শৈশব স্মৃতি-১

মেহেরুন্নেছাঃ
হায় শৈশব! হায় বাল্যস্মৃতি! দিনগুলো আমায় আজো নস্টালজিক করে তোলে! পড়ন্ত বিকেলে কিংবা অলস দুপুরে প্রতিনিয়ত স্মৃতি কাতরতায় ভুগি। মাতুলালয়ে জন্ম আমার।নানার বাড়ি, মধুর হাঁড়ি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানার বাড়ি বেড়াতে আসতাম মাস খানিকের জন্য! নানুর মুখেই শুনেছি আনোয়ারা, আবদুল্লাহ উপন্যাস এবং বিষাদসিন্ধুর কাহিনী। ভারতবর্ষের ইতিহাস, মোগল সম্রাটদের কাহিনী কিংবা সুলতানা রাজিয়ার কথা নানুর কাছ থেকেই শোনা।তবে নানার কাছ থেকে বেশি শুনতে চাইতাম নবী- রাসূলদের কাহিনী।

নানার বাড়ি এবং দাদার বাড়ি পাশাপাশি দুটি গ্রাম।দুই বাড়িতেই ছিল অবাধ বিচরন। কত খেলাধূলা, কত আনন্দ! শুকনো ধান(নারা) ক্ষেতে গোল্লাছুট, উঠানে বউছি, কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা! গ্রামের ওয়াজ-মাহফিল এখনো কানে বাজে।রাতের আকাশ সবসময় আমাকে টানে।কখনো তারা ভরা আকাশ অথবা কখনো মেঘে ঢাকা আকাশ! ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক! পুকুরের দিকে তাকালে কি অন্ধকার! ভয় লাগত!

মনে পড়ে উঠানে ধান মাড়াইয়ের দৃশ্য।সবচেয়ে ভালো লাগত মাঠের ধান কাটার শেষ দিনের( দানি উঠার) উৎসব! সেদিন যাদের ধান নেয়া শেষ তাদের ঘরে বাড়ির সবাইকে দাওয়াত করা হতো। সবচেয়ে আকর্ষনীয় খাবার ছিল খেজুর গুড় দিয়ে পাকানো ছড়া পিঠা; যেটা আমাদের দেশে শেয়াই পিঠা নামে পরিচিত।দানি উঠার দিন মিষ্টান্ন হিসেবে এই পিঠা খাওয়ানো হতো! শখ ছিলো বড়শি দিয়ে মাছ ধরা।
পুকুরে কত যে পুঁটি মাছ বড়শি দিয়ে ধরেছি!

মাঝে মাঝে বর্ষাতেও গ্রামে যেতাম! তখন নানুর সাথে পালকী ছইয়ের নৌকায় করে বেড়ানোর মজাই ছিলো অন্যরকম! নৌকায় নারকেল ও কইমাছ দিয়ে রান্না করা শাপলা তরকারি দিয়ে ভাত খেতাম! আহ্! কি যে মুখরোচক ছিলো সে খাবার! নৌকায় ভাত খাওয়ার নিটোল আনন্দ আর পাবো কিনা জানিনা।বর্ষাকালে মাঠের পানিতে কারেন্ট জাল পাতা, আনতা পাতা, ধর্ম জাল দিয়ে মাছ ধরা কিংবা খাল দিয়ে পাল তুলে মাল বোঝাই বড় বড় নৌকা যাওয়ার দৃশ্য, বড় জাল দিয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য— আজো চোখে ভাসে।শাপলা- শালুক ভরা খাল- বিলের অপার সৌন্দর্য দেয় বর্ষাকে লাস্যময়ীতা!

আজ জীবনের এ পর্যায়ে এসে এসবই কেবল বাল্যের মধুময় স্মৃতি! যেনো বেঁচে থাকার রসদ! এটাইতো আমার শেকড়। বারে বারে আমায় পিছু ডাকে।

আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন শৈশব দিতে পেরেছি?? ইট- কাঠ-পাথরে ঘেরা নাগরিকতার বেষ্টনীতে আবদ্ধ অনলাইনে ডুবে থাকা এ প্রজন্ম কি জীবনানন্দের বাংলাকে চেনে?? পঞ্চকবির বাংলাকে
চেনে?? আমাদের যে চেনাতেই হবে! প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম কখনই ধর্মান্ধ হবেনা, সাম্প্রদায়িক হবেনা!

আসুন আমরা সবাই আমাদের সন্তানদের জীবন গড়ার নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না করে বাংলার প্রকৃতিকে চেনাই! নিজের দেশ মাতৃকাকে চেনাই। কারণ, এমন দেশটি কোথাও
খুঁজে পাবে নাকো তারা!

এই দেশ! এই মাটি! এই আমার জন্মভূমি চিরচেনা বাংলা! ও আমার দেশ, বড্ড ভালোবাসি তোমায়! তাই যেনো অজান্তেই আওড়ে চলি—

আবার আসিব ফিরে, ধান সিঁড়িটির তীরে–
এই বাংলায়,
হয়তো মানুষ নয়—হয়তোবা শঙ্খচিল
শালিখের বেশে ;

চলবে…।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক,  উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী