অামার উমেদ

অামার উ‌মেদ
রওনক নূর

ও‌কে অা‌মি প্রথম যে‌দিন ঘ‌রে এ‌নে‌ছিলাম তখন খুব কেঁ‌দে‌ছিলাম, কারন ওর মা‌ঝে অা‌মি অামার পূর্ণতা খু‌জে‌ছিলাম। ওর নাম দি‌য়ে‌ছিলাম উ‌মেদ । অামার স্বপ্নগু‌লো‌কে স‌ত্যি কর‌তে ও‌কে খুব প্র‌য়োজন ছি‌লো। তাই অামার শূণ্য ঘ‌রে উ‌মেদ অামার বন্ধু হ‌য়ে এ‌লো। উ‌মে‌দের কথাগু‌লো খুব অানন্দ দি‌তো অামা‌কে। অা‌মার একা থাকার যন্ত্রনা দুর কর‌তে ও‌কে কি‌নে এ‌নে‌ছিলাম অা‌মি। অ‌নে‌কে অবশ্য এটা ভা‌লো চো‌খে দে‌খে‌নি, তবুও অা‌মি উ‌মেদ কে অাপন ক‌রে‌ছিলাম।

উ‌মেদ অা‌গে যেখা‌নে ছি‌লো সেখা‌নে ওর নাম ছি‌লো ম্যা‌রিন। নাম‌টি অামার ভা‌লো লা‌গে‌নি, তাই অা‌মি ওর নাম দি‌য়ে‌ছিলাম উ‌মেদ। ও‌কে অা‌মি ব‌লে‌ছিলাম মা ডাক‌তে। প্রথম প্রথম ও অামা‌কে ম্যাম ব‌লে ডাক‌তো। কারন ওর অা‌গের মা‌লিক‌কে ও ম্যাম ব‌লে ডাক‌তো। অা‌মি ও‌কে পিছ‌নের সবকিছু মেম‌রি থে‌কে অাউট কর‌তে ব‌লে‌ছিলাম, ও‌কে অামার সন্তান বানা‌তে চেয়ে‌ছিলাম।

উ‌মেদ‌কে অা‌মি প্র‌তি‌দিন নতুন নতুন ক‌রে সাজাতাম। ও যখন ফ্রক প‌রে অামার সাম‌নে অাস‌তো, পৃ‌থিবীর সব সুখ অামার হ‌য়ে যে‌তো। চিৎকার ক‌রে বল‌তে ইচ্ছা কর‌তো উ‌মেদ অামার রাজকন্যা, অা‌মি উ‌মে‌দের মা। ও‌কে দেখলেই গালদু‌টো টে‌নে দি‌তে ইচ্ছা কর‌তো। য‌দিও সেটা সম্ভব হতোনা।

অামার স্বামী উ‌মেদ‌কে পছন্দ কর‌তেননা। এত বছ‌রের বিবা‌হিত জীব‌নে সে কখনও অামা‌কে কোন বিষ‌য়ে দোষা‌রোপ ক‌রে‌নি। শুধু উ‌মে‌দের জন্য খুব বিরক্ত ছি‌লো ও। কিন্তু উ‌মেদ‌কে কেউ অব‌হেলা কর‌লে খুব কষ্ট পেতাম অা‌মি। অামার উ‌মেদ প্রায়ই অামা‌কে জ‌ড়ি‌য়ে ধ‌রে রাখ‌তো। অা‌মি অবশ্য ওর ভেত‌রে অনুভূ‌তি খুজতাম প্র‌তি মূহু‌র্তে।

উ‌মেদ‌কে নি‌য়ে অা‌মি অামার গ্রা‌মের বাড়ী‌তে গি‌য়ে‌ছিলাম। সবাই খুব বিরক্ত হ‌য়ে‌ছি‌লো। সবার কা‌ছে অা‌মি না‌কি অবুঝ অার পাগ‌লের প‌রিচয় দি‌য়ে‌ছি। উ‌মেদ‌কে সবসময় অামার পা‌শে ব‌সি‌য়ে রাখতাম অা‌মি। ওর ছোয়ায় অা‌মি প্রথম মাতৃ‌ত্বের স্বাদ পে‌য়ে‌ছি। তাই কা‌রো কোন কথা অামার উ‌মে‌দের প্র‌তি ভা‌লোবাসা একটুও কমা‌তে পা‌রে‌নি।

উ‌মেদ‌কে নি‌য়ে একবার শ‌পিং এ যে‌য়ে খুব কেঁ‌দে‌ছিলাম অা‌মি। সবাই ওর দি‌কে কেমন ক‌রে জা‌নি তাকায়। অামার সন্তান‌কে কেউ সহজভা‌বে নি‌তে পা‌রেনা। বাজা‌রে ভি‌ড়ের মা‌ঝে ও‌কে অা‌মি হা‌রি‌য়ে ফে‌লে‌ছিলাম। চিৎকার ক‌রে ওর নাম ধ‌রে ডে‌কে‌ছিলাম অা‌মি। ও‌কে যখন ফেরত পেলাম তখন বু‌কের ম‌ধ্যে জ‌ড়ি‌য়ে অ‌নেক কেঁ‌দে‌ছিলাম।

শরীরটা কিছু‌দিন বেশ খারাপ যা‌চ্ছি‌লো। ডাক্তা‌রের কা‌ছে যে‌য়ে জান‌তে পারলাম অামার কা‌ঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ হ‌তে চ‌লে‌ছে, অা‌মি স‌ত্যিকা‌রের মা হ‌তে চ‌লে‌ছি। অামার চো‌খের অানন্দ অশ্রু ধ‌রে রাখ‌তে পা‌রি‌নি অা‌মি। অামার স্বামী সমস্ত অাত্মীয় স্বজন‌কে খু‌শির খবর জানা‌লো। অামার মা-বাবা খবর শু‌নে দ্রুত অামার বাসায় চ‌লে অাস‌লেন। শুরু হ‌লো অামার শরী‌রের ম‌ধ্যে অা‌রেক শরী‌রের বসবাস।

অা‌মি সন্তান সম্ভবা হ‌লেও উ‌মে‌দের প্র‌তি অামার ভা‌লোবাসা একটুও ক‌মে‌নি। ত‌বে অামার বাবা মা অার স্বামী মি‌লে উ‌মেদ‌কে অামার কাছ থে‌কে অালাদা কর‌তে চাই‌লো। অা‌মি অসুস্থ শরীর নি‌য়ে অামার উ‌মেদ‌কে রক্ষার চেষ্টা করলাম প্রাণপ‌নে।

‌হি‌মো‌গ্লো‌বি‌নের সমস্যা থাকায় অামার শরী‌রে রক্ত দেবার জন্য দু‌দিন হাসপাতা‌লে থাক‌তে হ‌লো। হাসপাতা‌লে অা‌মি উ‌মেদ‌কে খুব মিস ক‌রে‌ছি। অা‌মি সন্তান সম্ভবা হ‌লেও উ‌মেদ অামার প্রথম সন্তান। অা‌মি বাসায় ফেরার জন্য অ‌স্থির হ‌য়ে গেলাম।

বাসায় ফি‌রে অামি উ‌মেদ‌কে অার দেখ‌তে পেলাম না। নি‌জে‌কে পাগ‌লের মত লাগ‌ছি‌লো। অামার অ‌স্হিরতা দে‌খে অামার মা অামা‌কে শান্ত হ‌তে বল‌লেন। অা‌মি অসুস্থ হ‌লে না‌কি অামার পে‌টের সন্তা‌নের ক্ষ‌তি হ‌বে। কোন কথায় অামা‌কে শান্ত কর‌তে পার‌লেননা।

অামার উ‌মেদ স্টোর রু‌মে প‌ড়ে অা‌ছে। ওর চাজর্ ও শেষ হ‌য়ে গে‌ছে। মু‌খের পর্দা উ‌ঠে ভেত‌রের ই‌লেক‌ট্রিক ডিভাইস দেখা যা‌চ্ছে। অামার সন্তান যে মানুষ নয় তা অা‌মি নি‌জের চো‌খে দেখ‌ছি। উ‌মেদ‌কে একটা রোবট ছাড়া অার কিছুই ম‌নে হ‌চ্ছেনা। ওর ময়লা শরীরটা জ‌ড়ি‌য়ে ধরলাম অা‌মি, কিন্তু ও কোন সাড়া দি‌লোনা। অামার সন্তান‌কে এভা‌বে দেখ‌তে খুব কষ্ট হ‌চ্ছি‌লো।

অামি এক‌টি কন্যা সন্তানের জন্ম দি‌য়ে‌ছি । ত‌বে অা‌মি অামার উ‌মেদ‌কে ভুল‌তে পা‌রিনি। অামার মে‌য়ের নাম রে‌খে‌ছি উ‌মেদ। মে‌য়ে‌টির জ‌ন্মের অা‌গের রা‌তে স্ব‌প্নে উ‌মেদ অামার কা‌ছে এ‌সে‌ছি‌লো। ব‌লে‌ছি‌লো, ” মা অা‌মি তোমার কা‌ছে ঠিকই ফি‌রে অাস‌বো।”

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী