সুখী বিবাহিত জীবনের অপর নাম ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট

সাবিনা আহমেদঃ মানুষের জীবনে ক্রাইসিস আসবেই। হতে পারে তা চাকুরি সংক্রান্ত, টাকাপয়সা বা স্বাস্থ্য, কিংবা ছেলেমেয়ে। বেশীরভাগ সময় দেখা যায় জীবনের এসব ক্রাইসিস সামাল দিতে যেয়ে স্বামী স্ত্রী একে অপর থেকে কিভাবে আর কখন যে দূরে সরে যাচ্ছে তা টের পায় না। আর ক্রাইসিস যতো গুরুতর হয়, আস্তে আস্তে দূরত্ব তত বাড়তে থাকে। এবং কোন এক সময় তাসের ঘরের মত নিজেদের সাজানো জীবনটাও ভেঙে পরে নিজেদের কোন এক দুর্বল মুহূর্তে।
এই ভেঙে পড়ার আগে নিজেকে মনে হয় দুনিয়ার সবচেয়ে দুঃখী আর অসহায় মানুষ, আর নিজ স্বামী কিংবা স্ত্রীকে মনে হয় দুনিয়ার সবচেয়ে স্বার্থপর আর অবিবেচক। অথচ দোষটা ছিল দুজনেরই, তারা বুঝে নাই কিভাবে একে অপরকে সাহায্য করে এসব ক্রাইসিস সামাল দিতে হয়। পরস্পরকে দোষ দিয়ে আঙ্গুল তোলার টেন্ডেন্সি, মারাত্মক ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে নিজ ভুল স্বীকার করে তা শুধরে নেয়াটাই সবচেয়ে কার্যকর।
সুখী বিবাহিত জীবনের আরেকটা বড় সিক্রেট সস হচ্ছে পরস্পরের প্রতি অগাধ সম্মান আর ভালোবাসা। যার থেকে বের হয়ে আসে স্যাক্রিফাইস। যদি দুজনের এই স্যাক্রিফাইসিং ক্ষমতা না থাকে তাহলে পরস্পরের প্রতি ডিমান্ড বেড়ে যায়, দৈনন্দিন খিটমিট বেড়ে যেয়ে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে। বরং এই স্যাক্রিফাইসই আপনার জীবনের ক্রাইসিসগুলো মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
স্বামী স্ত্রীর উচিৎ একে অপরের দুর্বলতা কাটানোয় সাহায্য করা। কেউ ভালো রাঁধে, তো কেউ ভালো বাজার করে। কেউ ভালো ঘর গুছাতে পারে, তো কেউ বাইরের কাজ। স্বামী স্ত্রীর উচিত একে অপরের সম্পূরক হয়ে উঠা।
বেশীরভাগ মানুষই বাইরে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড সাজগোজ করে, আর ঘরে বসে থাকে অগোছালো হয়ে। এটা ঠিক না। সারাদিন কাজের পর যেমন একটা গুছানো ঘরে ফিরতে সবাই পছন্দ করে তেমন ঘুছানো পরিপাটি মানুষগুলোর কাছে ফিরতেও আনন্দ লাগে।
নিজেদের সময় দিন। সপ্তাহে কিছুটা সময় শুধু দুজনার। এক সাথে শপিং করতে যান, বাইরে খান, মুভি দেখুন। নো বাচ্চা-কাচ্চা, নো বন্ধু বান্ধব ইন বিটুইন। অনেক দম্পতি মনে করে এখন সময় কেবল বাচ্চাদের দিব, ক্যারিয়ারে দিব। সবগুছিয়ে উঠা শেষ হলে নিজেদের দিকে তাকাবো। এই ধরনের চিন্তা ভাবনা মারাত্মক ভুল। এতে করে নিজের অজান্তে কখন যে একে অপরের থেকে দূরে সরে গেছেন টেরই পাবেন না। আর এর জন্যই দেখা যায়, মিড লাইফে, যখন বাচ্চাকাচ্চারা বাড়ি ছেড়ে নিজ লাইফে ব্যস্ত হয়ে গেছে, তখন প্রচুর দম্পতি ডিভোর্সের মাঝ দিয়ে যায়। স্বামী তখন নিজ স্ত্রীর মাঝে আর নতুন কোন চার্ম খুজে পায় না, স্ত্রীর নিজ স্বামীকে লাগে আনস্মার্ট। তাই, দম্পতীর বয়স যতই হোক দুজনকে সময় দিন, এর মাঝে লুকিয়ে আছে দম্পতীর দীর্ঘ সুখি জীবনের সিক্রেট।
প্রচুর মানুষ আছে যারা ঘ্যান ঘ্যান করতে পছন্দ করে, যাকে বলে ন্যাগিং। অপরের স্বামী স্ত্রীর সাথে তুলনা করে খোটা দেয়াও অনেকের স্বভাব। যেমন ধরুন স্বামী বলছে, “পাশের বাড়ির ভাবীকে দেখেছ, কি সুন্দর পরিপাটি হয়ে থাকে, তুমি থাকতে পারো না।’ কিংবা স্ত্রী বলছে, ‘ জামান ভাইয়ের ইনকামের জন্য ওনারা প্রায় বছর বিদেশ ভ্রমনে যায়, তোমার ইনকামের যেই অবস্থা আমাদের আজ পর্যন্ত কক্সবাজারেই যাওয়া হলো না’। এই ধরনের কথাগুলো মানুষের বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়। যার থেকে শুরু হয় ঝগড়া ঝাটি, চিৎকার চেঁচামেচি, বাড়ি মাথায় তুলে সবাইকে জানান দেয়া নিজেদের ইন্টার্নাল মেটার। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এই ন্যাগিং অনেক সময় একে অপরকে অসহনীয় করে তুলে। যা অনেক সময় ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায়।
ঝগড়া ঝাটি করা খুব খারাপ। এর থেকে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাচ্চারা। তারা নিজেদের অসহায় মনে করা শুরু করে। এসব ইনসিকিউরিটিতে ভোগা বাচ্চারা সাধারণত নিজেদের ফুল পটেনশিয়াল রিচ করতে পারে না। বিবাহের প্রতিও তাদের একটা নেতিবাচক ধারনা হয়। বাবা মায়ের খারাপ দিক গুলো দেখে শিখে তারাও নিজেদের জীবনে সুখী হতে পারে না।
বাচ্চাদের সামনে নিজ স্বামী কিংবা স্ত্রীকে ছোট করে কথা বলা মারাত্মক ভুল। তাতে করে বাচ্চাদের কাছে বাবা মায়ের সম্মান কমে যায়, এরপর তারা আর বাবা মায়ের কথা শুনতে চায় না। তারাও এক সময় বাবা মাকে অসম্মান করে কথা বলা শুরু করে। সো, বি মাইন্ডফুল।
আপনি অনেক উচ্চাভিলাষী হোন আর যাই হোন, সারাক্ষণ কাজে ডুবে থাকেন কিংবা নিজেকে নিয়েই শুধু ব্যস্ত থাকেন, কোন একদিন জীবনের হিসাব নিকাশ আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবেই। সেই হিসাবের খাতায় ‘স্বার্থপর আমির’ বিচরণ এক চোরাবালিতে। যেই চোরাবালিতে ডুবে স্বার্থপর আমির মৃত্যু হয়, সেই সাথে মৃত্যু হয় তার সংসারের বাকিদেরও।
মনে রাখবেন, জীবন মানেই ঝামেলা, জীবন মানেই ক্রাইসিস। ট্রাই টু ম্যানেজ ইট টুগেদার উইথ ডিগনিটি এন্ড রেসপেক্ট। জীবনটা খুব সুন্দর। একে হেলায় ফেলায় নষ্ট করবেন না।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী