প্রত্নতত্ত্বের শহর কুমিল্লায় – রিফাত কান্তি সেন


(বন্ধুদের সাথে লেখক রিফাত কান্তি সেন)
সকাল-সকাল মনটা বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো।আনচান মন ঘরে বসে থাকতে চাইছিলো না।ভাবলাম কোথাও ঘুরে আসা দরকার।ইট-পাথরের দেয়ালে ঘেরা আমাদের জীবন।সর্বদা যেনো ব্যস্থতা ঘিরে থাকে।বিষন্নতা আমাদের পিছু ছাড়ছে না।মনটা চাইলো ঘুরে আসি এমন একটি স্থানে;যেখানে প্রকৃতি-প্রত্নতত্ত্ব, দুটোকে উপভোগ করা যায়।
প্রত্নতত্ত্বের শহর বেছে নিলাম কুমিল্লার প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন গুলো।একা একা ঘুরতে তেমন ভাল লাগে না।দুর্ভাগ্য সঙ্গী ও তো নেই।বলছিলাম ভালবাসার মানুষের কথা।কিন্তু তাই বলে একা ঘুরবো এমন ও নয়।কুমিল্লায় আমার আপন খালাতো ভাই থাকে।তাই মাঝে মাঝে যাওয়া হয় কুমিল্লায়।কিন্তু কুমিল্লা ঘুরার মত অনেক যায়গা থাকলে ও সেগুলোতে যাওয়া হয়নি কখনো।
চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা যাওয়ার পথে লাইমাই পাহাড়ের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য যে কারো মনে প্রশান্তির দোলা দিয়ে যায়।রাস্তার পাশের বড় টিলা গুলো দেখতে ভারি চমৎকার।লোক মুখে শুনা যায়, কুমিল্লায় এক সময় প্রচুর বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলো।আর তাঁরা কুমিল্লার বড়ুরা সহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের আবাস ছিলো।

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তাক লাগানো দৃশ্যপটগুলো কুমিল্লায় চোখে পড়ে।

কিন্তু আমি তো ঐসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চিনি না! বড় মুশকিলের ব্যাপার।
তবে কুমিল্লায় গিয়ে একজন ভাল মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে যায়।তিনি মোঃ রাসেল।আমার ঘুরার ইচ্ছের কথা শুনেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন।কুমিল্লার সন্তান,তাই কুমিল্লার প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন গুলোর সন্ধান তিনি ভাল জানেন।

হুটকরে একটি বাইক নিয়ে আসলেন।বাইকে চড়ে আমরা প্রথমে রওনা দিলাম কুমিল্লা বার্ড।সেখানে যেতে অবশ্য কিছু মজার ঘটনা ঘটে যায়।রাসেল সাহেব হাঁটু সমান পানির উপর দিয়ে বাইক চালিয়ে প্রমান করে দেন, দূনিয়ায় সবই সম্ভব।প্রয়োজন ইচ্ছা শক্তির।

এর পরই আমরা রওনা হই;নিদর্শন গুলো দেখার জন্য।আমার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই কুমিল্লা বার্ড অঞ্চলে।বার্ড এ প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।যদিও প্রবেশ করা যেতো, তবু আমরা যাইনি।

ইটাখোলা মুড়াঃ-

বার্ড থেকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই ‘ইটা খোলা মুড়া’ কুমিল্লা জেলার একটি দর্শণীয় স্থান এটি। কুমিল্লা সদর হতে পশ্চিম দিকে ৮ কি মি দূরে কোটবাড়ি সড়কের ওপারে, রূপবান মুড়ার উল্টোদিকে অবস্থিত। অনেকেই মনে করেন একসময় উক্ত স্থানটি ইট পোড়ানোর খনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এজন্যই উক্ত স্থানটির নাম ‘ইটাখোলা মুড়া’ করা হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

স্থাপত্যশৈলিটিতে প্রবেশ করতে কোন প্রবেশ মূল্য নেই। যে কোন বয়সের নাগরিক প্রবেশ করতে পারে ইটাখোলা মুড়াটিতে।আর তাই বিনা বাধায় আমরা প্রবেশ করে, ঘুরে ঘুরে দেখলাম স্থাপত্যশৈলি গুলো।

এর পরই আমরা গেলাম রুপবান মুড়া:-

কুমিল্লার যতগুলো প্রত্নতত্ত্ব রয়েছে তার মাঝে অন্যতম এটি। তবে লোকমুখে খুব একটা প্রচলন না থাকায় এ প্রত্নতত্ত্বটির সন্ধান অনেক ভ্রমণ পিয়সী পর্যটকের কানে পৌঁছায়নি।

কুমিল্লা-কালীর বাজার সড়কের দক্ষিণে বর্তমান বার্ড এবং বিজিবি স্থাপনার মাঝখানে একটি টিলার উপর এ মুড়া অবস্থিত। পাহাড়ে উঠার মতই উঁচু পথ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় রূপবান মুড়াতে। দর্শনার্থীদের জন্য সুখবর হলো এখানে প্রবেশ করতে কোন ফি লাগে না। খনন কাজের পর এখানে মাঝারি আকারের (পূর্ব-পশ্চিমে ২৮.২ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ২৮ মিটার) প্রায় ক্রুশাকৃতি একটি আকর্ষণীয় সমাধিমন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। এর সাথে আরও পাওয়া গেছে অষ্টাকোণাকৃতি স্তুপ এবং বর্গাকৃতির ভিতের উপর আর একটি স্তুপসহ বেশ সংখ্যক সাহায্য কাঠামোসমূহ।

আয়তাকার স্তুপ অঙ্গনের মধ্যে প্রাচীর দেওয়াল এগুলিকে বেষ্টন করে রেখেছে।

রুপবান মুড়ায় প্রবেশ করতে আমাদের পাহাড়ের মত উঁচু রাস্তা অতিক্রম করতে হয়।বাইকে করে এই উঁচু, পিছলা রাস্তা অতিক্রম করা ছিলো খুবই দুঃসাধ্য।
কিন্তু আমরা তা পেরেছিলাম রাসেল এর দূরদর্শিতায়।প্রায় আধ ঘন্টা যাবৎ সেখানে আমরা অতিবায়িত করি।

তারপরই আমরা রওনা হই,ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শনের জন্য।

ময়নামতি বৌদ্ধ বিহারঃ-

বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন গুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লার বৌদ্ধ বিহার। পূর্বে এ প্রত্নতত্ত্বটি শালবন “রাজার বাড়ি” নামে পরিচিত ছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ উম্মোচিত হওয়ায় একে “শালবন বিহার” নামে আখ্যয়িত করা হয়। এর আসল নাম ছিলো “ভবদেব মহাবিহার”। খ্রিষ্টীয় সাত শতকের মধ্যভাগ হতে আট শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেব বংশের শাসকগণ এই অঞ্চল শাসন করেন। উক্ত বংশের চতুর্থ রাজা ভবদেব কর্তৃক এই মহাবিহার নির্মিত হয়। বর্গাকার বিহারটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৫৫০ ফুট। চার বাহুতে সর্বমোট ১১৫ টি সন্ন্যাস কক্ষ, মধ্যভাগে একটি উন্নত বৌদ্ধ মন্দির এবং মূল মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট ১২ টি মন্দির ও ৮ টি স্তুপ উন্মোচিত হয়েছে। বিহারের মূল ফটকের পূর্বপাশে খননের ফলে একটি প্রাচীন কূপের কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তৎকালীন বৌদ্ধ শাসকগোষ্ঠী এ কূপের পানি আহরণের মাধ্যমে যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করতেন।

মন্দির ও মন্দিরের আশেপাশে কয়েক দফা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোড়ামাটির ফলক, ব্রোঞ্জের মূর্তি, নকশাকৃত ইট ও মুদ্রাসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব পাওয়া গিয়েছে। খননের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ প্রত্নতত্ত্ব পাওয়া গিয়েছে তা পার্শবর্তী জাদুঘরে সঞ্চিত রয়েছে। পুরো বিহারটিতে রয়েছে অসংখ্য ফুল গাছ। দেশী-বিদেশী ফুলের সৌন্দর্য যা ভ্রমণ পিয়সী মানুষদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।

বিহারে প্রবেশ মূল্য: দেশী পর্যটকদের জন্য ২০ টাকা, শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ টাকা এবং বিদেশী পর্যটকদের জন্য ২০০ টাকা।

প্রচন্ড রৌদ্রকে উপেক্ষা করেই আমরা বিহারের সৌন্দর্যকে উপভোগ করলাম।
চমৎকার-দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপত্যশৈলি নজরকারে যেকোন বয়সের পর্যটকদের।

পাশের শালবন ও পর্যটকদের হৃদয়ে শান্তির পড়স এঁকে যায়।শালবন ঘুরে দেখতে গিয়ে আমাদের অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা হলো।উঁচু,উঁচু টিলার উপর শাল গাছ গুলো দেখতে বেশ চমৎকার।
ঘোড়ায় চড়ে ও বাগানটি পরিদর্শন করা যায়;তবে আমরা ঘোড়ার সন্ধান পাইনি।
অতপর বাড়ি ফেরার পালা।

কোথায় থাকবেন কুমিল্লায়?

কুমিল্লা শহরে অসংখ্য হোটেল রয়েছে।২০০ টাকা থেকে ২০০০- ৩০০০ টাকা প্রতি রাত নীশি যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।উন্নত মানের রেষ্টুরেন্ট থাকার কারণে খাবার নিয়ে ও চিন্তা নেই।
স্বল্প মূল্য কিংবা বিলাসিতা, উভয়ের ই ব্যবস্থা রয়েছে।

কিভাবে যাবেন কুমিল্লার এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোতে:

ঢাকা থেকে বাসে আসলে নামতে হবে কোটবাড়ি চৌরাস্তায়। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোযোগে সোজা পৌঁছে যেতে পারেন রুপবান মুড়া, লতিকোট মুড়া, ইটাখোলা মুড়া এবং ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার। সিএনজি/ অটো ভাড়া জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে।

চাঁদপুর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য প্রথমেই যেতে হবে কুমিল্লা কান্দির পাড়। সেখান থেকে সিএনজি যোগে কোর্টবাড়ি চৌড়াস্তা। তা-ও জনপ্রতি ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা। সেখান থেকে নেমে ফুট ওভার ব্রিজ পার হয়ে সোজা বৌদ্ধ বিহারের অটো- সিএনজি যোগে বৌদ্ধ বিহারে। ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা।

যানবাহন অটো- সিএনজি। দর্শনার্থীদের জন্য বিহারটির প্রবেশ মূল্য সাইনবোর্ড আকারে টানানো রয়েছে

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী