কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, জাপান এত উন্নত কেন?

ডাঃ তারাকী হাসান মেহেদীঃ 

যে মালয়েশিয়া থেকে সত্তরের দশকে ছাত্ররা এসে আমাদের দেশে পড়াশুনা করত, সে মালয়েশিয়া হঠাৎ করে এত উন্নত হল কি করে?

চীন তার বিশাল জনসংখ্যা নিয়েও কিভাবে উন্নতি লাভ করল?

কিংবা সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে গেল কিভাবে?

আসলে এসব দেশ এমন এক সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, যে সুযোগ প্রত্যেক দেশের জন্য মাত্র একবার আসে।

যারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তারা উন্নত দেশে পরিণত হয়। আর যারা পারে না, তারা অনুন্নত দেশ হিসেবেই থেকে যায়।

এই সুযোগটিই হল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড।

কোন দেশের সামগ্রিক ইতিহাসে একবার মাত্র সময় আসে, যে সময়ে মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগ মানুষ হয় কর্মক্ষম মানুষ অর্থাৎ ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষ ।

এই বিশাল কর্মক্ষম মানুষকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থা উন্নত করাকেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে।

জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আজ তারা উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশেও এখন এই গোল্ডেন পিরিওড চলছে।

২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশে তরুণ ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে। এটি ২০৪০ সাল পর্যন্ত বেশি থাকবে অর্থাৎ এ সময় পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগ হবে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ। তাই এই তেত্রিশ বছরই নির্ধারন করবে ভবিষ্যৎ এ আমাদের দেশের অবস্থা কেমন হবে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, আমরা এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারছি না।

এই সময়ে সবচেয়ে যে জিনিস জরুরী তা হল স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি বিনিয়োগ।

এই সময়ে যদি দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করতে পারি, এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর সুবিধা আমরা তবেই ভোগ করতে পারব।

অসুস্থ ও দুর্বল ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রে তেমন ভুমিকা রাখতে পারে না। এই জন্য শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতেও বাজেট বাড়াতে হবে।

এরপর সবচেয়ে জরুরী হল তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তরুণদের জন্য কাজের ক্ষেত্র না তৈরি করতে পারলে, এই বিশাল সংখ্যক তরুণ বোঝা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

২০৪০ সালের মধ্যে যদি আমরা এসব না করতে পারি, তাহলে বাকি জীবন এর ভয়াবহ কুফল ভোগ করতে হবে বাংলাদেশের জন্য।

কারণ যত সময় যাবে, তরুণদের সংখ্যা তত কমতে থাকবে। ২০১৩ সালে তরুণ জনশক্তি (১৫-২৯ বছর) ছিল ২৩.৪ মিলিয়ন, যেখানে ২০১৬ সালে এসে সেটি কমে দাঁড়ায় ২০.৫ মিলিয়ন। (QLFS ২০১৫-১৬)

তিন বছরেই তরুণ জনশক্তি কমেছে ৩ মিলিয়ন।

দেশে জন্মহার এখন যে হারে চলছে, ২০৫০ পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা কিছুটা বাড়তে থাকবে (প্রায় বিশ কোটি হবে), এরপর থেকে এদেশে ক্রমশ জনসংখ্যা কমে যাবে।

তখন তরুণদের সংখ্যাও কমে যাবে, ফলে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যাও কমে যাবে।

অপরদিকে বাড়তে থাকবে বয়স্ক লোক অর্থাৎ নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা। ফলে আমরা তখন জনসংখ্যাকে সেভাবে কর্মক্ষেত্রে আর কাজে লাগাতে পারব না।

বাংলাদেশের মত ভারতেও এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সময় চলছে। নরেন্দ্র মোদী তার প্রায় ভাষণেই এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড শব্দের ব্যবহার করে। ভারত এখন তাদের এই বিশালসংখ্যক তরুণদের কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

এমনকি আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা তাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে, তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ তারা বেশ শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে প্রবেশ করেছে দশ বছর হল। অথচ সে অনুযায়ী এই সুযোগকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশে তেমন কোন পদক্ষেপ নেই, পলিসি নেই, প্ল্যানিং নেই।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা বেশি হলেও এটি এখন আমাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ার সুযোগ রয়েছে।

এখনোই যদি আমরা এই তরুণ ও কার্যক্ষম জনসংখ্যাকে ব্যবহারের সুযোগ কাজে না লাগাতে পারি, চিরতরের জন্য এই সুযোগ হারিয়ে ফেলব। কারণ, এটি দ্বিতীয়বার আর কখনো আসে না কোন দেশে। এখনই সুযোগকে লাগিয়ে দেশকে যদি উন্নত না করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ এ আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী