অফিসগুলো ভারত থেকে সরিয়ে ফিলিপিনে নিয়ে যাবেন। ব্যাস, এতেই কাফি! বিল গেট্স এবং ল্যারি অ্যালিসন-এর সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক তাৎপর্য এবং গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত তাৎক্ষণিক যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসে। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেলো। আগেকার দিনে দুনিয়ার তাবৎ বড় বড় ঘটনা-দুর্ঘটনার গতিপ্রকৃতি নির্ধারীত হত রাজাবাদশাহ্দের খামখেয়ালির ওপর। বর্তমানে সেই অর্থে কোথাও রাজাবাদশা নেই, দেশে দেশে আছে হয় গণতান্ত্রিক নয় তো অগণতান্ত্রিক সরকার। হলে কি হবে, আজকাল যুগান্তকারি সিদ্ধান্তগুলো রাষ্ট্রীয় সরকার একা নিতে পারে না। এখানে বড় বড় কর্পোরেশনেরও একটি কার্যকর ভূমিকা থাকে। এরও অনেক জটিল ও দুর্বোধ্য হিসাবনিকাশ আছে, সেদিকে আজ আর যাচ্ছি না।

আরেকটি বিষয়, ছাত্র-শিক্ষক নির্বিশেষে যাদের সাথেই কথা বলেছি, সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছে যে, চীন সরকারের ‘এক সন্তান’ নীতি বাতিল করতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে! তারা মনে করে, ওই ভ্রান্ত নীতির কারণে আগামীতে শ্রমিক স্বল্পতা দেখা দিবে, জনসংখ্যায় লিঙ্গ ভারসাম্য ফিরে আসতেও অনেক সময় লাগবে। তাদের মতে ওই নীতির কারণে চীন নিঃসন্দেহে ৩০ বছর পিছিয়ে গেছে।

চ্যাংচুনে ক’দিন চলতে ফিরতে ‘চেইন’-এর সাথে কথা বলতে বলতে যা শিখলাম তার একটি সংক্ষিপ্ত বয়ান এভাবে দেওয়া যায়। গাড়িতে একদিন ‘চেইন’ স্বপ্রণোদিত হয়ে বলল, চীনের অন্যত্র দেখা গেলেও চ্যাংচুনে জাপানি গাড়ি খুব একটা চোখে পড়বে না। এ বিষয়ে সে একটি স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যারও অবতারণা করল। জাপানিরা এখন অত্যন্ত ভদ্র, শান্তশিষ্টও ধৈর্যশীল জাতি হলেও তারা এক সময় খুব দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিল। গেল শতাদ্বীর তিরিশের দশকের গোড়ার দিকে ‘জিলিন’সহ চীনের দক্ষিণপূর্বাংশ জাপানিরা দখল করে নেয়। তাদের সেই দখলদারি বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অবধি। তখন ওই অঞ্চলের মানুষদের ওপর নেমে এসেছিল অমানবিক অত্যাচার ও নির্যাতনের খড়গ যার তুলনা চলে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ এবং বর্তমানের কাশ্মীর পরিস্থিতির সঙ্গে। আমি বিস্তারীত ইতিহাস জানি না, জানার চেষ্টাও করিনি, তবে পরবর্তী পর্যায়ে চীনারা তাদের দেশ থেকে জাপানিদের হটাতে পারলেও দূর হয়নি উত্তর-পূর্ব চীনাদের জাপানভীতি ও জাপানবিদ্বেষ। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চ্যাংচুনের মানুষ জাপানি গাড়ি কিনে না – সেগুলো যত ভালোই আর যত সস্তাই হোক না কেন। চ্যাংচুনে সবচেয়ে জনপ্রিয় গাড়ি হলো জার্মানীর ‘ভক্স ওয়াগন’।

‘চেইন’-এর সাথে কথা বলতে বলতে চীনা ভাষা সম্বন্ধে একটি নতুন তথ্য জানতে পারলাম। সে বলল, ‘চীনা, জাপানিজ, ম্যান্ডরিন, ক্যান্টনিজ ও তাইওয়ানিজ ভাষা – মূলত সবই এক। এ সবক’টি ভাষায় আছে অভিন্ন ক্যার‌্যাক্টার ও অভিন্ন তাদের অর্থ। শুধু উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে একেকটি ভাষা একেক রকম হয়ে গেলো’। ভাষা বিষয়ে তার কাছে আরেকটি আজব কথা শুনলাম! চীনা প্রাইমারি স্কুলে বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে খুব একটা উৎসাহীত করা হয় না এবং সেখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইংরেজি শেখার তেমন সুযোগও নেই। কিছু কিছু বিত্তবান পরিবারের মা-বাবারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখাবার জন্য সন্তানের জন্মের আগে থেকেই একটি অভিনব পন্থা অনুসরণ করে থাকে। সন্তান মার পেটে আসার পরই মা ইংরেজি গল্প-কবিতার সিডি দিন-রাত পেটের সাথে বেঁধে রেখেবাজায়, যাতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে থেকেই ইংরেজিশুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এতে নাকি বড় হলে বাচ্চারা সহজে ও ভালোভাবে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করতে পারে। সে আরো বলল, পরবর্তী প্রজন্মকে ইংরেজি শেখাবার জন্য চীনদেশে এই রীতি নাকি ব্যাপকভাবে চালু আছে। পদ্ধতিটি যে ফলপ্রসু এবং কার্যকর, বিভিন্ন গবেষণায় তার প্রামণ পাওয়া যায়।

প্রথম দিন এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে আসার সময় প্রায় মাঝপথে হঠাৎ আমার নজর পড়লো গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা একটি ঝলমলে কাচের বস্তুর ওপর। আমি ‘চেইন’-এর কাছে জানতে চাইলাম, ওটা কি? সে বলল, ‘এটা ‘বুড্ডা’,আমরা চীনারা ‘গড’ মানি না, কোনো ধর্ম বিশ্বাস করি না,তবে যখন বাইরে বের হই, পথের অনিশ্চয়তা ও বিপদ-আপদ কাটিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য ‘বুড্ডা’র ওপর আস্থা রাখি’। সে আরো বলল, ‘‘বুড্ডা’ একক ও একমাত্রিক নন। তাঁর চরিত্রের একাধিক বৈশিষ্ট্য আছে, একাধিক রূপ আছে তাঁর এবংতিনি বহুমাত্রিক। তিনি আমাদের নিরাপত্তা দেন, শান্তি দেন, সামর্থ্য দেন’, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি মনে মনে ভাবলাম, চীনারা মুখে বলে তারা ধর্ম মানে না, কিন্তু এই না মানাটাও তো একটা ‘ধর্ম’। তারা বলে ‘গড’ মানে না, কিন্তু ‘বুড্ডা’কে যে তারা ‘গড’ মানে, তা তো প্রকারান্তরে প্রকাশই করছে। এ ছাড়া, ‘বুড্ডা’ ছাড়াও তাদের আরো ‘গড’ আছে, কিন্তু কে সেই ‘গড’ সেটা তারা নিজেরা জানে কিনা সেটা আমার জানা নেই। কেন বলছি, এবার শুনুন, এ নিয়ে ‘চেইন’-এর সাথে আমার কি কথা হয়েছে। ফিরে আসার দিন অথবা তার আগের দিন আমি ‘চেইন’-কে বললাম, তুমি আমার জন্য যা করেছ তা অতুলনীয়, অভাবনীয়! তুমি যদি কোনো দিন মনে কর আমি কোনোভাবে তোমার কোনো কাজে লাগতে পারি তবে নির্দ্বিধায় আমার সাথে যোগাযোগ করবে, আমি সাধ্যমত তোমাকে সাহায্য করব। যদি তুমি বিদেশে পড়তে যেতে চাও, আমাকে জানাবে, আমি তোমার জন্য সুপারিস করব। এ কথা শুনামাত্র ‘চেইন’ ভীষণ খুশি হলো এবং উচ্ছ্বাসের সাথে জোরসে বলে উঠলো, ‘ওহ! মাই ‘গড’, তুমি আমার জন্য এতখানি করবে!’আমি বললাম, হ্যাঁ,অবশ্যই করব, তবে তুমি যে সেদিন বললে, ‘গড’ বিশ্বাস কর না’, তো এখন এই কোন ‘গড’-এর কথা বললে? চেইন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো! আমি তাকে বিব্রত হতে না দিয়ে তড়িৎ প্রসঙ্গ পাল্টালাম।

আমি চীনা মানুষের চরিত্র সম্বন্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলাম ‘চেইন’-এর কাছে। তার কথা অনুযায়ী, বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস অথবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন সরকারি রিলিফসামগ্রী আসে তখন দুর্গত চীনা নারীপুরুষ, বন্টনকারির চারদিকে গোল হয়ে বৃত্তাকারে ঘিরে ধরে এবং আমাকে দাও, আমাকে দাও, বলে সবাই একসাথে হাত বাড়ায়,অথচ জাপানিরা এরকম অবস্থায় সাথে সাথে সোজা লাইন ধরে ফেলে এবং একজন একজন করে আসে। ‘চেইন’ আরো বলল,‘এ ব্যাপারে কোরিয়ানরাও জাপানিদের মত’। আমি বললাম, আমরা, বাংলাদেশিরাকিন্তু তোমাদেরই মতন।

‘চেইন’ তার দেশের বর্তমান সাফল্যকে নিয়ে গর্ব করে। শুধু তাই নয়, সে তার নিকট অতীতও জানে এবং তাকে ভুলেনি। সে আমাকে বলল, ‘আজ আমরা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আগামীতে বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার হতে চলেছি। মাত্র কয় পুরুষ আগেই আমরা কত দুর্বল ছিলাম! কত গরিব ছিলাম! ভাবতে গেলেই গা শিউরে ওঠে! ব্রিটিশরা জাহাজ ভর্তি করে আফিম নিয়ে আসত চীনের উপকূলে। বিনিময়ে মসলা, চা, এবং সিল্ক নিয়ে যেত। একবার আমাদের রাজা আফিমের জাহাজ ফিরিয়ে দিতে চাইলো। ব্রিটিশরা রাজি হলো না। তারা গায়ের জোরে আমাদের কাছে আফিম গছিয়ে দিতে চাইলো। যার ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হলো। এভাবে তারা একাধিকবার আমাদের ওপর ‘আফিম-যুদ্ধ’ চাপিয়ে দিয়েছে’। ‘চেইন’ আরো বলল, ‘আমরা শুধু শক্তিহীন নয়, গরিবও ছিলাম, তুমি জানলে অবাক হবে। আমার দাদীর কাছে শুনেছি, তাঁরা যখন বড় হয়েছেন তখন ৩৬৫ দিনের মাঝে মাত্র একদিন ভাতের সাথে গোশ্ত খেতে পেতেন’। আমাদের কোরবানির ঈদের মতন তাদের ‘বসন্ত উৎসব’-এর দিনই কেবল চীনারা গোশ্ত খেতে পারত। চীনা মানুষের জীবনে এক সময় এমনও গেছে,ঠা-ায় ঘর গরম করার মত সামর্থ কারো ছিল না, কাঁথা-কম্বলও পর্যাপ্ত ছিল না। শীতকালের জন্য তারা সারা বছর গরুর গোবর জমিয়ে শুকিয়ে রাখত। ঠা-া পড়লে বড় চুলায় সারা রাত গরুর গোবর জ্বালাত আর গোটা পরিবারের সবাই চুলার ওপরে ইটের বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে রাত কাটাত। কেউ ঘুমোতে পারত, কেউ জেগে থেকেই নিশীথ পার করত।

‘চেইন’ চীনা সমাজের রাজনীতি ও দুর্নীতির একটি ফিরিস্তি দিয়েছিল। বলেছিল, ‘কলেজ ছাত্রদের মধ্য থেকেই কমিউনিস্ট পার্টিতে রিক্রুটমেন্ট শুরু হয়। যে-সব ছাত্রছাত্রী পার্টিতে যোগ দিতে চায়, তারা চাইলেই যোগ দিতে পারে না। তাদেরকে ১ থেকে ২ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং নিবিড় নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। যারা লেখাপড়ায় ভালো, মনোযোগী, দায়িত্বশীল, সুশৃঙ্খল তাদেরকেই পার্টিতে রিক্রুট করা হয়। যে-সব ছেলেমেয়ে উইকএন্ড পার্টিতে মদ খেয়ে মাতলামি করে, কমিউস্টি পার্টিতে কখনো তাদের জায়গা হয় না। পার্টি সদস্যদের মধ্যে র‌্যাঙ্ক আছে। একজন নতুন রিক্রুটকে যদি ১ ধরা হয় এবং শি জিন পিং কে ধরা হয় ১০, তা হলে যারা ৬/৭-এ থাকে তারাই দুর্নীতি করে সবচেয়ে বেশি। যারা নিচের দিকে থাকে তাদের প্রভাবপ্রতিপত্তি এবং দায়িত্বের পরিধি খবি সীমিত থাকে, তাই তাদের দুর্নীতি করার তেমন সুযোগ থাকে না। র‌্যাঙ্কের বিচারে তারা যখন ৬/৭-এ উঠে যায় তখন তাদের কার্যপরিধি এবং দাপট এক সাথে দু’টোই বেড়ে যায়। আর তারাই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি পরায়ন হওয়ার সুযোগ পায়।

৬/৭ র‌্যাঙ্কে লোভ-লালসা যাদের কাবু করতে পারে না, ওই পর্যন্ত যারা তাদের চরিত্রের নিষ্কলুষতা বজায় রাখতে পারে তারাই আরো ওপরে উঠে, কেন্দ্রীয় কমিটিতে যায়, পলিটব্যুরোর সদস্য হয়, মন্ত্রিত্ব পায়, অর্থাৎ নীচের দিকে যাই থাকুক, কমিউনিস্ট পার্টি সব সময় সিনিয়র লিডারশীপকে ষোল আনা খাঁটি ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে চায়। অন্য কথায়, সিনিয়র লিডারশীপকে থাকতে হবে, সৎ এবং দেশ, জাতি ও পার্টি আদর্শের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। হয়তো বা এজন্যই এতদিন ধরে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে আছে এবং কাজ করছে। সব সময়, সব জায়গায়, সব স্তরে দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য হলে দেশএভাবে স্থিতিশীল হয়ে এতটা এগোতে পারত না। অনেক আগেই চীনা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ত।

‘চেইন’-এর কাছ থেকে আমার শেখার শেষ নেই। এবার আসি ট্রাকের কথায়। চ্যাংচুনের যে কোনো রাস্তায় ১৫/২০ মিনিট গাড়ি চালালে একটি জিনিস চোখে পড়বেই পড়বে। সেটা এক ধরনের বিশাল বড়, চওড়া এবং ভারী ট্রাক, দেখতে কিম্ভুতকিমাকার, দৈত্যের মতন! এত বড় ট্রাক আমি ইউরোপ-আমেরিকার কোথাও দেখিনি। সে-সব দেশে মালামাল টানার এ জাতীয় ভারী যন্ত্রযান সাধারণত ইন্টারস্টেটেই (মহাসড়কে) চলে। কদাচিৎ লোকালয়ে শহরের ভেতরে তাদের দেখা যায়, কিন্তু চ্যাংচুনে সর্বত্রই দেখেছি এসব মহাট্রাকের অবাধ চলাচল। পশ্চিমা দেশের বড় ট্রাকে ১৮টি চাকা থাকে, (তাই এর আরেক নাম ঊরমযঃববহ ডযববষবৎ)। তার বিপরীতে চৈনিক ট্রাকে গুনে গুনে দেখলাম ২০টি চাকা। আমার মতে চ্যাংচুনে বড় ও ভারী ট্রাকের যত্রতত্র চলাচলের একটি শানে-নজুলও আছে বটে। সেটা হলো, ওই শহরে সর্বত্রই উন্নয়ন এবং নির্মাণকাজ চলছে পাগলা গতিতে। সারা চীনের হাল যদি এমন হয়, তাহলে সহজেই বুঝতে পারছেন, কী মহাকর্মযজ্ঞই না চলছে বিশাল ওই দেশটিতে!

অবশ্য আমি এতে মোটেও অবাক হই না, চীনের জন্য এটা নতুন কিছু নয়। প্রাচীন চীন সা¤্রাজ্য যখন তার সীমান্ত বরাবর পাহাড়-পর্বত ও দুর্গম গিরিপথ পেরিয়ে মহাপ্রাচীর গড়েছিল সে সময়ের জন্য সেটাও ছিল একটি বিশাল লঙ্কাকা-! আপনারা জানেন, দেওয়ালটির অবস্থান চীনের উত্তর সীমান্তে, পূব-পশ্চিম বরাবর। এটি তারা তৈরি করেছিল মঙ্গোল এবং অন্যান্য বহিরাগত বর্বরদের আক্রমণ থেকে চীনা লোকালয়গুলোকে নিরাপদ রাখার জন্য। ইতিহাসে পড়েছি, রাজা আসে রাজা যায়, দুর্ঘটনা ঘটে, শ্রমিক মরে, দেওয়াল গড়ে, সময় যায়, দেওয়াল ধ্বসেও পড়ে, কাজ থামে, আবার শুরু হয়, কিন্তু পুরোপুরি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত চীনারা প্রাচীর বানানোর কাজে ক্ষান্ত দেয়নি। সিদ্ধান্ত যখন একবার নিয়ে ফেলেছে, তার শেষ দেখা চাই-ই চাই। এটাই চীন দেশ! এরাই চীনা জাতি! এবার বুঝুন, জাতি হিসেবে তারা কত দৃঢ়চেতা, কত আত্মপ্রত্যয়ী এবং আপন সিদ্ধান্তে কতটা অটল! একটু পরিসংখ্যান দিলে বুঝতে পারবেন, কাজটি কত কঠিন, জটিল, ব্যয়বহুল, বড় মাপের এবং দীর্ঘমেয়াদী ছিল!

মূল প্রাচীরের কাজ শুরু হয় খৃষ্টের জন্মের প্রায় ২৬০ বছর আগে, স¤্রাট কিন শি হুয়াং-এর সময়। এই ‘কিন’-ই প্রথম ঝগড়াবিবাদে রত বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোকে একিভূত করে সা¤্রাজ্যকে সুসংহত করেন, অনেকটা আধুনিক জার্মানীর বিসমার্কের মতন। এই ‘কিন’ থেকেই ‘চিন’ এবং ‘চিন’ থেকেই ‘চীন সা¤্রাজ্য’ ও পরে আধুনিক চীন রাষ্ট্রের উদ্ভব। স¤্রাট ‘কিন’-এর বানানো সেই প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ কিছু কিছু আজও বিরাজমান। এর পর বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রাজার আমলে, বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রাচীরের কাজ হয়েছে, জোড়া দেওয়া হয়েছে, কালের আবর্তে জায়গায় জায়গায় ভেঙ্গে গেছে, ক্ষয়ে গেছে। হলে কি হবে? তারা আবার কাজে লেগেছে, আবার গড়েছে।

এভাবে সবশেষে প্রাচীরের কাজে ইতি টানা হয় সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝিতে মিং ডায়নাস্টির হাতে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিসেব করলে দেওয়ালের দৈর্ঘ প্রায় ৫০ হাজার কিঃ মিঃ যেখানে গোটা পৃথিবীর পরিধিই মাত্র ৪০ হাজার কিঃ মিঃ। (যঃঃঢ়ং:// িি.িভধপঃৎবঃৎরবাবৎ.পড়স/মৎবধঃ-ধিষষ-ড়ভ-পযরহধ-ভধপঃং)। বর্তমানে দেখার মত চীনের যে ৩ হাজার কিঃ মিঃ প্রাচীর মাটির ওপর খাড়া আছে তা মূলত মিং সা¤্রাজ্যের সময়কার ৬ হাজার কিঃ মিঃ-এর মধ্যে ইট-পাথরে গড়া অংশটি। ইট-পাথর ছাড়াও প্রাচীরের জায়গায় জায়গায় তারা মাটি এবং গাছ ব্যবহার করেছিল (কেন করেছিল? সে প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই) কালের আবর্তে সে সব জায়গা প্রায় সবই ক্ষয়ে গেছে।

দেওয়ালের প্রস্থের মাপ প্রসঙ্গে বলা হয়ে থাকে যে, এর চান্দিতে ষোলটা ঘোড়া পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে, উচ্চতা সর্বনি¤œ ৫ মিঃ সর্বোচ্চ ৮ মিঃ। মহাচীনের এই মহাপ্রাচীর বানাতে গিয়ে কত অর্থ খরচ হয়েছে, কত দুর্নীতি হয়েছে তা জানি না, তবে নির্মাণ কাজে শ্রমিক মারা গেছে প্রায় দশ লক্ষ এবং কাজটি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে দীর্ঘ দু’হাজার বছর। (যঃঃঢ়ং:// িি.িভধপঃৎবঃৎরবাবৎ. পড়স/মৎবধঃ-ধিষষ-ড়ভ-পযরহধ-ভধপঃং)। প্রাচীর বরাবর এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত পথে পথে হারিয়ে গেছে অসংখ্য মৃত শ্রমিকদের কবর। এ জন্য চীনের প্রাচীরকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর দীর্ঘতম গোরস্থান (ঞযব খড়হমবংঃ ঈবসবঃধৎু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ)। (যঃঃঢ়ং:// িি.িভধপঃৎবঃৎরবাবৎ. পড়স/মৎবধঃ-ধিষষ-ড়ভ-পযরহধ-ভধপঃং)।

ফিরে আসি আধুনিক চীনের ট্রাকের কথায়। এর প্রতি ‘চেইন’-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, সে গর্বভরে যা বলল তার সারসংক্ষেপ এরকম, এ ট্রাক আমদানীকৃত নয়, এফ.এ.ডব্লিউ (ঋরৎংঃ অঁঃড় ডড়ৎশংযড়ঢ়) নামে একটি কোম্পানি এগুলো তৈরি করে খুদ চীনের মাটিতেই। এফ.এ.ডব্লিউ জার্মানীর ‘ভক্স ওয়াগন’ ও চীন সরকারের একটি যৌথ উদ্যোগ।

বেইজিং-এর পরিবেশ দূষণের কথা ‘চেইন’ বলেছে, এভাবে। তার ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগে বেইজিং-এ হয়েছিল এশিয়া প্যাসিফিক অ্যালায়েন্স ফর কোওপারেশন (অ্যাপ্যাক)-এর শীর্ষ সম্মেলন। ওই সম্মলেন উপলক্ষ্যে সরকারি নির্দেশে দশ দিন বেইজিং ও তার আশপাশের ফ্যাক্টরিগুলোতে যাবতীয় উৎপাদন কর্মকা- বন্ধ ছিল। ফলে সম্মেলনের দিন – বেইজিং-এর মাথার ওপর উন্মুক্ত ‘নীল আকাশ’ দেখা গিয়েছিল। সম্মেলন শেষ হলো, কলকারখানায় উৎপাদন শুরু হলো, আস্তে আস্তে আবার ঘন কালো ধুঁয়ায় বেইজিং-এর আকাশ ঢেকে গেল। হঠাৎ দেখা রাজধানী শহরের ওই ‘নীল আকাশকে’ আজো বলা হয়ে থাকে ‘অ্যাপ্যাাক ব্লু’। চীনের পরিবেশ প্রসঙ্গে ‘চেইন’ আরেকটু গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করল। সে বলল, ‘আমাদের সরকার অত্যন্ত সচেতনভাবে সাবধানতার সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, আগে উন্নয়ন পরে পরিবেশ’। আমি যোগ করলাম, তোমার সরকার যেভাবে উন্নয়নের লাল ঘোড়া সারা দেশে দাবড়িয়ে দিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে শুধু যে এর লাগাম টেনে ধরবে তা-ই নয়, বরং পরিবেশের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটাও মেরামত করবে নির্মমভাবে অবিশ্বাস্য রকম দ্রুততার সাথে, পাগলা ঘোড়ার গতিতে। আমার এক চৈনিক সহকর্মী বলল, চীনে পরিবেশ দূষণ দূর করার কাজ নাকি শুরু হয়ে গেছে। বেইজিং থেকে ১৫০ কিঃ মিঃ দূরে একটি নতুন বিশাল শহর তৈরি হচ্ছে। বিদেশি দূতাবাস এবং রাজধানীর সাথে সংশ্লিষ্ট অফিসআদালত বাদে বাকি সবই বেইজিং থেকে চলে যাবে নতুন শহরে।

এবার চ্যাংচুনেআমার এক শ্রীলঙ্কান বন্ধুর সাথে দেখা। তার কাছ থেকেও কিছু নতুন জ্ঞান আহরণ করেছি। সে এখন সাংহাইতে থাকে, একটি অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংহাই ক্যাম্পাসের পরিচালক। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সাংহাইয়ের যে পরিবেশ খারাপ, বাতাস দূষিত, তুমি সেটা বুঝো কিভাবে? সে উত্তরে যা বলল, তা এরকম, ‘ণড়ঁ রিষষ হবাবৎ ংবব ঃযব মড়ষফবহ ংঁহ রহ ঃযব নষঁব ংশু. ঞযবৎব রং ধষধিুং ধ ঃযরপশ ষধুবৎ ড়ভ ভড়ম ড়াবৎ ুড়ঁৎ যবধফ – ভঁষষ ড়ভ ঢ়ড়ষষঁঃধহঃং.’ এই সুযোগে বন্ধুটির কাছে আরো জানতে চেয়েছিলাম, সত্যি কি চীনে ‘প্লাস্টিক চাল’ এবং ‘কৃত্রিম ডিম’ পাওয়া যায়? বন্ধুটি সে কথাগুলো হেসে উড়িয়ে দিলো। বলল, ‘এসব নিছক অপপ্রচার ও গুজব’!

তারপর কথায় কথায় সে বলল, চীনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কিভাবে চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিভাগীয় প্রধান, ডিন, প্রভোস্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট, সবার নিয়োগ স্বাভাবিক সরকারি নিয়মেই হয়। তারা তাদের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবেই করে যান। সমান্তরালভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারিদের মাঝে যারা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য তাদের নেতৃত্বের একটি উপরি কাঠামোও থাকে। এটা অতীব শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর। তবে তারা যখন-তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বিরক্ত করে না, প্রভাবিত করে না, করতে চায় না, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির স্বার্থবিরোধী অথবা সরকার ও সরকারি নীতিমালা থেকে কোনো বড় রকমের বিচ্যুতি বা ব্যত্যয় হলে পার্টির ধ্বজাধারীরা অবধারিতভাবে হস্তক্ষেপ করবে এবং করলে প্রশাসনকে তাদের কথা শুনতেই হবে, না শুনলে হয় বদলী করবে, নয় তো বরখাস্ত।

অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় চীনা প্রফেসারদেরে কাছ থেকে তিনটি বিষয় জেনেছি। প্রথম – একজন বিশ্ববিদ্যালয় ডিন, চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ককে মাত্র কয়েকটি শব্দ দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ১. উত্তর কোরিয়া তাঁদের প্রতিবেশী; ২. উত্তর কোরিয়া আমেরিকার বিরুদ্ধে তাঁদের একটি কৌশলগত হাতিয়ার; ৩. উত্তর কোরিয়া তাঁদের দায় (ষরধনরষরঃু); ৪. উত্তর কোরিয়া পৃথিবী ও চীনের জন্য বিপজ্জনক।কথাগুলো আমার কাছে খুবই অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। ব্যাখ্যা আপনারা নিজেদের মত নিজেরাই করে নিতে পারেন।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, তাঁর কথায় আরো বুঝলাম, তাঁদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত, জাপান, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানকে নিয়ে চীনাদের মধ্যে তেমন কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তবে আমেরিকা কখন কী বলে, কী করে সে ব্যাপারে চীনারা সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখে।

তৃতীয় বিষয়টি এরকম, পরাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থানকে তার বুদ্ধিজীবীরা কিভাবে দেখে?একাধিক চীনা প্রফেসারদের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম, এ ব্যাপারে তারা মনে মনে খুশি, আত্মতৃপ্ত এবং সন্তুষ্ট, কিন্তু তারা এ নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি বা বাগাড়ম্বর করতে চায় না। তারা আরো মনে করেন, পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বের মুরব্বিয়ানার দায়িত্ব নেয়ার তাদের এখনো সময় হয়নি। বিশ্বব্যবস্থায় তারা তাদের প্রভাব আস্তে আস্তে বিস্তার করতে চায় এবং এ জন্য তারা প্রয়োজনে আরো ২৫ বছর অপেক্ষা করতে রাজি।

(ন্যাশভিল, জুন, ২০১৭)
ঞযব অঁঃযড়ৎ রং ধহ ঊপড়হড়সরপং চৎড়ভবংংড়ৎ ধহফ ধহ অপধফবসরপ ঔড়ঁৎহধষ ঊফরঃড়ৎ
রহ ঃযব ট.ঝ. ঊসধরষ: ধিযরফ২৫৬৯@মসধরষ.পড়স

পুনশ্চঃ যে-দিন হোটেলের বাইরে যাইনি সেদিনের কথা এখন বলছি। চ্যাংচুনে প্রথম রাত কাটালাম। ঘুম ভালোই হলো। খুব ভোরবেলার কথা – রাতের আঁধার কেটে গেছে, কিন্তু পূবের আকাশে তখনো আলো ফুটেনি। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখলাম, বাইরে বেশ ঠা-া, রাতে ফ্রস্ট পড়েছে,সবুজ ঘাসে, ফুলের পাপড়িতে ও গাছের পাতায় পাতায় সাদা সাদা পাতলা প্রলেপ জমে আছে। গরম গরম এক কাপ চা বানিয়ে খেলাম। তারপর লবিতে নেমে এলাম। ভেবেছিলাম কম্পিউটার রুমে গিয়ে ইমেল দেখব, কিন্তু পরিবেশটা অনুকূল মনে হলো না। মানুষজনের কোনো আনাগোনা নেই, সব চুপচাপ, নিশ্চুপ। ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মরত তরুণ-তরুণী নিজ নিজ চেয়ারে বসে ঘুমোচ্ছে। মেয়েটি তার গায়ে একটি জ্যাকেট ছড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেটির জন্য তার স্বাভাবিক পরিচ্ছদই যথেষ্ট। আমার সামান্য প্রয়োজনে তাদের এমন আরামের ঘুম ভাঙ্গাতে চাইলাম না। সামনের খোলা রিভল্ভিং দরজা দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম, একই কায়দায় কোণায় বসে দ্বাররক্ষীও নিদ্রামগ্ন।

আমি দু’কদম হেঁটে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালাম। দেখতে চাইলাম ভোরের চ্যাংচুনে নাগরিক জীবনের সূচনা কেমন করে হয়। এই সময়ে ঢাকার রাস্তায় কর্মচঞ্চল শত শত মানুষের কোলাহল শুরু হয়ে যায়, কিন্তু চ্যাংচুনে তেমন কিছুই দেখতে পেলাম না। ফুটপাথে কোনো পদধ্বনি নেই, যতক্ষণ ছিলাম আট লেনের চওড়া রাস্তায় একটা গাড়িও দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। এমন সময় বাঁদিকে চেয়ে দেখি একটি মধ্যবয়সী লোক রাস্তার ডান পাশ ধরে কী যেন টেনে টেনে আমার দিকে নিয়ে আসছে। আমি কৌতূহল নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছি। সে আসছে, বোঝা টানছে, মাঝে মাঝে থামছে। কাছে আসলে দেখতে পেলাম ছোট ছোট দুই চাকার ওপর রড ও কাঠ দিয়ে সে মাল টানার উপযোগী একটি কার্ট কোনোমতে বানিয়ে নিয়েছে এবং কার্টটি বোঝাই করেছে তিনটি বস্তু দিয়ে, দু’টি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ওপরটি অদৃশ্য। প্রথমে অনেকগুলো হার্ডবোর্ডের বাক্স চ্যাপ্টা করে একটি বান্ড্ল তুলেছে। তারওপর একটি স্বচ্ছ প্লস্টিকব্যাগে খালি কোক-পেপসির টিন ভরেছে, কার্টের সাইডে কেমন করে আরেকটি বড় ভরা বস্তা ঝুলিয়েছে। ভেতরে কী আছে দেখার উপায় নেই।

বুঝতে পারলাম, বেকার লোকটি তার জীবীকার জন্য ঢাকার টোকাইদের মত এসব কুড়িয়ে জোগাড় করেছে, কোথাও নিয়ে বিক্রি করবে। মেহনতি মানুষটিকে দেখছি আর ভাবছি, কোথায় সে রাত কাটালো! হয়তো বা কোনো ব্রিজের নীচে, হয়তোবা ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফরমে, হয়তো বা খোলা আকাশের তলে!ঘুমোতে পেরেছে? নাকি মশা মারতে মারতেই রজনী পার করে দিয়েছে! (চ্যাংচুনে মশা আছে, অভিজাত হোটেলের পাঁচ তালায় আমার কক্ষে গুণ গুণ আওয়াজ শুনেছি, মশা মারার কুশেশ করে ব্যর্থ হয়েছি একাধিকবার) কোথা থেকে তার জীবনের এই ঘাঁনি টানা শুরু হয়েছেএবং কোথায় গিয়ে শেষ হবে জানি না! কে জানে? হয়তো বা সে নিজেও জানে না! জগতে বিত্তবানদের জীবনে প্রত্যাশা আছে, আছে প্রাপ্তি, অশান্তি আছে, হাহাকারও আছে, কিন্তু এসবের মধ্যে বৈচিত্র্যও থাকে বটে! পক্ষান্তরে গরিবের জীবন সর্বত্রই এক, একঘেয়ে এবং নিরানন্দময়!

জীবনের বোঝা বয়ে ক্লান্ত মানুষটি যখন আমার পাশ দিয়ে আমাকে পার হয়ে যাচ্ছে তখন তার ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নিঃশব্দে আমার বুকে এসে বাজছে। ইচ্ছে হয়েছিল বলি, তোমার বোঝা টানায় আমাকে শরিক করবে? একটু দাও না, আমি কিছুদূর ঠেলে দেই, তুমি জিরিয়ে নাও। বললেও সে রাজি হত না। জানেন? কিভাবে বুঝলাম? পকেট থেকে সেলফোন বের করে আমি ইশারায় বলেছিলাম, তোমার একটা ছবি তুলতে পারি? অনুমতি মেলেনি! তার জায়গায় আমি হলে মাথার চুল আর সার্টের কলার ঠিকঠাক করে হাসি মুখে পোজ দিতাম, কিন্তু ‘সে’ তো আর ‘আমি’ নয়। আমি ‘বাঙালি’, সে ‘চৈনিক’। তার দারিদ্রকে পুঁজি করে কোনো বিদেশি ব্যবসা করুক, এটা সেচায়নি!

লেখকঃ  অর্থনীতির অধ্যাপক  ও জার্নাল এডিটর, ইউ এস এ

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী