“আদরে শাসনে প্রকৃত মানুষ হোক আমাদের সন্তান”

সালমা তালুকদারঃ

“আমাকে মেরো না।ভাইরাল হলো ভিডিও।”
চলছে এবার ফেইসবুকে লাইক,কমেন্ট, শেয়ার।জানি না কে ভিডিওটি আপলোড করেছে।স্বয়ং মা নাকি শিক্ষক।মনে হচ্ছে মা ই করেছেন।বাচ্চাটা অনেক কিউট এবং পাকনা বাচ্চা।বোঝাই যায়।হয়তো বাচ্চাটা এরকম আগেও করেছে।মা এর ভালো লেগেছে তাই ভিডিও করে ফেইসবুকে দিয়ে দিয়েছেন।বুঝেন নাই এরকম ছড়িয়ে যাবে বা এত পজিটিভ নেগেটিভ কমেন্ট আসবে।এজন্যই বার বার বলা হয় ফেইসবুক ব্যবহারে সাবধান হওয়া উচিৎ।প্রাইভেসি সেটিংসটা ভালো ভাবে করা উচিৎ আর পাবলিক পোস্ট দিলে চিন্তা করে দেয়া উচিৎ।কারণ পোস্ট দিতে দেরী হলেও সেটা ভাইরাল হতে দেরী হয় না।

এটাকে অনেকে চাইল্ড এবিউজ হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছেন।আসলে কি ব্যাপারটা তাই? আমার ছোটবেলায় আমি শুধু বাবা মা না। চাচাদের হাতেও মাইর খেয়েছি।তখন হয়তো ভালো লাগেনি ব্যাপারটা।এখন মনে হয় ভুল করেছিলাম বলেই শাস্তি পেয়েছি।এবং সেই ভুলটা আর করা হয়নি। একবার আমার ছোট মামার সাথে বেয়াদবি করেছিলাম বলে আমার বাবা মামার পা ধরে বসিয়ে রেখেছিলেন।যতক্ষণ মামা আমাকে ক্ষমা করে না দিয়েছিলেন ততক্ষণ মামার পা ধরে বসেছিলাম।অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে দোষটা আমার মামারই ছিলো।আমার মামা আমার মাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলেছিলেন বলে আমি রিয়েক্ট করেছিলাম।জানি না পরে মামা আমার মা এর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন কিনা।তবে আমি শিখেছিলাম বড়দের কোনো ব্যাপারে ছোটরা নাক গলাতে হয় না।এবং বড়দের সাথে মুখে মুখে তর্ক করা ঘোরতর অন্যায় কাজ।বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত এই জিনিসটা আর কখনো করিনি।এখন বড় হয়েছি।সংসার সন্তান হয়েছে।মধ্য বয়সে পদার্পণ করেছি। বড়দের কোনো কাজ ভুল মনে হলে এখন হয়তো প্রতিবাদ করি।কারণ বড়রা এখন বুড়ো হয়েছেন।স্মৃতি শক্তি তাদের লোপ পেয়েছে।

যাই হোক এত কথা বলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাবা, মা সন্তান জন্ম দিয়ে পৃথিবীতে আনেন।সন্তান মানুষ করার জন্য বাবা সকাল থেকে সন্ধ্যা বাইরে টাকা রোজগারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।আর মা সন্তানের স্কুল খাওয়া দাওয়া সবকিছু দেখেন।সন্তানের ব্যাপারে সিরিয়াস মারা  আবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্কুলেই থাকেন।স্কুল শেষ হওয়ার পর সন্তানের কষ্টের কথা চিন্তা করে স্কুল ব্যাগটা নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে বাসায় ফেরেন।সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য যে মা বাবা এত কষ্ট করেন সেই মা বাবা সন্তানের অন্যায় দেখলে কিছু বলতে পারবেন না।এটা কেমন কথা!আমাদের সময় একটা কথা খুব চলতো,”মাইরের উপর কোনো ঔষধ নাই।”কথাটা আমি এখন আমার বাচ্চাদের বলি।সন্তানরা ছোট তাদের মাথাটাও ছোট।অনেক কিছু বোঝে না।আদরে শাসনে বড় করতে হবে।আমাদের সময় বাবা মা মুখে তেমন কিছু না বললেও তাদের নিজেদের লাইফ স্টাইলটাই এমন ছিল যে আমরা আইডল হিসেবে মেনে নিয়ে সেভাবে নিজেদের তৈরী করেছি।যার জন্য কথায় কথায় বাবা মা এর নামটা চলেই আসে।আমাদের বাবাও আমাদের সময় দেন নাই।সভা সমিতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।আর মা সারাদিন রান্না বান্না নিয়ে।খুব যে সময় দিয়েছেন তা কিন্তু না।কিন্তু যতটুকু দিয়েছেন ভালোভাবে দিয়েছেন।এগুলো নিয়ে কখনো কথা উঠেনি।তাহলে আজকে কেন একটা বাচ্চাকে তার মা এর বকা বা মাইর দেয়াকে কেন্দ্র করে এত কথা উঠবে!?মা তো মাই।যে মা পড়াতে বসেছেন সে নিশ্চয়ই আদর করে বুকে জড়িয়ে তার সন্তানটিকে ঘুমও পাড়ান।আবার অসুখ হলে রাত জেগে সেবাও করেন।একজন প্রকৃত শিক্ষিত মা সন্তানের মন মানসিকতা পড়তে পারেন এবং সেইভাবে কাজও করেন।কারণ এই সেই মা যিনি নিজের পেটে এই সন্তান ধারণ করেছিলেন।
ব্যতিক্রম সব জায়গাতেই আছে।সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না।কারণ সেটা আবার বিস্তারিত আলোচনা।আমি নিজের চোখেই দেখেছি এমন মা ও আছেন যিনি পেটের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও পক্ষপাতিত্ব করেন।

যাই হোক আমরা চাইবো আদরে শাসনে সন্তান এমন ভাবে গড়ে উঠবে যেন সুসন্তান হয়ে দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে এবং বৃদ্ধ বাবা-মাকে খাবার চাওয়ার অপরাধে নির্যাতন না করে।অতি শাসনে যেমন সন্তান বিগড়ে যায় তেমনি অতি আদরেও কিন্তু সন্তান প্রকৃত মানুষ হয় না।আমি এমন মাকেও দেখেছি যার কাছে তার আদরের সন্তান এসে স্কুলের শিক্ষকের নামে বিচার দিয়েছে।আর সেই মা সন্তানের সামনে শিক্ষকের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছেন।এটা যে তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কত খারাপ হলো এটা তিনি বুঝলেন না।কারণ তিনি সন্তানের প্রতি ভালোবাসায় অন্ধ একজন মা।
পরিশেষে বলতে চাই, ছোট ছোট মানুষগুলোকে একটু বুঝে শুনে মানুষ করলে পরবর্তীতে ভালো থাকবে আমাদের পরিবার, ভালো থাকবে আমাদের দেশ।ধন্যবাদ।

লেখকঃ প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নর্থ ওয়েস্টার্ন কলেজ

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী