নাফের তীরে – ১

মশিউর  রহমান  ভূইয়াঃ

রাবেয়ার পা যেন আর চলছেনা।চলবে কি করে সেই গত রাত থেকে তো একটানা হেঁটেই চলেছে।ভয়ে কোথাও থামেনা।যদি আবার হায়েনারা দেখে ফেলে।যে দলটার সাথে গ্রাম ছেড়েছিল যদি তাদের সাথেও থাকতে পারতো তা হলেও হয়তো তারা যখন বিশ্রাম নিত তখন সেও নিতে পারতো।কিন্তু সেদল থেকেওতো সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথায় তারা।কি অবস্থায় আছে কে জানে।রাবেয়ার মনে পড়ে গেলো। গতরাতে তারা প্রতিদিনের মতো খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছিল।শোয়া বলতে কোনরকম বিছানায় গাটা এলিয়ে দেয়া।ঘুম আসার প্রশ্নই আসেনা।কি করে ঘুমাবে।চারিদিকে মিলিটারি আর রাখাইন প্রতিবেশীরা যেভাবে তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছে তাতে করে ঘুম তো দুরের কথা সারা রাত আল্লাহ্‌কে ডেকেই কুল পায়না।মংডু শহরের একটু দুরেই রাবেয়াদের বাড়ী।রাবেয়াদের বাড়ী বলতে তার স্বামী শুক্কুর আলীর বাড়ী। তার বাপের বাড়ী আরো একটু ভেতরের এক গাঁয়ে।মাত্র তিনমাস হলো শুক্কুর আলীর সাথে তার বিয়ে হয়েছে।শুক্কুর আলী তার পাশের গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়ীতে মজুরী খাটে।প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে যায় সন্ধায় ফিরে আসে।বিয়ের পর সেই যে রাবেয়া ফিরানি এসেছিল আর তার বাপের বাড়ী যাওয়া হয়নি। শুক্কুর আলী কথা দিয়েছিল কোরবানি ঈদের পরই তাকে বাপের বাড়ী নিয়ে যাবে।কিন্তু কোরবানি ঈদের আগেই তো আল্লাহ্‌র গজব নেমে এলো তাদের উপর। রাবেয়া বুঝতে পারেনা কেন তাদের উপর এই গজব। বাবার মুখে শুনেছে আগেও বহুবার তার বাপ দাদাদের উপর মিলিটারি আর রাখাইনরা সুযোগ পেলেই অত্যাচার নির্যাতন চালাত।মাতৃভূমির মায়ায় সব অত্যাচার নির্যাতন সয়েও মাটি কামড়ে এতদিন পড়েছিল।রাবেয়া জানেনা তার বাপের বাড়ীর মানুষেরা কেমন আছে। এখানকার অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়না তারা ভালো থাকতে পারে।চারদিকের খুনখারাপি দেখে তাদের গ্রামের মানুষেরা জীবন বাঁচাতে রাতে গ্রামে পাহারার ব্যবস্থা করেছিল।পালা করে লোকেরা পাহারা দিত। সেদিন রাতে শুক্কুর আলীর পাহারার পালা ছিল।রাবেয়া তার কাছে রাতে শোয়ার জন্য পাশের বাড়ীর মমিনের মেয়ে হালিমাকে এনেছিল।মমিন শুক্কুর আলীর জ্ঞাতি ভাই।এমনিতেই শুক্কুর আলী বাড়ী নেই তার উপর চারিদিকে রাখাইন শকুনদের আনাগোনা।তাই রাবেয়া কিছুতেই দুচোখের পাতা এক করতে পারছিলনা।এদিক সেদিক গড়াগড়ি করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানেনা।হঠাৎ বাইরে থেকে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি গুলির আওয়াজে রাবেয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল।সে যা বোঝার বুঝে গেল।তাড়াতাড়ি হালিমাকে ডেকে ঘুম থেকে উঠালো। ঘরের বাইরে এসে দেখলো চারিদিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। হালিমাকে সাথে নিয়ে বাড়ীর পেছন দিকের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকলো।জানের ভয়ে পালাতে গিয়ে বাড়ী থেকে বেরুবার সময় রাবেয়া কিছুই সাথে করে আনতে পারেনি।আর আনবেই বা কি।তেমন কিছু থাকলে ত।গরীব মানুষ তারা।নুন আনতে পানতা ফুরায়।হয়তো পরনের দু একটা কাপড় সাথে আনতে পারতো। জীবনের ভয়ে সে চিন্তাও বাদ দিতে হয়েছিল।তারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে গাঁয়ের আরো অনেকের দেখা পেল।ছেলে মেয়ে যুবক যুবতি বৃদ্ধ বৃদ্ধা সবাই জান বাঁচাতে কেবল উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে।দৌড়াতে দৌড়াতে তারা একটা পাহাড়ি ছড়ার সামনে পড়লো।উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে অনেক নিচে একটানা পানি গড়িয়ে পড়ছে।পাহাড়ের পানি পড়তে পড়তে ছোট খালের মতো হয়ে গিয়েছিল।সেই খালে প্রচন্ড স্রোত।সেই স্রোত পেরিয়ে তাদেরকে ওপাড়ে যেতে হবে।সব মানুষ একে একে খালের পানিতে নামছে। রাবেয়াও হালিমার হাত ধরে নামলো। রাতের আঁধারে কোন কিছু ঠিকমতো ঠাহর করা যাচ্ছিলনা।হঠাৎ স্রোতের তোড়ে হাত ফসকে হালিমা ছুটে গেল। রাবেয়াও ভাসতে ভাসতে কোথায় চলে গেলো।কোনরকমে তীরে উঠে রাবেয়া (চলবে)

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী