যেভাবে ঠিকানা হল আমেরিকা

ড. রউফুল আলমঃ

গতবছর যখন আমেরিকায় আসি, তখন আমার হাতে এদেশের দুটি বৈধ ভিসা। তার আগে আমেরিকায় এসেছি কয়েকবার। সাথে ছিলো, সুইডিশ সরকারের স্থায়ী আবাসের স্বীকৃতি (গ্রিন কার্ড) ও বাঙলাদেশের পাসপোর্ট। তারপরও দ্বারস্থ হলাম আমেরিকান ইমিগ্রেশনের।
একটা ইন্টারভিউ হবে। ইমিগ্রেশন অফিসার যা ইচ্ছে তাই জিজ্ঞেস করার অধিকার রাখেন। এদেশের ইমিগ্রেশন অফিসারদের সামনে শিশুরা পর্যন্ত ভয়ে কাচুমাচু হয়ে যায়। তাদের সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই ভালো ধারনা রাখে না। তাদের নিয়ে সবার মধ্যে একটা নেগেটিভ ধারণা থাকে। ইন্টারভিউর দিন সকালে দোয়া-দুরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিলাম। আমার হৃদপিণ্ডে রিখটার স্কেলে আট মাত্রার ঝাঁকুনি চলছে। অফিসার কি সিদ্ধান্ত দিবেন সে ভয়ে নয়, আমি তাকে কতো দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করতে পারবো, সে চিন্তায়।

ইমিগ্রেশন অফিসার এসে ডাকলেন। তার রুমে গিয়ে বসলাম। তার রুম ভর্তি কাগজ-পত্র। দুনিয়ার কতো মানুষের কতো ডকুমেন্ট যে এই ছোট্ট রুমটায় আছে, অকল্পনীয়। মানুষের জীবন কতোগুলো ডকুমেন্টের মধ্যে আটকে আছে। পরীক্ষার সার্টিফিকেট, ভিসা, পাসপোর্ট, জন্ম সনদ আরো কত কী! অদ্ভুদ এই জীবন। না চাইলেও, কতগুলো কাগজই আমাদের জীবনের বড়ো নিয়ন্ত্রক হয়ে আছে। অফিসার আমার জীবন নিয়ে ঘাটছেন। অর্থাৎ আমার কাগজ-পত্র দেখছেন। চশমার ফাঁক দিয়ে, চোখ কপালে লাগিয়ে মাঝে মাঝে আমাকে দেখছেন। হয়তো দেখছেন আমি ভয় পাচ্ছি কিনা। এই রকম দৃষ্টি দিয়ে তারা নার্ভাসনেস পরীক্ষা করেন। একের পর এক ডকুমেন্ট উল্টাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী করি। তাকে বললাম। অর্গানিক কেমেস্ট্রিতে গবেষণা বিষয়টা তার কাছে কেমন যেনো মনে হলো! শুনার পর একটা উদাসীন ভাব নিয়ে থেমে গেলেন। এইসব অফিসারদের যখন ট্রেনিং দেয়া হয় তখন প্রথম লেসনে বলা হয়, নেভার স্মাইল! তারা জীবনে হাসি ভুলে যায়। হাসা যেনো তাদের জন্য অপরাধ! তিনি নাম-ধাম জিজ্ঞেস করলেন। তেমন কোন প্রশ্নই করলেন না আর।
অবাক করে দিয়ে হঠাৎ বললেন, ইউ আর অল সেট! যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। ভেবেছিলাম গর্জন হবে, অথচ দেখলাম হাই তুলেই শেষ। জীবনে এতো সাদা-মাটা ইন্টারভিউ হয়নি কখনো।

সময়ের ডাকে মানুষ দেশ থেকে দেশান্তরী হয়। আর তাই, অস্তিত্বই আমার কাছে ঠিকানা। কোথায় আছি, সে নিয়ে ভাবনা কম। কেন আছি, কেমন আছি সেটাই মুখ্যভাবনা। কিন্তু ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থা’ যেহেতু সহজ করে ভাবে না, তাই রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হতে হয়ে। ইন্টারভিউর কয়েক সপ্তাহ পর একটি চিঠি পেলাম। এদেশ আমাকে নতুন করে স্বাগতম জানিয়েছে। বলেছে, ইউ আর এ পারমানেন্ট রেসিডেন্ট অব ইউনাইটেড স্টেইটস! কয়েক সপ্তাহ আগে পাঠিয়েছে একটি কার্ড। মানুষ এটাকে ডাকে ‘গ্রীন কার্ড’ নামে! ভাবলাম, এই গ্রহ ছাড়া আমাদের আর কোথায় যাওয়ার সুযোগ নেই, অথচ এই গ্রহেই আমাদের কতো ঠিকানা! ঠিকানার জন্য আমাদের কতো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর লড়াই!
…….
লেখকঃ গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী