যেভাবে বারবার হেরে যেয়েও ঠিকই জিতে যায় তুপারা

নাসিমুন নাহারঃ

ফজরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে অঝোর ধারায় কাঁদছে তুপা।কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে যাচ্ছে।ওড়না মুখে চেপে ধরেও শব্দ বন্ধ করতে পারছে না সে ।আহ, কত শত দিন পরে বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে…………

‘সৃষ্টিকর্তা কেন তাকে এত ভালোবাসে?’ — এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না তুপা।জীবন তাকে নিয়ে ইচ্ছে মত খেলেছে—- ফুটবলের মত তাকে এই কোর্ট থেকে ঐ কোর্টে লাথি মেরেছে কত নিকটজন; সময়ের সাথে সাথে নিজেদের স্বার্থে – প্রয়োজনে।কিন্তু তুপার সৃষ্টিকর্তা কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি।তার কোন প্রার্থনা বিফলে যায়নি।অথচ সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য খুব ধার্মিক তো সে এখনও হয়ে ওঠেনি।তবে কেন স্রষ্টা এতটা ভালোবাসা তুপার জন্য বরাদ্দ করেছেন !

জীবনে একজনকেই মন, প্রাণ, সমস্ত স্বপ্ন, আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছে তুপা।ভালোবাসা দেবার ব্যাপারে কোন কার্পণ্য কিংবা হিসেব কষেনি কখনো।ভালোবাসার কাছ থেকেও ভালোবাসা ই পেয়েছিল, সত্যি।কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময় আর ভাগ্য তাদের সাপোর্ট করেনি।
ফলশ্রুতিতে প্রচন্ড ভালোবাসা ঢেকে যায় অভিমান, জিদ, ইগোতে। ভালোবাসা কনভার্ট হয়ে যায় ভয়াবহ ভুল বোঝাবুঝিতে।ফলাফল–অবধারিত দূরত্ব ।

কিন্তু ‘চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল’ কথাটা বই পুস্তকে শোভা বাড়ালেও বাস্তব জীবনে ঘটে ঠিক উল্টো । চোখের আড়াল থেকে মাথায় যে জন বসবাস করে তার প্রভাব হয় মারাত্নক।ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বছর শেষ হয়ে যায় ঠিকই। কিন্তু ভালোবাসা’রা সারা জীবনের জন্য থমকে থাকে।বাস্তবতার খাতিরে, পরিস্থিতির চাপে,কখনোবা শরীরের প্রয়োজনে(এই পয়েন্টটা অবশ্যই সবার জন্য প্রযোজ্য নয়) অনেকেই হয়তো আসে যায় জীবনে। কিন্তু মনের খোরাক কি আর মেটে ! ভালোবাসা কি আর সবাইকে দেয়া আর নেয়া সম্ভব হয় ?
এভাবেই জীবন কেটে যায় জীবনের নিয়মে।

তুপা হয়তো এই পৃথিবীতে ভীষন ভাগ্যবতীদের একজন ! জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে, কঠিনতম ভয়াবহ সংগ্রামের সময় পার হবার পরে “Sorry” “সব শেষ হয়ে গেল” “কি ভুল করেছি আমি” শুনতে পায় অনুশোচনায় দগ্ধ মানুষটির মুখে।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা ঘটে না।

তুপা যে ভুল ছিল না, তুপা যে অন্যায় করেনি, তুপা মুখ ফুটে বলতে না পেরে শুধু অভিমানী হয়ে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সমাজ সংসার কোন কিছুর পরোয়া না করে তুপা একা একাই যখন ভালোবাসার প্রতি সৎ থেকে গেছে যোজন যোজন দূরত্বে থেকেও—— এই উপলব্ধি যখন কুঁকড়ে দেয় একজন প্রবল প্রতাপ সম্পন্ন সিদ্ধান্তহীন রগচটা পুরুষকে;
তখন তুপার মতো শক্ত মনের মেয়েরও মায়া হয় ভীষন, শিশু সুলভ মনে হয় অত্যাচারী লোকটিকে।আহারে কতটা অসহায় হয়ে গেছে আজ মানুষটি।

শরীর থেকে শুরু করে তার আশেপাশের মানুষগুলো সময়ের সাথে নিজের চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে।ফলে তুপার কদর বেড়েছে হয়তো ! এটাও বুঝে তুপা।কিন্তু এখন তো আর তুপা বাচ্চা টিনএজার না।পৃথিবী দেখে ফেলা পরিপূর্ণ নারী আজ তুপা।তাই সে জানে চোখ যা দেখে তার পেছনে অদেখা বহু কিছু থাকে।

সাত বছর বহু লম্বা সময়।চাইলেও ফেরা সম্ভব নয়।বর্তমান জীবনের মানুষগুলোকে নিমিষেই ছুঁড়ে ফেলা যায় না অতীতের জন্য।কত মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে বর্তমানের সাথে।

তুপারা পারে না অবিবেচক হতে, নিজের নিশ্চিত নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভেবে তুপারা পারে না দুর্দান্ত স্বার্থপর নীতিহীন হতে।
তুপা জানে একজন আছেন।যিনি সব দেখছেন।
যিনি সব জানেন।তুপার গলা না কাঁপিয়ে চোখের পলক না ফেলে সশব্দে বলা “No” এর অর্থ মহান সৃষ্টিকর্তা জানেন।তিনি কখনোই তুপাকে ছেড়ে যাননি, যাবেনও না।আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন—- প্রবল বিশ্বাসে স্রষ্টাকে আঁকড়ে ধরে তুপা বরাবরের মতোই।

এভাবেই বারবার হেরে যেয়েও ঠিকই জিতে যায় তুপারা………..

লেখকঃ চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী