তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়!

প্রভাষ আমিনঃ

ছেলেটা আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য যাচ্ছে না বলে গেছে বলাই ভালো্। লম্বায় ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। কথাবার্তায় বুঝি ছেলেটি মননেও ম্যাচিউরড (ইদানিং এই শব্দটি নিয়ে অনেক আলোচনা) হচ্ছে। আড়াল থেকে প্রসূনের দিকে তাকালে গর্বে আমার বুক ফুলে যায়, এটি আমার ছেলে। বাবা হিসেবে আমি তত ভালো নই, ছেলেকে যথেষ্ট সময় দিতে পারি না। কিন্তু সন্তান হিসেবে প্রসূনই সেরা। প্রসূন আমার দেখার চোখ বদলে দিয়েছে। আমাকে আরো মানবিক করেছে। যে কোনো শিশুর দিকে তাকালেই আমি তার মথ্যে প্রসূনকে দেখি, আমি আরো কোমল হয়ে যাই।
সন্তানের কথা ভাবলে আমার আনিসুল হকের অনুবাদ করা কাহলিল জিব্রানের কবিতাটি মনে পড়ে:
তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে
তুমি তাদের শরীরকে বাসগৃহ জোগাতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়
কারণ তাদের আত্মা বাস করে ভবিষ্যতের ঘরেযেখানে তুমি যেতে পারো না,
এমনকি তোমার স্বপ্নের মধ্যেও নয়
তুমি তাদের মতো হওয়ার সাধনা করতে পারো, কিন্তু
তাদের তোমার মতো বানানোর চেষ্টা কোরো না
কারণ জীবন পেছনের দিকে যায় না, গতকালের জন্যে বসেও থাকে না
তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তির
ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেনযেন তার তির ছোটে
দ্রুত আর দূরে
তুমি ধনুক, তুমি বাঁকো, ধনুর্বিদের হাতে তোমার বেঁকে যাওয়া যেন আনন্দের জন্য হয়
তিনি কেবল চলে যাওয়া তিরটিকে ভালোবাসেন তা-নয়,
তিনি তো দৃঢ় ধনুকটিকেও ভালোবাসেন
কবিতা পড়ি বটে, তেমন করে ভাবিও। কিন্তু কবিতার মত হতে পারি না। সন্তানের ওপর আমাদের ভাবনা চাপিয়ে দেই। চাই আমার সন্তান আমার ভাবনা নিয়ে বড় হোক। সন্তানের মধ্যে নিজে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না বা বুঝতে চাই না; প্রতিটি মানুষ আলাদা, প্রতিটি ব্যক্তি পৃথক স্বত্বা। আমি চেয়েছি শুধু শারীরিক উচ্চতা নয়, সবকিছুতেই প্রসূন আমাকে ছাড়িয়ে যাক। আমি চাই, একদিন মানুষ আমাকে বলুক, ঐ যে প্রসূনের বাবা। আমার ছেলে বিত্তে অনেক বড় হোক, এমন কোনো আকাঙ্খা আমার নেই। আমি চাই প্রসূন চিত্তে বড় হোক। আমি চাই আমার ছেলেটা সুখী হোক, আর এটা জানি সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে বিত্তের কোনো ভূমিকাই নেই। কখনোই যেন প্রসূন টাকার পেছনে না ছোটে। প্রসূন বড় হোক চিন্তায়, জ্ঞানে, বিদ্যায়, বিবেকে। আমি চাই, প্রসূন জীবনের মানে খুঁজে পাক- কবিতায়, গানে, বইয়ে, সিনেমায়, শিল্পকলায়, খেলায়, প্রকৃতিতে, মানুষে। ৭০/৮০ বছরের একটা জীবন। সবারই আক্ষেপ, জীবন এত ছোট কেন? অর্থের মত অনর্থক জিনিসের পেছনে ছুটে সেই ছোট্ট কিন্তু অমূল্য জীবনটা নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। অর্থই সকল অনর্থের মূল। আসলে অর্থ ছাড়াই অর্থবহ জীবনযাপন করা সম্ভব, চাই প্রসূন সেটা বুঝুক। চাই প্রসূনের জীবনটা লম্বা নয়, বড় হোক। আমি চাই ছেলে যেন কখনো কারো ক্ষতি না করে, সুযোগ থাকলে যেন উপকার করে। আমিও চাই আমার ছেলের অনেক ক্ষমতা থাক, তবে এমন ক্ষমতা, যাতে মানুষ তাকে ভালোবাসবে, ভয় পাবে না। আমি চাই, আমার ছেলেটা মানুষকে ভালোবাসুক, সম্মান করুক, বিশ্বাস করুক। সবসময় নাম্বার ওয়ান হতে চেয়ে, জীবনটা নষ্ট না করুক। সবসময় জিততেই হবে এমন কোনো কথা নেই। সবসময় জিতলে জেতাটাও পানসে হয়ে যায়। জয়ের আনন্দের তীব্রতাটা বুঝতে মাঝে মাঝে হারতেও হয়। হারার আনন্দটাও পাক আমার লক্ষী সোনাটা।
আমার সব চাওয়া পূরণের বয়স এখনও হয়নি প্রসূনের। তবে আমার ভালো লাগে, যখন দেখি আমার ছেলেটা অনেক নরম-সরম। মানুষকে বোঝার চেষ্টা করছে। মানুষকে সম্মান দিচ্ছে। টাকা-পয়সা নিয়ে তার মধ্যে কোনো লোভ দেখিনি। চাহিদাও খুব অল্প। আমার মতই ইলেকট্রনিক্স ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহ নেই। পড়াশোনায়ও আগ্রহ কম, তবে মাথাটা খুব পরিস্কার। চিন্তা-ভাবনাও খুব স্পষ্ট। তার খেলা পছন্দ, গান পছন্দ, সিনেমা দেখে, বই পড়ে। ভালো লাগে, আমার সত্যি ভালো লাগে। এমন একটি সন্তান পেলে জীবন বদলে যায়, পূর্ণ হয়ে যায়। আমি খুব নিরীহ, ছাপোষা মানুষ। বৃহত্তর ত্যাগের কথা ভাবতে পারি না। স্বার্থপরের মত নিজের সন্তানকে আগলে রাখতে চাই সবসময়। আমি এমনিতে অনেক শক্তপোক্ত মানুষ। কিন্তু প্রসূনের চোখে পানি দেখলে বা প্রসূনের মন খারাপ থাকলে আমার দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যায়। কাল মধ্যরাতে প্রসূন চুপচাপ এসে আমার পাশে শুয়ে ছিল। প্রসূনকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকলে জীবন পূর্ণ হয়ে যায়। জীবনের কাছে আমার আর কিছু চাইবার নেই।
ছেলে বড় হচ্ছে। আস্তে আস্তে তার আলাদা জগত হচ্ছে, পছন্দ-অপছন্দ বদলে যাচ্ছে, সবকিছুতে তর্ক করে। তর্ক শুনে মুক্তি ক্ষেপে যায়, বলে বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। আমি বলি বেয়াদবি নয়, এটা বয়সের ব্যাপার। এই বয়সটাই এমন। তবে প্রসূনের যতটা ঘাটতি, তার দায় আমাদের। আমরা তাকে কখনো ছাড়িনি। জীবনের কঠিন বাস্তবতাটা বুঝতে দেইনি। জীবনযুদ্ধে কিভাবে লড়বে জা্নি না। ভয় লাগে। আমরা সে লড়াইয়ে পাশে থাকবো। কিন্তু যার যার লড়াই আসলে তাকেই লড়তে হবে। আমরা শুধু তাকে লড়াইয়ের অস্ত্রে শান দিয়ে দিচ্ছি। সেই অস্ত্র হচ্ছে বিদ্যা, জ্ঞান। আমি তাই রেজাল্টের চেয়ে ছেলে কতটা শিখছে সেটা খেয়াল করি।
প্রসূনের এখন টিন এজ। এই বয়সের ছেলেদের বিপথে নেয়ার জন্য চারপাশে অনেক ফাঁদ পাতা। আমাদের সময় খারাপ হওয়াও অনেক কষ্টকর ছিল। এখন হাতের মুঠোয় মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক- আরো কত কি। মুক্তি অনেক চেষ্টা করে প্রসূনকে এসব থেকে দূরে রাখতে। চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু সারাক্ষণ তো
পাহারা দিয়ে রাখা যাবে না। আর যুগের সাথে তো তাল মেলাতেই হবে। নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে।
খালি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারি, শুধু আমার ছেলেকে নয়, আমাদের ছেলেদের ভালো রেখো। তাদের হাতেই তো দেশের ভবিষ্যত। এই সন্তানরাই গড়বে উন্নত, সমৃদ্ধ, উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

 

[বিঃ দ্রঃ ২৩ শে আগস্ট ছেলের জন্মদিনে ছেলের উদ্দেশ্যে লেখা আর্টিকেল । মূল শিরোনামঃ শুভ জন্মদিন বেটা!

লেখক প্রভাষ আমিন

লেখকঃ প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী