লাল-নীল-সবুজ’ শৈশব এবং প্যারেন্টিং

ডা: সুষমা রেজা রাখী: আমার বাসা থেকে ঢাকা শিশুপার্কটা খুব কাছে। আমাদের বাচ্চা তিনটাকে নিয়ে প্রায়ই সেখানে যাওয়া হয়। এই ইট-পাথরের শহরটাতে ওদের খুব পছন্দের জায়গা এটা!

এখানে ঘোড়ায় চড়ার একটা রাইড আছে!

কিন্তু প্রতিবারই নির্দিষ্টভাবে এই রাইডটার কাছে আসলে আমার ভীষন মন খারাপ হয়ে যায়!

একেকজন বাচ্চা রাইডটাতে উঠেই যার যার পছন্দের ঘোড়াটা খুঁজতে শুরু করে! পড়িমড়ি করে সেটাতে উঠতে থাকে!
কী উত্তেজনা, কী ভাল লাগা ওদের চোখে মুখে! অদ্ভূত সুন্দর একটা দৃশ্য যেন!

কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি ঠিক এই সময়টাতে কী যেন একটা দুর্যোগ ঘটে যায় ‘কিছু কিছু’ অভিভাবক দের মাঝে! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এইসব বাবা- মাদের কিছু কমন ডায়ালগ থাকে এমন –

-‘যাও যাও আর একটু সামনে যাও বাবা! না না ওটা না, ওটা না! হ্যাঁ হ্যাঁ ঐ ‘সবুজ’ রং এর ঘোড়াটায় বস!’

-‘এই সন্টু,এই!!
নামো ঐ ঘোড়াটা থেকে, নামো বলছি! ‘পিচ্চি’ ঘোড়াটায় গিয়ে বসলা কেন?! সামনের ঐ ‘বড়’ ঘোড়াটায় যাও না বাবা! নামো নামো!
আরে! নামে না কেন ছেলেটা? এই সন্টু! এই”!!

উৎসাহী বাবা মায়ের অনেকে আবার সহ্য করতে না পেরে এগিয়ে যেয়ে নিজেরাই ঘোড়া বদলে দেন!!!

বাচ্চাগুলোর বিস্মিত চোখগুলোর মাঝে থাকে অবিশ্বাস! ওরা ভেবে পায়না ওদের ভুলটা আসলে কোথায়!

এই রাইডটাতেই মাঝে মাঝে কিছু ঘোড়ার গাড়ির মত কার্ট আছে।
দু একজন যারা ঘোড়া বাদ দিয়ে এগুলোতে চড়ে বসে তাদের অনেকের বাবা মা নিজেদের ছেলেমেয়েদের এমন বোকামীতে হয়ে যান বিস্মিত! ১০ টাকার টিকিটের এমন অপচয়ে পারলে তেড়ে এসে মেরে বসেন!

-“ঐ দেখ অবস্থা! একদম বাপের মত হইছে মেয়েটা(!!!!)! আস্তা একটা রামছাগল(!!!!!) নামো মা, নামো! দেখ তুমি! সবাই ঘোড়ায় চড়ছে!
আরে! তুই ওটাতে গিয়ে বসলি কি বুঝে?! নাম তাড়াতাড়ি! নাম!
কী??? নামবিনা? দাঁড়া বাসায় চল আজকে !”

বাবা-মা শিশু পার্ক এ ঘুরাতে এনেছেন! এরই মাঝে প্রমাণ হয়- ভালবাসার কোন কমতি নেই তাদের মাঝে! হয়তো ঘোরাঘুরিটা ঠিকই শেষ হবে আইসক্রিম, ফুচকা কিংবা ভালবাসার গ্যাস বেলুনে!

ঘটনাটা খুব ছোট! আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা বিগ ফ্যাট ঘটনাগুলোর ভীড়ে নিতান্তই ফ্যাকাশে!

কিন্তু শিশু পার্কের চোখ এড়িয়ে যাওয়া এই সামান্য একটা ঘটনা; একটা রাইড এর- ‘ছোট ঘোড়া নাকি বড় ঘোড়া’, ‘লাল ঘোড়া নাকি নীল ঘোড়া’ – তা নিয়ে বাচ্চাদের সাথে আমাদের এই দ্বন্দ্ব চোখে আঙুল দিয়ে আমাদেরকে কিছু সত্যের সামনে দাঁড় করায়!

আমরা অনেকেই যার খোঁজ রাখিনা –
…প্রচন্ড ভালবাসা বুকে নিয়েই নিজেদের অজান্তে আমরা খুব ‘প্ল্যানড’ ওয়েতে আমাদের বাচ্চাদের জীবনে ‘সিদ্ধান্ত’ নেয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতাটা নষ্ট করে ফেলি!

…আমরা অনেকে তাদের ‘আত্মমর্যাদাবোধ’ নষ্ট করি!’ নষ্ট করি তাদের ‘আত্মবিশ্বাস ‘!

…আমরা ওদেরকে অসুস্থ ‘প্রতিযোগিতা’টা শেখাই! হয়তো জানতেও রাজি থাকিনা ‘কেমন আছে ওরা? ‘আমরা ওদের বলি না-ছোট ঘোড়াটাতে বসাটায় দোষের কিছু নেই! ভাল থাকাটাই যে বড় কথা!

…ঘোড়া ফেলে কার্টগুলোতে চড়তে পারা, আমাদের ‘বাক্সের বাইরে’ ভাবতে জানা অসাধারণ বাচ্চাগুলোকে আমরা ধরে বেঁধে মূল স্রোতে টেনে নামিয়ে আনি! তাহলেই যেন এক নিশ্চিন্ত জীবন!

…সবচেয়ে ভয়াবহ হল আমাদের  ‘স্বপ্ন’ কেই ওদের ‘স্বপ্ন’ বলে বিশ্বাস করতে শেখাই!

আমাদের আশেপাশে অসংখ্য ‘ইঞ্জিনিয়ার’ এভাবেই ডাক্তার হয়ে রোগীর বুকে স্টেথো বসান, অনেক ছবির ক্যানভাস এভাবেই রং হারায়, কবিতার বইগুলো শব্দ!
৯ টা-৫ টার অফিস এ আমরা অন্যের স্বপ্নকে নিজের মেনে ‘বড়’ হই!
আমাদেরকে ‘সাফল্যের’ শেখানো পথে হাঁটতে দেখে কিছু মানুষ তৃপ্তির ঢেকুর তুলেন!

দোষ দেইনা আমাদের সেই সব ভালবাসার কাছের মানুষগুলোকে!

কারন হয়তো আজ থেকে অনেক অনেক অনেক বছর আগে গ্রামের কোন এক মেলায় – ‘লাল মাটির ঘোড়া নাকি নীল মাটির ঘোড়া’ অথবা ‘বড় ঘোড়া নাকি ছোট ঘোড়া’-র আদলে সেই একই প্রোগ্রামিংটা শুরু হয়েছিল!
একটি ছোট্ট শিশু তখনো অনেক ভরসায় শক্ত করে ধরে ছিল তার বাবার হাত!

আমার ৩২ বছরের জীবনে এই শিশুপার্কটার কোন পরিবর্তন দেখিনি আমি!সেই একই আছে যেমন ছিল আমার ছেলেবেলায়!

হ্যান্ডেল ভাঙা প্লেনটাতে খুশিমনে বসে থাকা শিশুটার হাসিটাতে তাও কোন অভিযোগ খুঁজে পাইনি কখনো!ওরা আমাদের মুখ ফুটে বলে না – ‘কবে চেঞ্জ হবে এইসব রাইডগুলো?’
ওরা একইভাবে আমাদের প্যারেন্টিং নিয়েও কখনো প্রশ্ন তুলে না!
যেমনটা তুলিনি আমরা!

একদিন পাইলট হতে চাওয়া এইসব ছোট্ট শিশুগুলোকে নিয়ে আমরা বাবা- মায়েরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কী নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছি ওরা যদি আসলেই তা জানত!!

বসে ভাবি – এর শেষটা আসলে কোথায়?

লেখকঃ

লেখকঃ রেসিডেন্ট – বি,এস,এম,এম,ইউ; চিফ ইন্সপিরেশনাল অফিসার-লাইফস্প্রিং


Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী