জাওয়াদ ও তার বাবা

নুসরাত জাহানঃ জাওয়াদের সাথে তার বাবার সম্পর্কটা একটু ব্যতিক্রম৷ জাওয়াদের অটিজম আছে এ ব্যপারটা নিয়ে শুরুর দিকে আমি যতটা ভেঙ্গে পড়ি জাওয়াদের বাবা ঠিক ততটাই স্ট্রং ছিলো ৷ জাওয়াদ কথা বলে না কিন্তু আমার চেয়ে তার বাবা বেশ ভালো বুঝেন জাওয়াদের প্রয়োজনগুলো ৷

রোযার মাস৷ সেই সাথে প্রচন্ড গরম পড়ছিলো ইংল্যান্ডে৷ জাওয়াদের বাবা দুপুরে কাজ থেকে ফিরলো৷ দরদর করে ঘামছে৷ এসে দেখে ছেলে বিরামহীন ভাবে কেঁদে চলছে৷ আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করে ওর মনটা অন্য দিকে ডাইভার্ট করাবো৷ আমাদের বাসার পাশে একটা পার্ক ছিলো৷ রোযা রেখে ভর দুপুরে প্রচন্ড রোদে জাওয়াদ কে পিঠের উপর নিয়ে রওনা দিলো পার্কের দিকে৷ উদ্দেশ্য একটাই, যদি কোনভাবে ছেলেটা একটু আনন্দ পায় ৷

জাওয়াদ জাম্প করতে খুব পছন্দ করে৷ এটা তার বিনোদনের একটা অংশ৷ এখানে এক বাসায় বেড়াতে গিয়ে জাওয়াদের বাবা আবিষ্কার করলো জাওয়াদ তাদের বাগানে রাখা ট্রাম্পোলিনে লাফিয়ে খুব মজা পাচ্ছে৷ বাসায় এসে মনস্হির করে ফেললো বাগান আছে এরকম একটা বাসা পেলে জাওয়াদের জন্য ট্রাম্পোলিন কিনবেই৷ আমি খুব একটা সায় দেইনি কারন অতীতে জাওয়াদের জন্য যতগুলো খেলনা কিনেছি তার সবটাই বাক্সবন্দী অবস্হায় পড়েছিলো৷ অটিস্টিক বাচ্চারা কোন কিছুর প্রতি মনযোগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনা৷ খেলনাগুলোর প্রতি জাওয়াদের আগ্রহ ছিলো কেবল কিছু মিনিট বা ঘন্টার মাত্র৷

আমরা নতুন বাসায় উঠলাম ২০১৬ তে৷ বাসার পিছনে প্রশস্ত বাগান৷ একদিন কুরিয়ারে পার্সেল আসলো৷ খুলে দেখি ট্রাম্পোলিন!! জাওয়াদ তখন স্কুলে৷ ট্রাম্পোলিনটা এসেম্বল করে রাখা হলো৷ জাওয়াদ স্কুল থেকে ফিরলো৷ তার বাবা তাকে নিয়ে বাগানে গেলেন৷ ছেলে এক ঝলক দেখেই দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়লো ট্রাম্পোলিনের উপর৷ জাওয়াদ অসম্ভব আনন্দে খিলখিল করে হাসছে আর লাফাচ্ছে৷ জাওয়াদের বাবা চশমার ফাঁক দিয়ে মুগ্ধ হয়ে ছেলের আনন্দ দেখছেন৷ আর আমি চোখ ভর্তি পানি নিয়ে বাবা আর ছেলেকে দেখছিলাম!!

জাওয়াদের সিভিয়ার লেভেলের ফুড এলার্জি আছে৷ অনেক খাবার সে খেতে পারেনা৷ ডিম মাছ এগুলো নিষিদ্ধ ওর জন্য৷ ফ্রুটস আর মাংস খেতে খুব ভালোবাসে সে৷ আমার সংসার তখন আরেকটু বড় হলো৷ তন্মধ্যে আমার মেয়ের জন্ম হয়৷ একদিন জাওয়াদের বাবা নিজ উদ্যোগে আরেকটা ফ্রিজ কিনে ফেললো৷ আমাকে বললো এ ফ্রিজটা ওর পছন্দের খাবার দাবার দিয়ে যেন ভর্তি থাকে৷ আমার ছেলেটা কথা বলেনা৷ ওর কি খেতে ইচ্ছে করে সেটা যেহেতু সে বলতে পারেনা তাই ওর সব পছন্দের খাবার স্টকে রাখবো যেন ও সেটার অভাব বোধ করার আগেই আমরা ওর সামনে রাখতে পারি৷

আমি বাবা কে পাইনি৷ জাওয়াদের প্রতি তার বাবার সীমাহীন ভালোবাসা দেখে বুঝেছিলাম বাবারা কেমন হয়!!!

জাওয়াদকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করার জন্য বাস আসে৷ একদিন আমি বাইরে, জাওয়াদের বাবা দুপুরে মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে চোখ লেগে এলো কখন টের পায়নি৷ ঘুম ভাঙ্গলো প্রচন্ড শব্দে কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে৷ উঠে গিয়ে দেখে জাওয়াদের স্কুল বাস ড্রাইভার খুব রাগান্বিত ও এগ্রেসিভ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ দেখা মাত্রই কথা দিয়ে একহাত নিলো সে৷ প্রচন্ড ঝাড়ির পর ঝাড়ি মেরে চললো সে৷ কেন জাওয়াদের বাবা গাড়ির হর্ন শুনেনি জাওয়াদকে গাড়ি থেকে পিক করার জন্য আসে নি৷ তারা নাকি পাঁচ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো!

বাসায় ফিরে দেখি তার বাবার মন খারাপ৷ জিজ্ঞাসা করলাম কি হলো৷ সব শুনে বললাম উনি কেন ঝাড়ি শুনে গেলেন!!! উল্টো কিছু কথা কেন শুনিয়ে দিলেন না!!! জবাবে জাওয়াদের বাবা বললো- থাক বাদ দাও! আমার ছেলেটা কথা বলতে পারে না৷ আজকে আমি তাকে দুটো কথা শুনাতে পারতাম কিন্তু কাল যদি সে আমার ছেলের কোন ক্ষতি করে, তাকে মারে, কষ্ট দেয় তবে আমার ছেলেটা তো এসে বলতেও পারবে না৷ আমার অপমান আমি মেনে নিতে পারবো কিন্তু আমার ছেলে কারও দ্বারা কষ্ট পাক এটা আমি সহ্য করতে পারবো না।

একটা অন্য রকম অনুভূতি কাজ করছিলো তখন৷ আমার ছেলেটা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান আলহামদুলিল্লাহ কারণ তার এমন একজন বাবা আছে!!

প্রচন্ড জ্বরে জাওয়াদ বিছানায় কাতরাচ্ছে৷ একজন মানুষ পরেরদিন ভোরে কাজে যেতে হবে জেনেও জাওয়াদের মাথার পাশে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেয়৷ সে জাওয়াদের বাবা!

বাংলাদেশে যাচ্ছি৷ বারো তেরো ঘন্টার জার্নিতে জাওয়াদ মারাত্মক রকমের রেস্টলেস যা সামনে পিছনে বেশিরভাগ যাত্রীদের অসুবিধার কারণ হয়ে উঠছিলো৷ একজন মানুষ জাওয়াদকে নিয়ে প্লেনের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়াচ্ছেন যেন ছেলেটা বোর ফিল না করে৷ থেকে থেকে এর কাছে ওর কাছে বিনম্রভাবে ক্ষমা চাইছেন অসুবিধার কারণ হবার জন্য৷ তিনি জাওয়াদের বাবা!!

জাওয়াদ কে নিয়ে একা দেশে যাই একবার৷ অফিস থেকে বাসায় এসে জাওয়াদকে দেখছেন না, রাতে ছেলের গায়ের গন্ধ শুঁকে ঘুমাতে পারছেন না৷ এই কষ্ট নিতে পারেনি একজন মানুষ৷ পনেরো দিন যেতে না যেতেই বসকে ‘চললাম’ বলে টিকেট করে প্লেনে উঠে পড়লো তিনি৷ সে জাওয়াদের বাবা!!!

আমি একবার হাসতে হাসতে বললাম তোমার ছেলে তোমাকে বাবা ডাকে না, কথা বলে না তারপরও ছেলেকে ছাড়া পনেরোটা দিন টিকতে পারলে না৷ জবাবে উনি বললেন- আমার ছেলে আমাকে বাবা না ডাকুক! ও আমার চোখের সামনে আছে এটাই আমার জন্য অনেক কিছু !

এত ভালোবাসার মত শক্তি যে বাবার আছে সেই ছেলে নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান !!!

জাওয়াদ নিশ্চিত একদিন এ ভালোবাসার কথা জানবে৷ এপারে না হলেও ওপারে তো বটেই ……

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী