আমাদের সন্তানদের নৈতিকতার অবস্থান কোথায়?

আসরাফুজ্জামান মিনহাজঃ

অবক্ষয় শব্দের আভিধানিক অর্থ “ক্ষয়প্রাপ্তি”, সামাজিক মূল্যবোধ তথা সততা, কর্তব্য নিষ্ঠা, ধৈর্য্য, উদারতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলী লোপ পাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বলে সামাজিক অবক্ষয়।

বর্তমান সময়ে আমাদের আপন সমাজের কেমনতর অবয়ব তা সচেতন সামাজিক মাত্রেরই জানা। তথাপি নানাবিধ অপরিহার্য ব্যস্ততা হেতু আপন স্বার্থেই আপন চেহারা অবলোকন করে নেওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। আমাদের বর্তমান সমাজ কাঠামো ক্ষেত্রবিশেষে কেমন অবস্থায় রয়েছে_ ক্ষেত্রবিশেষ বলতে দেশের বর্তমান আর্থ-ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাক্ষেত্রের অবস্থা, মূল্যবোধ ইত্যাদি সবকিছুকে বোঝায় বলে মনে করি। এক কথায় যদি এইমত প্রশ্নের জবাব সন্ধান_ তাহলে বলব, মোটামুটিভাবে তেমন সুস্থ অবস্থায় নেই। বহু ক্ষেত্রে বিকৃতি গ্রাস করেছে, সুস্থ মূল্যবোধে ভয়ঙ্কর, ভীষণ অবক্ষয় এবং নৈতিকতার অভাব যা আমাকে বিশেষভাবে এই প্রবন্ধ লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।

অশ্লীলতা :
রমনা পার্ক, নর্থ সাউথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চিটাগাং ইউনিভার্সিটি, কারমাইকেল কলেজ, রেইন। পাঠক শব্দ গুলি সবারই কম বেশি পরিচিত। কিন্তু যদি বলি এগুলোর প্রায়োগিক ভিন্নতাও রয়েছে অর্থাৎ আপনি এ শব্দগুলি বলতে যা বোঝেন তার বাইরেও ভিন্ন অর্থে এগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে। তখন নিশ্চয়ই একটু খটকা লাগবে।

হ্যাঁ এ শব্দগুলি বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে পর্ণ ভিডিও ফুটেজের কোড নেম হিসেবে। যার একেকটি ফুটেজ বিক্রি হচ্ছে ১শ থেকে শুরু করে ৪শ টাকায়। মেমোরি কার্ড, পেন ড্রাইভ ইত্যাদি মাধ্যমে এগুলো হস্তান্তর হয়। যার প্রধান ক্রেতা স্কুল-কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীরা। আজ কাল প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমে নিয়মিতই এর ভয়াবহতা তুলে ধরা হচ্ছে। লেখা হচ্ছে বিস্তর। প্রশাসন মাঝে মাঝেই অভিযান পরিচালনা করছে। জব্দ করছে এ ধরনের ভিডিও সম্বলিত বিপুল পরিমাণ মেমোরি কার্ড-পেন ড্রাইভ। জেল-জরিমানাও কম করা হচ্ছে না। তথাপিও এর ব্যাপকতা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে।প্রশ্ন হল এই ভিডিও ফুটেজগুলির উৎস কি? এক কথায় এর উত্তর হল প্রেমের নামে বেলেল্লাপনায় মেতে ওঠা প্রেমিক প্রেমিকারাই এর মুল উৎস। লক্ষণীয় বিষয় হল; পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এ সব ভিডিও ফুটেজের একটিতেও জোর জবরদস্তি করে কেউ কাউকে এই ধরনের ভিডিও তৈরিতে বাধ্য করছে বলে অনুমিত হয়না। অর্থাৎ ফুটেজগুলিতে যাদের অংশগ্রহণ দেখা যায় তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই এ ধরণের কুকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। যা পরবর্তীতে কোন এক পক্ষ জেদের বসে বা ব্যবসায়িক স্বার্থে বাজারে ছেরে দিচ্ছে কখনো কখনো তৃতীয় কোন পক্ষ এই সব দৃশ্য গোপনে ক্যামেরা বন্দি করে বাজারে ছাড়ছে। মোট কথা যে সব পর্ণ ভিডিও ফুটেজ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে তা আমাদের সন্তানদের চরম অবক্ষয়কেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

ফুটেজগুলিতে অংশ নেয়া ছেলে-মেয়েরাও যেমন এ সমাজের অংশ। তেমনি যারা এর ক্রেতা তারাও এ সমাজেরই অংশ; এর সিংহভাগই আবার তরুণ প্রজন্ম। যারা স্বাধীনতার নামে আধুনিকতকতার দোহাই দিয়ে বেলেল্লাপনার শেষ সীমা অতিক্রম করে চলেছে নিত্য। আমরা যেনেও এর প্রতিকারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করে বরং তাদের সহযোগিতাই করে চলেছি দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন অপদার্থের মত।যে ছেলেটি তার মোবাইলে এই ভিডিও ফুটেজগুলি দেখে রাস্তায় বের হয় তার কাছে সামনে দিয়ে হেটে যাওয়া মেয়েটি আর ফুটেজে দেখা মেয়েটিকে একই মনে হবে এটাই স্বাভাবিক। আর তখন যে সে ঐ মেয়েটিকে হেনস্তা করতে চাইবে; ইভ টিজিং করবে এটাও কি স্বাভাবিক নয়?

আমাদের নাটক সিনেমা গানে তুমি-আমি ছাড়া কিছু নেই। মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেটাকে উস্কে দিচ্ছে আরও। ভাবখানা এমন যেন বন্ধু পাশে থাকলেই হল আর কারো প্রয়োজন নেই, বন্ধুত্ব মানেই প্রেম। প্রেমের জন্যই জীবন, আর প্রেম মানেই বেলেল্লাপনা। জীবনের আর কোন লক্ষই নেই!ঠিক একই ভাবে ইন্টারনেট মানেই ফেসবুক, ফেসবুক মানেই ফেক আইডি আর মিথ্যের ছড়াছড়ি। বন্ধুত্ব-প্রলোভন, প্রেম অতঃপর বাস্তবতার ঘায়ে রক্তাক্ত অন্তর। এরপরে নেশা। বলে রাখা ভাল, ফেসবুকেও আছে জ্ঞানগর্ভ অনেক ভাল ভাল পাতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল তার পাঠক সংখ্যা নেহায়েতই নগন্য।

অনলাইনের বিশাল তথ্য ভাণ্ডারের ধারে কাছেও ঘেঁষে না বেশিরভাগ অনলাইন এ্যক্টিভিষ্ট। এমনকি ব্লগ সম্পর্কেও বেশিরভাগেরই ধারনা নেই। অথচ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রন কমিশন(বিটিআরসি) প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার। এরা সারাদিন অনলাইনে কি করে? এ প্রশ্নের উত্তরই এই নিবন্ধের সারকথা। তারা যদি ব্লগ নিয়ে মেতে থাকত। মেধার অপচয় নয় চর্চায় মনোনিবেশ করত। তাহলে আজকের এই লেখার অবতারনাই হত না। আজকের শিক্ষিত তরুণ যদি অনলাইনের বিশাল তথ্যভাণ্ডারের সাথে পরিচিতই না হতে পারে। যদি সেখান থেকে তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে না পারে। সর্বোপরি বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদের সংযুক্তই করতে না পারে তাহলে তাদের অর্জিত শিক্ষাই যে এ দেশের জন্য বোঝা হয়ে দেখা দিবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এর জন্য কি আমরাই দায়ী নই? মধ্যবিত্ত সমাজের বেশির ভাগ অভিভাবকের অনলাইন সম্পর্কে সম্যক ধারনা নেই; সন্তানকে কি গাইডলাইন দিবেন। বরং সন্তানই তাকে শেখায় যতটুকু সে বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে শিখেছে। বলাই বাহুল্য বন্ধুদের কাছ থেকে সে সুস্থ ওয়েবসাইটের চেয়ে অসুস্থ ওয়েবসাইট আইডিই বেশি পেয়েছে। যার ফলে সে আসক্ত হয়ে পরছে অনলাইন পর্নগ্রাফিতে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা জার্নাল, ‘সাইকোলজি টুডে’র গবেষণাপত্রে বলা হয়; ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফিতে আসক্ত মাত্র বিশ বছরের তরুণ যুবকও প্রকৃত অর্থে স্বাভাবিক যৌনাচরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ফলে তারা একধরণের নপুংসক পুরুষে পরিণত হতে থাকে। ‘সাইকোলজি টুডে’র এই গবেষণাপত্র আমাদের একটি ভয়াবহ দুর্যোগের পূর্বাভাস দিচ্ছে। অবশ্য আমরা যদি তা অনুধাবনে সক্ষম হই।

আমরা সহজ বিষয়টি কেন ভুলে যাই? অবুঝ শিশুকে যেমন মা-বাবা তথা তার অভিভাবক গনই একটি ভাল স্কুলের সাথে-একটি ভাল পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। নয়ত তার পক্ষে কখনোই নিজে থেকে ভাল পরিবেশ খুঁজে নেয়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি অনলাইন জগতটাকে আপনার সন্তানের সম্মুখে খুলে দেয়ার ক্ষেত্রেও সঠিক পথটা বাতলে দেয়া কি আপনার কর্তব্য নয়? আমি অনেক অভিভাবকের কাছেই শুনি; সন্তান অনলাইনে পড়াশুনা করে। অনলাইনের তথ্যভাণ্ডার আপনার সন্তানকে সমৃদ্ধ করছে এ তো খুবই ভাল কথা। কিন্তু নিজে কি কখনো তার কাছে বসে জানার চেষ্টা করেছেন সে আদৌ কতটা সমৃদ্ধ হচ্ছে, নাকি নিজেকেই ক্ষয় করে চলেছে দিনকে দিন। আর অনলাইনে লেখাপড়া করতে কেন বদ্ধ ঘরের প্রয়োজন সে প্রশ্নটাও আপনার সন্তানের কাছে করুন। দেখুন সদত্তুর মেলে কিনা।
বর্তমান সময়ে নানা কারণেই আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেই; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাকে কেন মাল্টি মিডিয়া হতে হবে? এর সুফলটি কি, আর এর প্রয়োজনীয়তাই বা কি একটিবারও ভেবে দেখছি না। শ্রেণী শিক্ষক এসে ছাত্রের কান থেকে হেড ফোন খুলে দিচ্ছে ছাত্রের হুশ-ই নেই যে সে ক্লাসে। এ তো গেল একটি দিক।
আপনার কিশোর ছেলের হাতের মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ডটি ওপেন করুন। যা দেখছেন তা কি আপনি সমর্থন করেন? ইদানীং আরেকটি ভয়াবহ মানসিক রোগ দেখা দিয়েছে কিশোর কিশোরীদের মধ্যে তারা নিজেরাই নিছক আনন্দোচ্ছলে একে অপরের; এমনকি নিজেদের দেহের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অংশের ছবি তুলে বন্ধুদের এমএমএস করছে। এইসব ছবি এক সময় বেহাত হয়ে তারাই আবার এর দ্বারা ব্লাকমেইলের স্বীকার হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের নির্মল আনন্দের স্থানগুলো দখল করে নিয়েছে এই সব ভায়োলেন্স। আমরা কতটা খোজ রাখছি আমাদের অন্দরের?আমাদের মগজে ধরেছে পচন তাই সমস্যার মুলে গিয়ে সমাধান করতে পারছি না। নষ্ট হয়ে গেছি আমরা নিজেরাই। তাই সন্তানদের দিকে চোখ তুলে চাইতে পারি না। ফলে উচ্ছন্নে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম। যারা নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। এরাই কি একদিন আবার আমাদের ঘৃণা করবে না, অভিশাপ দিবে না, আমরা ওদের শেখাইনি বলে?

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী