এ কেমন অসভ্য দেশ, যার নাম বাংলাদেশ !

এইচ.বি.রিতাঃ 

জাতি হিসাবে আমরা যে নিকৃষ্ট, তা আরো একবার মরে গিয়ে প্রমান করল যশোরের পারভীন বেগমের সদ্য ভূমিষ্ট হতভাগা শিশুটি। নিষ্ঠুর পৃথীবীর নরপশুদের সাথে সাক্ষাতের আগেই শিশুটি বিদায় নিল পৃথিবী থেকে। গতকাল মঙ্গলবার (অক্টোবর ১৭) সকালে আজিমপুরে ঘটনাটি ঘটে। মাত্র ১৫০০ টাকা দিতে না পারায় স্বামী বিতারিত পারভীন বেগম রাজধানীর ৩ টি হাসপাতাল, যথা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ(মিটফোর্ড) ও আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান হতে প্রসব বেদনা নিয়ে বার বার বিতারিত হয়ে শেষ পর্যন্ত শুয়ে পড়লেন আজিমপুর মাতৃসদনের সামনের রাস্তায়। প্রসব বেদনায় তার চিৎকার দেখছিল তখন রাস্তায় দাঁড়ানো শতেক নরপশু। তামাশা দেখছিল মাতৃসদনের ডাক্তার ও নার্সরা দু’তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে।অসহনীয় প্রসব বেদনা সইতে সইতে চতুর্থ কোন হাসপাতালে লাত্থি খাওয়ার আগেই হতভাগী মা জন্ম দিলেন এক শিশুর। জন্মের পর রাখা হয়নি যে শিশুর নাম, জন্মের পর ২ মিনিট বেঁচে থাকার ভাগ্য হয়নি যে শিশুর, তার কি নাম দেয়া যায়? অসভ্য বাংলাদেশ? এ কেমন দেশে আমরা বাস করছি যেখানে কর্তব্যরত কর্তৃপক্ষের অমানবিকতা ও বর্বরতায় মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিদিন? এ কেমন নিয়ম ব্যবস্থায় আমরা জড়িয়ে আছি যেখানে প্রসব খরচ দিতে ব্যার্থ হওয়ায় একজন অন্তঃসত্তা নারীকে টেনে হিচরে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়? শুনেছি আল্লাহর পরে একজন চিকিৎসকই পারে কারো জীবন বাঁচাতে! বাঁচার জন্য মানুষ শুধু সৃষ্টিকর্তাকে ডেকেই ক্ষ্যান্ত হন না, সাধ্যমত মানুষ ছুটেন চিকিৎসকদের কাছে। কেন? চিকিৎসা নিতে! সেবা নিতে! প্রাণ বাঁচাতে! আজ সে চিকিৎসকই যদি সেবার বদলে অর্থ উপার্জনই মূখ্য বলে মনে করেন, তবে এ দ্বায়ভার কার? তবে এ পরাজয় কার? শুধু কি ডাক্তার পেশাধারীদের? রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যাক্তিবিশেষ কেউ কি এ দ্বায়ভার এড়াতে পারবে? অভ্যাসের একটা ব্যাপার থেকেই যায়। আমরা অভ্যাসের দাস। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত। ঘাতে-অপঘাতে মৃত্যু, স্বাভাবিক মৃত্যু, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে মৃত্যু! দেশের কোন না কোন হাসপাতালে প্রতিদিন ঘটছে এমন বহু মৃত্যু। দেখে দেখে আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। আমাদের চেতনা নুপুংশুক হয়ে গেছে। এ চেতনা এখন আর তীব্র ক্রোধে ধারালো অস্ত্রের মত ঝনঝনিয়ে উঠেনা। এ চেতনা হতে এখন আর ফলপ্রসূ কেন উৎপাদন সম্ভব হয়না।

আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৪ সালের ঠিক একই দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার, ঠিক একই কারণে রাস্তায় জন্ম নিয়ে মৃত্যুর বুকে ঢলে পড়েছিল আরো একটি নবজাতক! নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের রাস্তায় প্রসব বেদনায় সেদিনের অসহায় নারীটি ছিল বিজিবির সৈনিক জামিরুল ইসলামের স্ত্রী শামীমা আক্তার। চিকিৎসকদের দায়ীত্বহীন অমানবিকতা আজ নতুন নয়। অথচ দেখুন, বিশ্বে এমনো ঘটনা আছে যেখানে একজন চিকিৎসকের দায়ীত্বশীলতার কারণে আমদের এ পেশার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়! চলতি বছরের আগষ্টের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি ভিত্তিক একটি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আমান্দা হেস। নিজের সন্তান প্রসব করানোর জন্য যখন তিনি লেবার রুমে ঢুকছিলেন, তখনই শুনতে পান ওয়ার্ডে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছেন অন্য এক নারী।খবর নিয়ে জানতে পারলেন, ঐ নারীর প্রসব করানোর জন্য ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছে, তবে ডাক্তার এখনো এসে পৌঁছাননি। তিনি ছুটে গেলেন ওই নারীর পাশে। নিজের সন্তান প্রসব করা বন্ধ রেখে আগে নিজ হাতে প্রসব করালেন ঐ নারীকে। তারপর নিজেও জন্ম দিলেন নিজ সন্তান। আমান্দা হেসের মত এমন চিকিৎসকই তো মানবতার সেবক, নয় কি? চিকিৎসা পেশায় একজন চিকিৎসকের প্রথম দায়িত্ব হলো, যে কোন পরিস্থিতিতে রোগীর চিকিৎসা করা। যে কাজটি করে আমান্দা নিজ পেশাকে বিশ্বের দরবারে গর্বিত করেছেন, সে কাজটি চিকৎসক হিসাবে আমরা কেন করতে পারিনি? আমাদের অক্ষমতা কি শুধুই আমাদের? নাকি গোটা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা? পারভীন বেগমকে হাত ধরে টেনে বের করে দেয়ার অপরাধে মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান হতে আয়া সাহেদাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে চিকিৎসকরা চিকিৎসা না দিয়ে পারভিন বেগমকে হাসপাতাল থেকে বের করে দিলো, তাদের বিচার হয়নি কেন? ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে অমানবিকতা ও দায়িত্বহীনতার সাথে টাকার জন্য একজন অন্তঃসত্বাকে চিকিৎসাসেবা দিতে এড়িয়ে গেল, সেটি কেন খতিয়ে দেখা হলনা? সাহেদা শুধুমাত্র তৃতীয় শ্রেণির একজন আয়া বলেই কি সকল দ্বায়ভার তার কাঁধে চাপানো হচ্ছে? একজন চিকিৎসক হলেন মানুষের বিপদে ঢাল স্বরুপ যাকে আঁকরে মরতে মরতেও মানুষ সৃষ্টিকর্তার করুনা ভিক্ষা চান। আজ সেই চিকিৎসকরা যদি অর্থ কামানোই ব্রত হিসাবে গ্রহন করেন, তবে চিকিৎসা পেশার প্রতি মানুষের ঘৃণা ছাড়া কিছুই থাকবেনা। এ দেশে সন্তান জন্মদানের জন্য ভর্তি ফি না থাকায় একজন প্রসূতিকে প্রসব বেদনার সাথে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়ার মত ঘটনা ঘটে। আবার সেই বর্বরতাকে ক্ষমতার বলে মোড় ঘুরিয়েও দেয়া হয়। এই পাশবিকতা দেখার জন্যই কি দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর দেশ স্বাধীন হয়েছিল? কতটা অমানবিক হলে এমন কাজ করা যায়? কতটা নৈতিক অবক্ষয় হলে এমন কাজ সহ্য করা যায়? ‘সোনার বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে দেশ কতটুকু এগিয়েছে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সরকার কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সেসব বিষয় তুলে ধরতে বিদেশী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সহমিলনে এ বছরই হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী “উন্নয়ন মেলা-২০১৭!” আসলেই কি আমাদের উন্নয়ন হয়েছে? হলেও কতটা? যতদিন দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হবে, সর্বস্তরে সুশৃঙ্খল আইন ও তার প্রয়োগ না হবে, যতদিন গোটা কয়েক কাঠামোগত পরিবর্তন না ঘটবে, ততদিন দেশের উন্নতি সাধন তো দূরের কথা, দেশ হতে অব্যবস্থাপনা ও মানবতার লঙ্ঘন দূর হবেনা।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী