পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন

মানসুরা আখতার:

(কিছু বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। দয়া করে ব্যক্তিগত আক্রমণ হয়ে বিরত থাকুন)

সেলিনা পাঁচ বাড়িতে কাজ করে সাত হাজার টাকা আয় করে। সতীনের সংসার ছিলো। সেই স্বামীও দুই ছেলেমেয়ের জন্মের পর মরে যায়। মেয়েটা ক্লাস নাইনে উঠবার পর পার্টটাইম ভ্যানচালক প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যায়। বছর দুয়েক বাদে প্রেগন্যান্ট বৌকে মায়ের কাছে রেখে যায় বর। সেলিনা লোকের বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে নিয়ে যদ্দুর পারে মেয়ের সেবা করে। ডেলিভারি ডেট পার হয়ে যায়, লেবার পেইন নেই। কন্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে সেলিনা। লোকাল ডাক্তারের চেম্বারের সামনে সারাদিন পা ঝুলিয়ে সিরিয়ালে বসে থাকলো সাড়ে নয়মাসের প্রেগন্যান্ট মেয়ে। ডাক্তার দেখে জানালেন যে আট হাজার টাকা লাগবে সিজারিয়ান অপারেশনে। সেলিনার কাছে থাকা সর্বমোট দুই হাজার ইতোমধ্যে আল্ট্রাসনো আর যাতায়াত ভাড়ায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এক বাড়িওয়ালার রেফারেন্সে একজন দয়ালু ডাক্তারের খোঁজ পাওয়া গেলো, যিনি চার হাজার টাকায় বাকিতে সিজারিয়ান অপারেশনে রাজি হলেন। শুধু তাই নয়, পাশের ফার্মেসিতে বলে বাকিতে ওষুধের ব্যবস্থাও করে দিলেন। ডাক্তার বলে দিলেন যে প্রচুর পুষ্টিকর খাদ্য খাইয়ে মেয়ের শরীরের ঘাটতি পূরণ করতে, ব্লিডিং বেশি হয়েছে। নাতি কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরলো সেলিনা, কাঁধেচাপা ছ’হাজার টাকার ঋণ। উপায়ান্তর না দেখে বছর তিনেক আগে কন্যাকে বানিয়ে দেওয়া কানের দুল বেঁচে দিতে হলো। কন্যার বয়স যখন পনেরো দিন, তখনো সারা শরীর ব্যথা জরজর। জামাই এসে বৌ-বাচ্চাকে বাড়িতে নিয়ে গেলো। সেই সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে সেলিনা দেখে যে তার কন্যা একটি পেটিকোটের উপরে কেবল একটি সুতির ওড়না গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় বসে আছে। তার কপালে-গালে-বুকে মারের দাগ। কানের দুল বেঁচে আসার অপরাধে জামাই “ফকিরের বাচ্চা” কে মেরে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছে আর বাচ্চাকে রেখেছে নিজের কাছে। পরে মেম্বার-চেয়ারম্যান-উকিল-লোকাল গুণ্ডা ধরে সেলিনা তার কন্যার কোলে নাতিকে ফেরত এনে দেয়। মেয়েটি এখনো সেই স্বামীর সংসার করছে। প্রথম শিশুর বয়স ছয়, দ্বিতীয় দফায় অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ায় মেয়ে আবার মায়ের কাছে এসেছে।

কোনার কুঁড়েঘরে থাকতো হ্যাপি আর তার বাবা-মা। হ্যাপির বয়স তখন ছয়মাস। হ্যাপির বাপের গায়ের রং ফর্সা, হ্যাপির মা কালো। হ্যাপির বাপ সারা সকাল ঘুমায়, বিকালে রিকশা চালায়। হ্যাপির মা মাঝেমধ্যে ঠিকে ঝির কাজ করে, মাঝেমধ্যে কেবল কাতরায়। তার সিজারের সেলাই শুকানোর আগেই কাজে ফিরতে হয়েছিলো তাকে। বেশিরভাগ সময়ই হ্যাপিদের ঘরে খাবার থাকেনা। মাঝেমধ্যেই দুদ্দাড় শব্দ শোনা যায়, তারপর খানিকটা মার খেয়ে হ্যাপির মা দৌড়ে পালায়। এসবের পর পনেরো বছর পেরিয়ে গেছে। এক সন্ধ্যেয় পনেরো ষোলো বছরের এক মেয়ে এলো কাজের খোঁজে। সে হ্যাপি। তার মা আরো বারো বছর আগে মরে গেছে। সে সৎ মায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা অনাদরের “হ্যাপি!”

ক্ষণিকা আইনজীবী। প্রকৌশলী স্বামীর সাথে চার বছরের প্রেমময় সংসারে ফুলেল বার্তা নিয়ে এলো প্রথম সন্তানের আগমন বার্তা। প্রেগন্যান্সির সপ্তম মাসে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার জন্যে বাপের বাড়ি যায়। আর ফেরা হয়নি। স্বামীটি ঐ ছুটিতেই একজনের সঙ্গে প্রেম করে নিয়েছে। ক্ষণিকার সন্তান পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হয়ে নানাবাড়িতেই বড়ো হচ্ছে।

লিমা চিকিৎসক। অরুনিমা ব্যাংকার। শ্যামলি শিক্ষক। সকলেই উপার্জনক্ষম এবং স্বচ্ছল। কারো সন্তান জন্মের পর পোস্ট অপারেশন রুম থেকে রুগী এনে দেখা গেছে যে রুগির কেবিন আর বেডে আত্মীয়ের ছড়াছড়ি। কারো বা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধপাতি ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। কারো মা আর স্বামীর পছন্দের ডাক্তার আলাদা। কারো পুত্রসন্তান পছন্দ, কন্যার জন্ম হয়েছে। কারো শ্বশুরঘর এর লোকেরা একটুও খোঁজ নেয়না। কারো পরিবার সন্তানের স্নেহে মনযোগী হতে গিয়ে ভুলে যায় যে সদ্য প্রসূতি নারী আসলে একজন রুগী এবং তার যত্ন দরকার। কারো শরীরে ইনফেকশন হয়ে যায়, কারো মনে।

রাত বাড়ে। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের নীল রাত।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী