ভার্চুয়াল পার্সোনালিটি এবং প্রত্যাশা

হাসান আল বান্নাঃ  আপনার লেখা প্রতিটি শব্দ, আপলোড করা প্রতিটি ছবিই আপনার ভার্চুয়াল পার্সোনালিটি।

ব্যাপারটা অনেকটা স্কুলের শিক্ষকদের মতন। একদিন দেখলেন আপনার মহা সম্মানিত শিক্ষককে এক বয়স্ক ভদ্রলোক শালা বলে ডাকছে, এক মহিলা হেব্বি ঝাড়ি দিচ্ছে, এই মানুষগুলো একজন তার দুলাভাই, একজন তার মা কিংবা বউ যে কেউ হতে পারে।

একেকজন মানুষ মাল্টিপল পার্সোনালিটি হোল্ড করে। স্কুলের বাজখাই লোকটাই ঘরে বউয়ের কাছে বেড়ালের মত নরম। আবার অফিসের কড়া মহিলা বসটাই হয়ত জামাইয়ের কাছে তুলোর চেয়ে নরম কেউ।

একেকটা যায়গায় আমরা ভিন্ন ভিন্ন মুখোশ পরে থাকি, এবং এই মুখোশগুলো ঐসব যায়গার জন্য অত্যন্ত জরুরী। এইসব মুখোশ আছে বলেই একেকটি পেশায় আমরা একেক ভাবে সাফল্য অর্জন করি।

নয়ত ঘরের লোকটা অফিসে কিংবা কর্মক্ষেত্রে যদি ঘরের মতই থাকত তবে অফিসে তাঁকে দিয়ে খুব বেশী কোন উপকার হত না। কিংবা ভীষণ লাজুক বউটা ব্যাবসা করতে গিয়েও যদি লাজুক লতা হয়ে বসে থাকে তবে তাঁকে ঠকিয়ে কে যে তার কোন সর্বনাশ করবে সেটা কি আর আমরা জানব?

অথচ আমরা প্রায়ই মুখ ও মুখোশ নিয়ে কথা বলি। তো আসুন আগে আমাদের নিজেদের কথাই চিন্তা করি। আমরাও তো- মানে ধরেন এই আমি, ঘরে খালি গায় লুঙ্গি পরে থাকি, ফেইসবুকে তো ভাব লই একদম সাহেব। প্রায়ই বাস ট্রেনে যাতায়াত করি, কিন্তু প্লেনের ছবি দেখলে মনে হয় আমি খালি প্লেনেই চরি।

এর মানে হল আমরা ভার্চুয়াল জগতে আমাদের নিজেদের একটা পার্সোনালিটি সেট করি। এইটাও বাস্তব মানুষ ই। আমরা বলি না ভার্চুয়াল মানুষের সাথে বাস্তব মানুষ মেলে না। আরে ভাই বাস্তব আমি না থাকলে এই ভার্চুয়াল আমি কেমনে থাকতাম?

এই ফেইসবুক টুইটার এগুলা তো নিজে নিজে চলে না, মানে এপগুলোর হয়ত অটোমোটেট অনেক সিষ্টাম আছে, কিন্তু আপনি আমি কিংবা অজানা কেউই তো এইসব একাউন্টগুলো চালাই।

ফেইক একাউন্টের পেছনেও তো একজন বাস্তব মানুষই বসবাস করে। তাহলে ব্যাপারটা হল একবিংশ শতক আমাদের এনালগ যুগের মতই ভিন্ন ভিন্ন কর্মক্ষেত্রের ভিন্ন ভিন্ন পার্সোনালিটির মত করেই ডিজিটাল মাল্টিপল পার্সোনালিটি উপস্থাপনের জাস্ট একটা ভার্চুয়াল ক্ষেত্র উপহার দিয়েছে।

এখন আমাদের হাতে পুরো বিষয়টা যে- আমরা কি এই মুখোশ পরিধানের সুযোগটাকে কল্যাণের জন্য ব্যবহার করব না অকল্যাণে ব্যাবহার করব।

আজ আমি যা কিছু লিখছি, যা কমেন্ট করছি, যা ছবি আপলোড দিচ্ছি তা আপনাদের মনে আমার সম্পর্কে একটা ছবি বা আঁকার তৈরি করছে, যে বান্না ভাই বোধহয় এরকম। ঠিক তেমনি আপনার একাউন্ট আপনার ছবি বা আপনার স্ট্যাটাস আপনার সম্পর্কে আমাদের সকলকেই একটা ইমেজিনেটিভ ক্যারেক্টারে রূপ দিচ্ছে।

একসময় ভার্চুয়ালি মানুষ নিজদের পরিচয় গোপন করে ব্লগিং করত, একেকজনের একেকটা ছদ্মনাম ছিল। ঐটা ছিল বাংলা ব্লগের সোনালী সময়। আমরা প্রতিদিন হাজার হাজার শব্দ লিখতাম, নিত্য লেখার জন্য নিত্য পড়তে হত, চারপাশে চোখ কান খোলা রেখে চলতাম, খালি সাবজেক্ট খুঁজতাম।

তো ঐসময় ব্লগে পরিচিত হওয়া কোন মানুষের সাথে সামনা সামনি দেখার সুযোগ হওয়ার ব্যাপারটা ছিল খুবই এক্সাইটিং। এই লেখার পেছনে মানুষটা বোধহয় এরকম, তার বোদহয় গোঁফ আছে, কিংবা ঝাঁকড়া চুল, লেখার প্যাটার্নের সাথে চেহারা কিংবা চরিত্রের একটা প্যাটার্ন দাঁড় করাতাম। একবার তো এক ভদ্রলোক কল্পনা করে রেখেছেন আমি হোন্ডা চালিয়ে আসব, এঞ্জিও টাইপ মানুষ, হোন্ডা ছাড়া চলে কিভাবে? সেবার বাসে ঝুলে লেগুনায় চড়ে উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম মোহাম্মদপুরে।

আপনাদের মধ্যে যারা এরকম চেহারা না দেখা বা ছবি না দেখা লেখকের সঙ্গে কিংবা ভার্চুয়াল কোন মানুষের সঙ্গে দেখা হত বুক টিপটিপ করত না? করত! করত! বলেন না আর কি!

হয়ত লোকটা কিংবা মেয়েটা আমার পাশ দিয়েই গেছে, কিন্তু আমি তাঁকে চিনতেই পারিনি সে সেই মানুষ যার লেখা মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়তাম। লেখা পরে অনেকের বিষয়ে মনে হয় উনি বোধহয় খুব ফর্সা, ধারালো চিবুক আর চওড়া বুকের মানুষ, কিন্তু দেখা গেল তার উল্টো, গাঢ় শ্যামলা গড়ন, সাইজে ছোটখাট, আর পরায় ফিসফিস করে কথা বলেন।

সেই অচেনা মানুষগুলো চেনা হয়ে যেত, আপন হত, পড় হত, বন্ধু হত, শত্রু হত- আরও কতকিছু হত। আজকাল ফেইসবুকের কল্যাণে সবার চেহারা দেখা যায়, ছবি দেখা যায়, কিন্তু তবুও সামনে দেখার আগে তার উচ্চতা, কণ্ঠের টোণ, কিংবা চারিত্রিক গুণাবলী প্রকাশ না পাওয়ায় এখনো আমরা ইম্যাজিন করি।

এই ইমাজিনেশন কিন্তু অটোমেটিক, এটাকে ভাল মন্দ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা মুস্কিল। অনেক বক্তার বক্তৃতা শুনলেও আমরা এরকম করি, একটা প্রি এজাম্পশন তার ব্যাপারে থাকে। শুধু বক্তা কেন বলছি, অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পী, পরিচালক কিংবা রাজনীতিবিদ প্রায় সকলের বিষয়েই আমাদের এমন ধারনা জন্মায়।

সমস্যাটা হয় যখন ঐ কল্পনার মানুষের সাথে বাস্তবের মানুষের বেশ বড়সড় অমিল খুঁজে পাই। যেমন ধরেন ফেইসবুকের ছবিতে আমার উচ্চতা বোঝার কোন উপায় নেই। কাল আমার ক্যানাডিয়ান বন্ধুটা এসে বললো হাই হাসান! এরপর দেখলো ছোট খাট একটা মানুষ, তখন সে প্রথমে ধাক্কা খাবে। কিংবা আমার ভারতীয় বন্ধুমশাই অনেক লম্বা মানুষ। এইবার কোলকাতা গেলে তার পাশে কিভাবে দাঁড়াবো সেটা নিয়ে আমিও চিন্তিত।

সে যাই হোক, তো আমরা আমাদের ধারনার সাথে বাস্তবের মানুষের মিল না পেলেই আঘাত পাই, খারাপ লাগে, মন খারাপ হয়। এবং এমন ও দেখেছি অনলাইনে খুব খাতির, বাস্তবে একবার দেখা হওয়ার পর আগ্রহ কমে গেছে, কথা কম হয়, কিংবা এড়িয়ে চলে অনেকেই। এটা হয়, হচ্ছে, হবেই। এটাকে তো আটকবার কোন উপায় নেই, তবে জাস্ট খেয়াল রাখতে হবে মানুষের ব্যাপারে খুব উচ্চ ধারনা যেন আমরা না পোষণ করি। এতে করে কষ্ট কম হবে।

আর এই মাল্টিপল পার্সনালিটির কালে আপনি নিজেই যখন স্থান ভেদে অনেক রকম ব্যক্তিত্ব ধারণ করেন তাহলে কেন আরেকজনের বেলায় এটা মানতে কষ্ট? একটু মেনে নিন। সহজ হোন, মানুষের সাথেই তো ডিল করছেন। আর মানুষ প্রচণ্ড ভুলে ভরা একটা প্রাণী।

লেখকঃ Co-Founder and CEO, Ohnish Films

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী