নিসর্গ নিঃসঙ্গতা পর্ব ৬- নুরুন নাহার লিলিয়ান

কানাডা যাওয়ার আনন্দে আমি আত্মহারা । সব কাগজ পত্র তৈরি করা এবং ভিসার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
ল্যাবের কাজের ফাঁকে ফাঁকে সব কাগজ পত্র পাঠালো টোকিও কানাডিয়ান ভিসা অফিসে। ভাগ্যটা সে সময় কিছুটা সুপ্রসন্ন ছিল।আর একদিন দেরি হলে ফিলিপাইন যেতে হতো ফিংগার প্রিন্ট দিতে।সে সময় ও বেশ ব্যস্ত। ফিলিপাইন যেতে হলে হয়তো আমার আর যাওয়া হতো না।
এ জন্যই সব কিছুর সাথে ভাগ্য এবং দূর্ভাগ্য দুটোকে ও সঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে হয়।
এর মধ্যে আমেরিকার ভিসা ও নিতে হবে।
একদিন ল্যাবের টুকটাক কাজ শেষ করে বাসায় ফিরলো। জাপানে আমাদের বাসাটা ওর ল্যাবের খুব কাছে। সাইকেল করে এলে পাঁচ ছয় মিনিট ।আমাকে ও বলল, সাবওয়েতে যাবে নাকি বাসে। আমি বললাম হেটে যাওয়া যায় না? ও হেসে দিয়ে বলল, “একটু সময় বেশি লাগবে। ”
যে পথেই যাই না কেন। আমেরিকান এ্যাম্বাসিটা পাহাড়ের এমন একটা জায়গায় কিছুটা পথ হাটতেই হবে। জাপানে গাড়ি কেনা যতো সহজ তারচেয়ে তা যত্ন নেওয়া ততো বেশী কঠিন। আমরা যেহেতু জাপানে স্থায়ী হবো না। তাই গাড়ি ও কেনা হয়নি। জাপানে মজার একটা বিষয় হলো ইলেক্ট্রনিক যেকোন জিনিস কেনা যতো সহজ তারচেয়ে ফেলে দেওয়া বেশি কঠিন। বাংলাদেশের মতো নষ্ট জিনিস যেখানে সেখানে ফেলা যায় না।

সেপ্টেম্বরে আমরা ফিরে আসব । অক্টোবরে নতুন সেশনে নতুন অনেক ছাত্রছাত্রী এবং রিসার্চররা যাবেন । নতুন সংসার সাজাতে যেমন একটা ধাক্কা সবাইকে সহ্য করতে হয় । তেমনি চলে আসার সময় গমি করা মানে ডাস্টবিনে সব ফেলা ও কঠিন । জাপান দেশটা কতোটা ব্যয়বহুল যারা অনেক দিন থাকে তারাই জানে । যাইহোক জুন
জুলাইয়ের দিকে আমার সাথে পার্টটাইম কাজ করে দুজন বাংলাদেশি ভাই বলল , ভাবি চলে যাওয়ার সময় আপনার সংসারের জিনিস কিন্তু কাউকে দিয়েন না । কে কে কোন কোন জিনিস নিবে ভাগাভাগি হয়ে গেল ।

আরেকজন ওর ল্যাবে এসে আন্তরিক অনুরোধ করা হল । ফ্রিজ ,ওয়াসিং মেশিন , সোফা , ওভেন ,আমার সাইকেল সহ সব যেন তাদের জন্য রাখা হয় । আমরা আরও মন শান্তি পেলাম । যাক বাবা না চাইতেই মানুষ পাওয়া গেল । তাদের উপর ভরসা করে রইলাম । কে জানে বাঙ্গালির মন । এর মধ্যে কিছু কিছু জিনিস দিয়েও দিলাম । ফ্রিজ সহ যেগুলো খুব প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া বাকি জিনিস গুলো দিয়ে দিলাম । আর অন্য সব ফেলতে লাগলাম । কিন্তু এই দিকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারে থাকে ।

তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় ইলেক্ট্রনিক জিনিস সহ সব ফেলা যায় ।সেখানে রাতের আঁধারে অনেক বাসা থেকেই জিনিস পত্র ফেলা হচ্ছে । সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সব বাসাই ধীরে ধীরে ফাকা হতে শুরু করে । আমাদের সেই বাঙালি ভাই বোনেরা প্রতিশ্রুতি ভুলে গেল । তারা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো সেখান থেকে পাওয়া যাওয়াতে চুপচাপ বসে রইল । এই দিকে বিপদে পড়লাম আমরা । এখন ফ্রিজ আর ওয়াসিং মেশিন ফেলব কেমনে । ইলেক্ট্রনিক দোকান বা কোম্পানিকে দিতে গেলে পে করে দিতে হবে । কি যে উল্টা নিয়ম । নিজের ব্যবহৃত জিনিস ও দিব । আবার টাকা ও দিতে হবে । কি অদ্ভুত ।

এই দিকে বাঙ্গালিরা চুপ । ওদের জিনিস দরকার । আমরা যদি ওদের কথা না রেখে অন্য কাউকে সময় থাকতে দিয়ে দিতাম । তাহলে ফিরে আসার সময় বিপদে পরতাম না । হাতে মাত্র তিন চার দিন সময় । এর মধ্যে নানা জায়গায় দাওয়াত । সব কিছু গুছিয়ে নেওয়া । প্রবাসে বাঙ্গালিরাই বাঙ্গালির সবচেয়ে ক্ষতির কারন হয় । উপকার ও করে । তবে সে অনুপাত কম । বাঙালি সমাজ পৃথিবীর সব দেশে জটিল এবং সমালোচিত । আমার এক জাপানি বান্ধবি অনেক গুলো সেকেন্ড শপ খুঁজলো ।আমাদের ফ্রিজ এবং ওয়াসিং মেশিন দেয়ার জন্য । সবাই অনেক বেশি ইয়েন চায় । নিজের এতো বড় ফ্রিজটা ,এতো সুন্দর ওয়াসিং মেশিন টা দিব । তা আবার ইয়েন দিয়ে দিতে হবে ।

চরম মেজাজ গরম হতে লাগল।ওই বাঙ্গালি দুই জনের উপর মনে মনে ভীষণ রাগ উঠল । সমালোচনা ভয় না করে এবং ওদের কথা মুল্য না দিয়ে সময় থাকতে ব্যবস্থা করা উচিত ছিল । একটা অনুতপ্ত মন ভীষণ ভাবে হতাশ হল । এর মধ্যে হঠাৎ তাদের মধ্যে এক জন বাঙালি বলল , তাদের এক বান্ধবি বা কলিগ আসবে ।তার জন্য জিনিসপত্র রাখতে চায় । কিভাবে নিবে । নিতে গেলে তো গাড়ির খরচ বহন করতে হবে । এই খরচ না থাকলে নাকি তারা নিবে । তারপর আমার জামাইর মনে মনে রাগ হলেও বলল , ঠিক আছে গাড়ির খরচ আমিই দিব । এখন সে নিবে । আমরাই ট্রাক খরচ বহন করে তাদের আমাদের সব জিনিস এমন কি কাঁচা বাজার ,মাছ মাংস দুধসহ সব দিয়ে এলাম ।যারা খরচের ভয়ে জিনিস পত্র নিতে চায় না । তারা রাতে ডিনারের দাওয়াত দেয় । কি আর বলব । আমরা দাওয়াত খেলাম তবে অন্য বাঙ্গালিদের বাসায় । বাঙ্গালির মতো বহুরূপী জাতি পৃথিবীতে একটা ও নেই ।
এই হল জাপানে যারা ক্ষণস্থায়ী যায় তাদের সত্যিকারের চিত্র । বাঙালি যে কতো টা সুযোগ সন্ধানী । পরিস্থিতেই বুঝা যায় । অনেকে মনে করে জাপানে গেলেই চাকুরি পাওয়া যাবে । অনেক টাকা পাওয়া যাবে । সব পাওয়া যায় । তবে যোগ্য হতে হয় । ভাষা জানতে হয় । ওদের সংস্কৃতি বুঝতে হয় । তা না হলে জীবন অনেক কঠিন । এটাই হল বাংলাদেশিদের জন্য সত্যিকারের জাপান ।

যাইহোক আমরা দুজন কথা বলতে বলতে হেঁটেই চললাম পাহাড়ের পথে।
প্রায় ৪০ বা ৪৫ মিনিট আমরা মারুয়ামা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। সারাটা পথ আমরা হেটে যেতে যেতে আমরা দুজন অনেক মজা করলাম। বলা যায় বিয়ের পর একটু বেশি সময় এক সাথে হেটে কোথাও যাওয়া। ও একটু পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি এতো সাবলীল ভাবে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ে উঠে গেলাম। পাহাড়ি পথে একটু হাটলেই সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমার মনে আছে আমি ভীষন উচ্ছল ছিলাম।সেদিন খুব মজা লাগছিল।আমরা সাইকেল নিয়েও আসতে পারতাম। কিন্তু আমার কিছু বিষয়ে ফোবিয়া আছে।আমি ছাদে যেতে, পুকুর,সমুদ্র, নদীতে যেতে কিংবা মেইন রোডে যেকোন যানবাহন চালাতে ভয় পাই।মিশুক প্রকৃতির মানুষ হলেও কখনও কিছু সংস্কার বা নিজস্ব বিশ্বাসের জন্য কিছু মানুষের সাথে মিশতে পারিনা।

ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আজকে তোমার ইন্টারভিউ নিতে পারে কিংবা তারিখ দিতে পারে।তুমি বেশি নার্ভাস হয়ো না। “।
আমি চঞ্চল হয়ে উত্তর দিলাম, ” আরে নার্ভাস হবো কেনো। ”
ও আবার আমাকে দেখে। ততোক্ষনে আমরা চলে এসেছি। সাথের ব্যাগটা ওকে দিয়ে অফিসে ঢুকে গেলাম।জাপানি পুলিশরা বেশ ভদ্রতার সাথে আমার যথাযথ চেক করলো। তারপর সিরিয়াল দিয়ে বসতে বলল।আমার আগের মেয়েটা জাপানিজ না। তাইওয়ানের একটা ছোট মেয়ে। জাপানে পড়াশুনা করছে। সে হয়তো আমেরিকা যাবে আমার দিকে একটু একটু পর ঘাড় বাঁকা করে কৌতুহল নিয়ে দেখছিল।আমি সহজ করার জন্য আন্তরিক হাসি দিলাম।
তারপর, ” ফিসফিস করে জানতে চাইল, ” where are you come from?”
আমি বললাম,” Bangladesh ”
সে জিজ্ঞেস করলো,”Is it part of India? ”
আমি বললাম,” No. This is very near from India but Independent country ”
সে বলল,”ohh! First time I hear this country’s name.
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ” why?”
সে বিনয়ের সাথে বলল,” sorry! I didn’t know about this coutry.
আমার মনে মনে রাগ হলো। ওর দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসি দিয়ে বললাম, ” you are so sweet. when you will be free please check the world map properly. ”
সে সাথে সাথে বলল, ohh! of course. Really I am so curious about your country.
ফিসফিস করতে করতে ওর ডাক চলে এলো।কিছুক্ষনের মধ্যে ও বের হল । আমার ফিঙ্গার প্রিন্ট নিল । বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করল । হয়ে গেল আমেরিকান ভিসা । এতো সহজে হয়ে যাবে ভাবিনি । পাসপোর্ট বাই পোষ্ট এ পাঠিয়ে দিবে । আমি তো মহা আনন্দে বের হয়ে এলাম । দেখলাম সেই মেয়েটি একটি ছেলের সাথে । আমাকে দেখে হাসি দিল ।
তারপর পাশের ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল ,my boy friend takai . where is your boyfriend
আমি অবাক হয়ে বললাম , boy friend . my husband is over there .
ohh really are you married .
মনে হল মেয়েটি আকাশ থেকে পরেছে । এর মধ্যে ও আমার কাছাকাছি চলে এসেছে । আসলে সেই সময় আমার বব কাট চুল আর অনেক স্লিম হয়ে যাওয়া তে বয়স বুঝা যেত না । আমি নাচতে ওর হাত ধরে মারুয়ামা পাহাড় থেকে নামতে শুরু করলাম ।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী