শিক্ষার্থীকে শিক্ষকরা কি কি শাস্তি দিতে পারবেন?

আলপনা তালুকদারঃ

বিএড – এর ভাইভা নিচ্ছি। এক স্কুলশিক্ষিকা ছাত্রীকে প্রশ্ন করলাম,
“শিক্ষার্থীকে মারা উচিত নয় – একথা কি ঠিক বলে আপনি মনে করেন?” উত্তরে শিক্ষিকা বললেন, ” জ্বি, মনে করি। তবে কিছু কিছু শিক্ষার্থী এতই দুষ্টু যে ওদের মারাই উচিত।”

শুনে আমি অবাক ও হতাশ হলাম। কারণ বিএড কোর্স শেষ করে একজন শিক্ষক চলে যাচ্ছেন; আমি ক্লাসে অসংখ্যবার তাঁকে (তাঁদেরকে) বলেছি, কোনভাবেই কোন শিক্ষার্থীকে মারা বা বিশ্রী ভাষায় গালি দেয়া যাবে না। আইনগতভাবেও শিক্ষার্থী নির্যাতন নিষিদ্ধ। তারপরেও তাঁদের মানসিকতা বদলায়নি। কেন?

আমাদের এক শিক্ষক একটু বিরক্ত হয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, “কেন মারবেন ম্যাডাম? শিক্ষার্থীরা ছোট। তারা আপনাকে পাল্টে মারতে পারবে না বলে?” আমাদের মূল সমস্যাটা এখানে। শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মূলত দূর্বল প্রতিপক্ষ শিশুর উপর সবল শিক্ষকের অত্যাচার। এই অসম শক্তির সংঘাত যুগে যুগে হয়ে এসেছে, হচ্ছে, হবে। এ সংঘাত শাসক ও শোষিত, দূর্বল ও সবল, ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীনের মধ্যে বিরাজমান।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘এবিউজার’ ও ‘ভিকটিম’ – দুই পক্ষই অনেক সময় বুঝতে পারেনা যে তারা একটি অসম ও অস্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে আছে। না বুঝলেও এসব নির্যাতনের ফলে ভিকটিমের বা শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পরিমাণ কমে না।

সরকারী নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বহু স্কুলে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী নির্যাতন চলছে। স্কুলের শিক্ষকদের মারমুখী আচরণ কিছুতেই থামছে না। প্রায়ই শিক্ষকরা শিশুদের মারছেন, ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখছেন, নোংরা ভাষায় গালি দিচ্ছেন, ইত্যাদি। প্রায়ই মিডিয়াতে এসব ঘটনার খবর আসছে। যদিও এসব ঘটনা মিডিয়াতে যতটা আসছে, বাস্তবে তা ঘটছে তার চেয়ে অনেক বেশী।

বিখ্যাত দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদদের মতে,
শিখবে আনন্দের সাথে। ফলে তাদের দেহ-মনের পরিপূর্ণ বিকাশ হবে, শিশু তার পরিবেশের সাথে যথাযথভাবে খাপ খাওয়াতে পারবে, সে সুখী হবে, প্রকৃত মানুষ হবে।

শিক্ষক কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের ফলে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আহত হয়, মানসিক নির্যাতনের ফলে শিশুরা হতাশা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, স্নেহবঞ্চনা, দুশ্চিন্তা… এসবে ভোগে। এর ফলে শিশুদের মনে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি হয় যা থেকে নানা মানসিক সমস্যা, যেমন- দূর্বল ব্যক্তিত্ব, পরনির্ভরশীলতা, নানা পরিবেশ ও মানুষের সাথে সঙ্গতিবিধানের অক্ষমতা, হিংস্র, আগ্রাসী ও অপরাধপ্রবণ মনোভাব, কাউকে বিশ্বাস করতে বা ভালবাসতে না পারা, ভঙ্গুর মানসিকতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি হতে পারে। মানসিক নির্যাতন থেকে অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা, যেমন – ট্রমা, বিষন্নতা, এংজাইটি, আর্থারাইটিসের মত কঠিণ অসুখও হতে পারে।

যেসব শিশুরা বাবামা বা শিক্ষক কর্তৃক নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে বড় হয়, সেসব শিশুরা বাবামা, শিক্ষক বা বড়দের কাছ থেকে ওসব আচরণ অনুকরণ করে। পরবর্তী জীবনে তারাও স্ত্রী, সন্তান, কাজের লোক বা অধীনস্তদের সাথে একই আচরণ করে। এভাবে বংশ পরম্পরায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের প্রভাব চলতে থাকে চক্রাকারে।

শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করলে শিশুদের যে সীমাহীন ক্ষতি হয় তা আমরা অনেকেই জানিনা। যেসব ছাত্ররা শিক্ষকের মার খায়, তারা নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক মনে করে। তারা শিক্ষককে সম্মান করতে শেখেনা। পরে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ার সময় শিক্ষকদের সাথে দূর্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনা। শিক্ষকদের সাথে তর্ক করা, তাঁদেরকে অপমান করা, তাঁদেরকে খুন করা, তাঁদের সামনে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা, বেয়াদবি করা, শিক্ষকদের ক্ষতি করা, চুরি-জুলুম- নির্যাতন করা, হুমকি দেয়া, ইত্যাদি তাদের কাছে অন্যায় বলে মনে হয়না।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জন্য ক্ষতিকর, এমন সব আচরণ পরিহার করাতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে বিশেষ প্রয়োজনে নিম্নলিখিত মনোবিজ্ঞানসম্মত শাস্তিগুলো দিতে পারেন।

শারীরিক ও মানসিক শাস্তিঃ

১. শ্রেণীর কাজ বা বাড়ীর কাজ বেশী প্রদান;

২. শ্রেণীকক্ষের অভ্যন্তরে স্বল্পসময় দাঁড় করিয়ে রাখা;

৩. টিফিনের সময় বা ছুটির পর কিছু সময় স্কুলে আটকে রেখে কোন পড়া করিয়ে নেওয়া.. ইত্যাদি।

মানসিক শাস্তিঃ

১. চক্ষু শাসনের প্রবর্তন ( রাগী চোখে তাকানো বা চোখে চোখে রাখা);

২.দৈহিক অঙ্গভঙ্গীর শাসন ( যেমন – দুষ্টামী করলে রাগী চোখে তাকিয়ে শিক্ষার্থীর কাছে যাওয়া);

৩. কণ্ঠস্বরের শাসন ( যেমন – দোষ করলে রাগী গলায় কথা বলা, ভাল করলে মধুর স্বরে প্রশংসা করা );

৪. মনোভাবের পরিবর্তনগত শাসন ( অন্যায় করলে শিক্ষার্থীকে বোঝানো যে তোমাকে যেমন ভাবতাম, তুমি তারচেয়ে দুষ্টু বা ভাল করলে প্রশংসাসূচক মনোভাব দেখানো );

৫. স্নেহপ্রাপ্তি বা পুরস্কারপ্রাপ্তি বঞ্চিতকরণ ( যেমন – শিক্ষার্থীকে বোঝানো যে, তুমি দুষ্টু, তাই আমি তোমাকে আর ভালবাসবনা);

৬.সঙ্গী বা সহপাঠীর পুনর্বিন্যাসকরণ ( অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর সহায়তায় দুষ্টামী করে বা খারাপ বন্ধুর সঙ্গের কারণে খারাপ হয়। তখন সঙ্গী পুনর্বিন্যাস করা জরুরী। কখনও দূর্বল ছাত্রকে ভাল ছাত্রের সাথে দলে কাজ করতে দিলে দূর্বল ছাত্র ভাল শেখে) ;

৭. পরীক্ষাভীতির প্রয়োগ ( শিক্ষার্থীকে মনে করিয়ে দেয়া যে না পড়লে বা শিখলে পরীক্ষায় খারাপ করবে);

৮. ভর্ৎসনা করা ও নির্দেশনা প্রদান, ইত্যাদি।

তবে অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষার্থীকে প্রতিপক্ষ না ভেবে তার প্রতি সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও তার শারীরিক, মানসিক পরিপক্কতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদে ন্যূনতম শাস্তি দেয়া যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষককে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে –

* শাস্তির প্রকৃতি শিক্ষার্থীর অপরাধের প্রেক্ষিতে নির্ধারণ করতে হবে। ছোটখাট অপরাধের জন্য সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেই চলে। গুরুতর অপরাধের শাস্তি অবশ্যই কঠোর বা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী হবে।

* শাস্তি হবে পরিমিত কারণ শিক্ষার্থী শিক্ষকের প্রতিপক্ষ নয়।

* শাস্তির বিধান হবে নমনীয়। কারণ শিক্ষার্থীরা চোর, ডাকাত বা সন্ত্রাসী শ্রেণীভুক্ত নয়।

* গুরুতর অপরাধের শাস্তি হবে দৃষ্টান্তমূলক যাতে তেমন অপরাধ আর কেউ না করে বা করতে ভয় পায়। এক্ষেত্রে শিক্ষকের নমনীয় হবার সুযোগ নেই।

* জ্ঞানচর্চার বিশৃঙ্খলাকারীর শাস্তি হবে উন্মুক্ত বা সবার প্রত্যক্ষণযোগ্য, যাতে তা দেখে বাকী শিক্ষার্থীরা সাবধান হতে পারে।

* শিক্ষাঙ্গনে শাস্তির বিধান ক্রোধবর্জিত অবস্থায় প্রবর্তিত হবে যাতে শিক্ষক রাগের মাথায় শিক্ষার্থীকে অননুমোদিত শাস্তি দিয়ে না ফেলেন।

* শাস্তিদানের পর কখনও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা যাবেনা। তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। কেননা তাকেই শাস্তিদানের দায়িত্ব দেয়া যায় যিনি আবার স্নেহের পরশে শিক্ষার্থীকে সিক্ত করেন।

* বিদ্যালয়ে বা যেকোন শিক্ষাঙ্গনে শাস্তির উদ্দেশ্য হবে সংশোধনমূলক। শিক্ষার্থী কোন ভুল করলে তা শুধরে দেওয়াই মূল বিবেচ্য।

* শিক্ষক মনস্তাত্ত্বিক ভাবধারায় শিক্ষার্থীদের মন জয় করবেন। আবার প্রয়োজনে শাসন করবেন, শাস্তি দিবেন কিন্তু কখনোই সীমা লঙ্ঘন করবেননা।

* শুধু শাস্তি দিলেই হবেনা, শিক্ষার্থীকে নির্দেশনা দিয়ে সংশোধনের সুযোগ ও দিতে হবে। শিক্ষার্থী সংশোধিত হলে মানসিক পুরষ্কার ও দিতে হবে যাতে সে তার শাস্তির সুফল বুঝতে পারে।

* গবেষণায় প্রমাণিত, শারীরিক শাস্তির চেয়ে মানসিক শাস্তি বেশী ফলপ্রসু। তাই শারীরিক শাস্তিদানের চেয়ে মানসিক শাস্তিদানের প্রতি শিক্ষকের আগ্রহ বেশী থাকা উচিত।

গবেষণায় প্রমাণিত, শিক্ষার্থীর শিখণে শাস্তির চেয়ে পুরষ্কার বেশী ফলপ্রসু। তাই শাস্তির পরিবর্তে বস্তুগত পুরষ্কার ( যেমন – বই, খেলনা, পদক, ক্রেস্ট, কলম, বৃত্তি, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ,… ইত্যাদি দেয়া) এবং অবস্তুগত বা মানসিক পুরষ্কার (যেমন – প্রশংসাসূচক বাক্য – খুব ভাল, চমৎকার, অসাধারণ, অভিনন্দন, ধন্যবাদ, সুন্দর, ভাল বলেছ বা করেছ, আরো ভাল করবে,.. এসব বলা) দেয়া বেশী ভাল।

বস্তুগত পুরষ্কারের চেয়ে অবস্তুগত পুরষ্কার শিক্ষার্থীদেরকে কোনকিছু শিখতে বা পড়তে বেশী উদ্বুদ্ধ, আত্মসচেতন ও আন্তরিকভাবে আগ্রহী করে তোলে। তাই শিক্ষকদের উচিত, শিক্ষার্থীদেরকে অবস্তুগত বা মানসিক পুরষ্কার বেশী দেয়া। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাজে স্বাধীনতা দান, বার বার অনুশীলন করানো ও মুখস্থ না করিয়ে বুঝে পড়াতে পারলে তারা ভাল শেখে।

শেষকথাঃ একলব্য তাঁর গুরুর আদেশে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল কেটে গুরু দ্রোনাচার্যকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে উপহার দিয়েছিলেন। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, একজন ছাত্রের কাছে একজন শিক্ষকের মর্যাদা কত ব্যাপক। আবার ছাত্রদের বাঁচাতে ড. জোহা নিজের বুকে গুলি খেয়েছিলেন। এ থেকে জানা যায় ছাত্রদের মঙ্গল একজন শিক্ষকের কাছে কত প্রিয়।

আমাদের ছাত্রদের হীন মানসিকতা তৈরীর পেছনে শিক্ষকদের নির্যাতন দায়ী। তাছাড়া ছাত্রদের ব্যবহার করে শিক্ষকরা যখন নানা হীন সুবিধা আদায় করেন, তখন তাঁরা ছাত্রদের তোয়াজ করতে বাধ্য হন, ছাত্রদের নানা অন্যায় আচরণ ও অপরাধ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে বাধ্য হন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার জন্য প্রেষণা সৃষ্টি করা যায়। উপদেশনা, নির্দেশনা দিয়ে শিক্ষার্থীর ত্রুটিপূর্ণ আচরণ সংশোধন করা যায়, কোন শিক্ষার্থী পড়া না পারলে বা কম পারলে বিশেষ যত্ন নিয়ে শেখানো যায়। শিক্ষাদানের দক্ষতা দিয়ে বা শিক্ষকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দিয়ে শ্রেণী নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শিক্ষকের উদার,সৎ, নির্লোভ, দয়ালু মানসিকতা দিয়ে শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীর বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের মনে বাবামার আসন অর্জন করা যায়। শিক্ষার্থী অপরাধ করলে কঠোরভাবে তার প্রতিবাদ ও প্রতিকার করে তার আচরণ শুধরে দিয়ে তাকে সুপথে আনা যায়। “মানুষ গড়ার কারিগর” হওয়া অত সহজ নয়।

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী